News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২

ঢাকার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জও উত্তাল হয়


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬, ১০:৪৪ পিএম ঢাকার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জও উত্তাল হয়

১৯৫২’র ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকার পল্টন ময়দানে পুনরায় বাংলাভাষা বিরোধী বক্তব্য দিলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বানে ৩০ জানুয়ারি সারাদেশের মতো নারায়ণগঞ্জেও ধর্মঘট পালিত হয়। ঐ দিনই ঢাকায় মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং সে সভায় ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানানো হয়। ঐ দিনের ধর্মঘট বানচাল করার জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও সর্বত্র স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধর্মঘট পালিত হয়।

৪ ফেব্রুয়ারি শুধু ঢাকায় ধর্মঘট আহ্বান করা হলেও এদিন ঢাকার সাথে সাথে নারায়ণগঞ্জেও সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয় এবং ছাত্ররা মিছিল সহকারে শহর প্রদক্ষিণ করে এবং পরে রহমতউল্লাহ ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে এক ছাত্র-সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন দৈনিক আজাদ এক সংবাদে উল্লেখ করে, ‘নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট পালন করেন এবং মিছিল সহকারে সারা শহর প্রদক্ষিণ করেন। মিছিল শেষে ছাত্র-ছাত্রীরা স্থানীয় রহমতুল্লাহ ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে এক সভায় মিলিত হন এবং বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেন।’

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গ্রন্থে এম.এ. বার্ণিক উল্লেখ করেন, ‘১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম থেকেই নারায়ণগঞ্জে আবার রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকে। ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকেই তমদ্দুন মজলিস নেতা মফিজ উদ্দিন আহমদ আহ্বায়ক ও আজগর হোসেন ভূঁইয়াকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে এখানে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আহুত ছাত্র ধর্মঘটের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ধর্মঘট পালিত হয়। ঐদিন ছাত্রদের এক বিশাল শোভাযাত্রা শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। শোভাযাত্রা শেষে রহমতউল্লাহ ক্লাবে এক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। শামসুজ্জোহার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন বজলুর রহমান, সুলতান আহম্মদ, সুলতান মাহমুদ মল্লিক, শামসুল হুদা, মুস্তাফা সরওয়ার প্রমুখ।’

৪ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট শেষে ঐদিনই কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সমগ্র পূর্ব বাংলায় ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বাত্মক ধর্মঘট আহ্বান করে। ২১ ফেব্রুয়ারির ধর্মঘটকে সফল করার জন্য নারায়ণগঞ্জে ভাষা সংগ্রাম কমিটি ও ছাত্রসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। লিফলেট ছাপা হয়, হাতে লিখে কয়েক’শ পোস্টার তৈরি করা হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও মোড়ে মোড়ে লিফলেট বিতরণ করা হয়, শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও শিক্ষপ্রতিষ্ঠানে পোস্টার লাগানো হয়। শহরের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ ও খণ্ড খণ্ড মিছিল করে ছাত্ররা।

তখন পাক-শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র মুস্তাফা মনোয়ারের চিত্র ও কার্টুন সংবলিত পোস্টারে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ছেয়ে যায়। তখন ‘মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলাভাষা’, ‘আমার মায়ের মুখের ভাষা আমার বুকে জাগায় আশা’, ‘বিক্ষুব্ধ বর্ণমালা’ ইত্যাদি কথা লেখা থাকতো পোস্টারে। মুস্তাফা মনোয়ার তাঁর স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেন, ‘তখন শহরের দেয়ালে দেয়ালে মাসুদ নামে এক যুবক বাংলাভাষার পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান লিখতেন।’ বিলাস নামের এক যুবক তখন রাজপথে খড়িমাটি দিয়ে বিভিন্ন স্লোগান লিখে রাখতেন। লোকে তাকে ‘বিলাইস্যা পাগল’ বলে ডাকতেন। আবদুল মান্নান তাঁর সম্পর্কে নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময়ই শুধু তার আত্মপ্রকাশ ঘটতো। নোংরা শরীর, মুখে অগোছালো দাড়ি, বগলে একটি ছেঁড়া কম্বল আর বাঁশের লাঠি এ নিয়েই সে পথে পথে অর্থাৎ সারা শহর ঘুরে বেড়াতো। তার হাতের লেখাও ছিল খুব সুন্দর। ভাষা আন্দোলনের সময় নারায়ণগঞ্জের রাস্তায় রাস্তায় দেখা যেত পিচের উপর “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”, “পুলিশ জুলুম বন্ধ কর” ইত্যাদি স্লোগান লেখা রয়েছে। বিলাস সমস্ত রাত জেগে পুলিশের অগোচরে খড়িমাটি দিয়ে এ সমস্ত স্লোগান লিখে রাখতো।’ 

তথ্যসূত্র : নারায়ণগঞ্জে ভাষা আন্দোলন -লেখক রফিউর রাব্বি