স্বাভাবিক মৃত্যুতেও মিলছে না দাফন কাফনের লোক

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৪৮ পিএম, ১১ এপ্রিল ২০২০ শনিবার

স্বাভাবিক মৃত্যুতেও মিলছে না দাফন কাফনের লোক

নারায়ণগঞ্জে করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকজনদের মধ্যে আতংক ও ভয় কাজ করছে যার প্রতিফলন ঘটছে কারো স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলেও শেষ বিদায়ে অংশগ্রহণ না করা। আগে কেউ মারা গেলে স্থানীয় মসজিদের মাইকে প্রচার করা হলেও সেটা এখন বন্ধ হতে চলেছে। তাছাড়া নামাজের জানাযেও লোক মিলছে না। দাফন কাফনেও পাশে থাকছেন না খোদ পরিবারের সদস্যরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সকলের মধ্যে করোনার আতংক কাজ করছে। সে কারণেই কেউ এগিয়ে আসছে না। তাদের মধ্যে এ ভয় কাজ করছে অনেকেই করোনার উপসর্গ লুকাচ্ছে। ফলে তাদের দ্বারা যারা সংক্রামন না ঘটে সে জন্যই মৃত্যু ও জানাযা এড়িয়ে যাচ্ছে। এতে করে একটি সামাজিক দূরত্ব দেখা যাচ্ছে।

গত ৩০ মার্চ বন্দরের রসুলবাগ এলাকার শিউলী বেগম নামের নারীর মৃত্যু ঘটে রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে। ২দিন পর পর দেওয়া প্রতিবেদনে তার রিপোর্ট পজেটিভ আসে। এছাড়া ৭ এপ্রিল শহরের দেওভোগে খাইরুল ইসলাম হিরো লিসান নামের গিটারিস্ট মৃত্যুর ২দিন পরেও এসেছে করোনা পজেটিভ রিপোর্ট। এসব কারণেই লোকজনদের মধ্যে ভয় কাজ করছে।

তারা করোনা থেকে মুক্তি পেতেই স্বাভাবিক মৃত্যুগুলোও এড়িয়ে চলতে শুরু করেছেন।

শহরের মাসদাইরে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কেন্দ্রীয় কবরস্থান। এ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ বলেন, স্বাভাবিক নিয়মে মারা মারা যাওয়া মৃতদেহ দাফন করতেও এখন লোক পাওয়া যাচ্ছে না যা অমানবিক। আমরা করোনাকে ভয় না করে হাজার লোক বাড়ীর বাইরে অপ্রয়োজনে অবস্থান করলেও স্বাভাবিক মৃতদেহ দাফনে লোকজন পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজন পর্যন্ত উধাও। স্বাভাবিকভাবে বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যাওয়া মৃতদেহ দাফনের জন্যও এখন আমাদের ডাক পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে তো আমাদের আসল কাজ ব্যহত হবে। আল্লাহ তুমি আমাদের হেফাজত করো, তুমি আমাদের বিবেক জাগ্রত করো।

জানা গেছে, ১০ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় মোকলেছ (৫৫) নামে ডাইং কারখানার শ্রমিক শবে রাতের রোজা রাখা অবস্থায় হঠাৎ বুকে ব্যাথা উঠে নিজ ঘরেই মারা যান। স্ত্রী ও তিন শিশু সন্তানের আহাজারিতে বাড়িওয়ালাসহ আশপাশের কারো মন ছুটেনি একটু সহযোগিতার হাত বাড়াতে। দুপুর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত লাশ নিয়ে ঘরেই বসে ছিলেন নিহতের পরিবার। অবশেষে যুগান্তর প্রতিনিধি সাংবাদিক আলামিন প্রধানের উদ্যোগে রাত ১১ টায় স্থানীয় কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়।

স্থানীয়রা জানান, গত বুধবার ওই বাড়ির সামনের বাড়িতে মহিউদ্দিন নামে একজন ব্যবসায়ী করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে মারা গেছেন। তার লাশ হাসপাতাল কতৃর্পক্ষই দাফন করেছে। এ মুহূর্তে পাশের বাড়িতে আরেকজন ব্যাক্তির মৃত্যুতে অনেকেই ভয়ে কাছে যায়নি।

সাংবাদিক আলামিন প্রধান বলেন, খবর পেয়ে নিহতের পরিবারের সাথে কথা বলে জানতে পারি নিহত ব্যাক্তি কোন রোগে আক্রান্ত ছিলেন না। রোজা অবস্থায় বুকে ব্যাথা উঠে সে মারা যায়। বিষয়টি সদর ইউএনও নাহিদা বারিক ও ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আসলাম হোসেনকে জানানো হয়। তারা লাশটি দাফনের জন্য আমাকে অনুরোধ করেন। এরপর ইউএনও নাহিদা বারিকের সার্বিক সহযোগিতায় শুক্রবার রাত ১১টায় সস্তাপুর-কোতালেরবাগ কবরস্থানে দাফন করা হয়। স্থানীয় মসজিদের ইমাম মাওলানা উজিউল্লাহ জানাযার নাম পড়ান।

গত ৮ এপ্রিল ঘটে এক ভয়ংকর চিত্র। কারণ সেদিন করোনা সন্দেহে মারা গেছে খবরে একের পর এক ফোন পেয়ে চারজনকে নিয়ে ছুটে নিজ ওয়ার্ড জামতলায় ছুটে যান স্থানীয় ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। সে বাসায় গিয়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়। অন্য রুমে থাকা স্ত্রী আর সন্তানেরা ‘প্রিয়’ বাবার ঘরটি দেখিয়ে দেয় খোরশেদকে বলেন ‘ওই রুমে লাশটি পড়ে আছে নিয়ে যান’।

যাদের বছরের পর বছর লালন পালন করেছেন, যাদের জন্য নিজের শ্রম দিয়ে অট্টালিকা গড়েছেন, ধন সম্পদ বানিয়েছেন বিদায়ের বেলাতে অনেকটা নির্মমতায় বিদায় নিত হলো ৭০ বছর বয়সী আফতাবউদ্দিনকে।

পরে খোরশেদ তার সচিব সহ ৪জনকে সঙ্গে নিয়ে লাশ উদ্ধার করেন। নিয়ে যান মাসদাইর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে। মাত্র চারজনের উপস্থিতিতে দাফন সম্পন্ন হয় আফতাবউদ্দিনের।

নারায়ণগঞ্জে সঙ্গীত জগতের আলোচিত মুখ ‘হিরো লিসান’ ইন্তেকাল করেছেন যার প্রকৃত নাম খাইরুল আলম হিরো (৩০)। এদিকে তার মৃত্যুর পর করোনা আতংকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভীর বাড়ি থেকে মাত্র ২শ গজ দূরে হলেও ৭ ঘন্টা লাশটি বাড়ির গেটের সামনে পড়েছিল। এসময়ের মধ্যে পরিবার কিংবা কেউ এগিয়ে আসেনি লাশ নিতে বা ধরতে।

৭ এপ্রিল ভোর সাড়ে ৩ টায় প্রচন্ড জ্বর ও ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। পরে ভোরেই অ্যাম্বুলেন্সে শহরের দেওভোগ এলাকার বাসা থেকে তার মৃতদেহ উঠানোর চেষ্টা করলে আশেপাশের লোকজনের বাধায় সেটা ফেলে রেখেই চলে যান চালক। ওই সময়ে পরিবারের লোকজনও আসেনি ধরতে।

এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া হলে বিষয়টি নাসিকের নজরে আসে।  পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মৃত্যুর ৭ ঘন্টা পর ঘটনাস্থলে যান সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র আফরোজা হাসান বিভা, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোস্তফা আলী শেখ ও ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। সেখানে নমুনা সংগ্রহের পর তাদের উপস্থিতিতে লাশ স্বজনদের অনুমতিক্রমে নাসিকের তত্ত্বাবধায়নে কবর দেয়া হয়।


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও