অমানবিক নারায়ণগঞ্জ হাশরের ময়দান!


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৮:৪৮ পিএম, ১২ মে ২০২০, মঙ্গলবার
অমানবিক নারায়ণগঞ্জ হাশরের ময়দান!

প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের ভয়াল থাবায় লন্ডভন্ড করে দিয়ে যাচ্ছে মানুষের জীবন। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মানুষের জনজীবন। সেই সাথে মানুষের মানবিকতাও দিন দিন লোপ পেয়ে শূণ্যের কোঠায় নেমে আসতে শুরু করছে। মানুষের দ্বারা প্রায় প্রতিনিয়তই ঘটে যাচ্ছে অমানবিক ঘটনা। তেমনি প্রাণঘাতি ভাইরাস করোনাকালে আরেকটি ঘটনার স্বাক্ষী হলো নারায়ণগঞ্জবাসী। আক্রান্ত হয়ে যাওয়ার ভয়ে রোগীর সাথে আত্মীয় স্বজন এমনকি পরিবারের সদস্যদের অমানবিকতা সত্যিই খুব বেদনাদায়ক ঘটনা হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে। একি মানুষের সচেতনতা নাকি সচেতনতার আড়ালে মানুষের অমানবিক চরিত্র ফুটে উঠেছে সেটাই এখন লক্ষ্যণীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জানা যায়, ১০ মে বিকেলে নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুরে অবস্থিত ৩০০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. গৌতম রায় করোনায় এক নারীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। কিন্তু মৃত্যুর সময় ওই নারীর আত্মীয় স্বজন কেউ ছিল না। এমনকি মৃত্যুর পর যেন পরিবারের সদস্যদের কোনো খোঁজ না পায় সেজন্য রেজিস্টার খাতায় ভুল ঠিকানা দেয়া হয়েছে।

স্থানীয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘বিকেলে আমি মৃত্যুর খবর পেয়েছি। আমাকে সদর থানার ওসি বিষয়টি জানান। পরে হাসপাতালে গিয়ে দেখি পরিবারের কেউ নাই। রেজিস্ট্রার খাতা তল্লাশীর সময়ে দেখা যায় ভর্তির সময়ে নারী রোগীর নাম লেখানো হয় লিপি আক্তার। আর স্বামীর নাম সায়েম। যে ফোন নাম্বার দেওয়া হয়েছে সেটাও ভুল। খাতায় কোন হোল্ডিং নাম্বার কিংবা বাসার লোকেশন নাই। শুধু চাষাঢ়া লিখেই চলে গেছে পরিবারের লোকজন যারা পরে আর খোঁজ খবর নিতেও আসেনি।’

শকু বলেন, ‘করোনা রোগ তো আর এইডস না যে ভয় কিংবা নিজেদের আড়াল করতে হবে। এ রোগে অনেকেই রোগমুক্তি পেয়েছেন। তাছাড়া এ রোগ এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তাছাড়া মৃত্যুর পর তো আর মৃতদেহে ভাইরাস থাকে না। কিন্তু তার পরেও লোকজন এটাকে ভিন্নদিকে নিয়ে যাচ্ছে। অহেতুক রোগী হতে দূরে থাকছে এটা মানবিকতাকে হার মানাচ্ছে।’

শকু নিউজ নারায়ণগঞ্জকে আরো বলেন, ‘লিপি আক্তার নামের নারীর মৃত্যুর পর এখন আমরা আরো বিচলিত। কারণ এখন মনে হচ্ছে রোগীর নামও ভুল দিতে পারে। পরিবার পাচ্ছি না যোগাযোগ করতে। এমনকি যারা মারা গেছেন তারাও যোগাযোগ করছে না। বিষয়টি সিটি করপোরেশনের মেয়রকে অবহিত করা হলে তিনি লাশ বহনের গাড়ি ও কবরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করেন। আমি স্থানীয় কাউন্সিলর হিসেব হাসপাতাল হতে লাশ গ্রহণ করে দাফনের জন্য হস্তান্তর করেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘এর আগে ১৪নং ওয়ার্ডেও দেখেছি লাশ সিড়িতে, মেঝেতে, রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যায় পরিবারের লোকজন। এটা তো চরম মানবিকতা হারানোর বিষয়। এগুলো কদাচিৎ গল্পের মত। কিন্তু বাস্তবতায় আমাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। করোনায় প্রচুর মানুষ সুস্থ হচ্ছে। কিন্তু আমার আমাদের বিবেক হারিয়ে ফেলেছি। এখনই সময় সকলকে সজাগ থাকা। কারণ রোববার যখন আমি হাসপাতালে যাই তখন একজন আমার কাছেই ছিল যিনি সম্প্রতি করোনা থেকে মুক্তি পেয়েছেন। আমি তো তাদের থেকে দূরে থাকিনি। বরং প্রতিনিয়িত চিকিৎসকের আশেপাশে, বিভিন্ন রোগীর বাড়িতে যাচ্ছি। নিয়মিত গরম পানি গরগল, গরম পানির ভাব আর কিছু নিয়ম মানলেই এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।’

গত ২৯ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নগর ভবনে বিশেষ ওএমএস এর কার্য ও চাল বিতরণ অনুষ্ঠানে দাফন ও সৎকার প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছিলেন, মৃতদেহ থেকে ভাইরাস ছড়ায় না। আমরা যেন সৎকার দাহ দাফন করি। এতে ভয় পাওয়ার কিছু না। করোনাকে ভয় না বরং জয় করতে হবে। ভালো থাকুন নারায়ণগঞ্জবাসী। ভয় পাওয়ার কোন কারণ নাই। আপনারা সহযোগিতা করলে অবশ্যই আমরা জয়ী হবো।

তারপরেও সংক্রমনের শঙ্কায় কেউ মৃত ব্যক্তির ধারে কাছে কেউ ঘেঁষছেন না। সহপাঠি কিংবা আত্মীয় স্বজন তো দূরের কথা এমনকি পরিবারের সদস্যরা পর্যন্ত কাছে ঘেঁসছেন না। লাশ দাফন কাফন ও সৎকারে কেউ অংশগ্রহণ করছেন না। দূর থেকেই স্বেচ্ছাসেবীদেরকে বলা হচ্ছে লাশ নিয়ে কাফন দাফন কিংবা সংকার করে ফেলার জন্য। ঠিক এমনই অসংখ্য ঘটনার স্বাক্ষী হচ্ছে করোনা ভাইরাসের হটস্পট খ্যাত এই নারায়ণগঞ্জ। প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের আক্রমনের সাথে সাথে মানুষের মধ্যে থেকে মায়া মমতা মানবিকতাও যেন উধাও হয়ে গেছে।

এর আগে গত ২৫ এপ্রিল সিটি কর্পোরেশনে ১০ নং ওয়ার্ডের এক বৃদ্ধা করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান। কিন্তু তার মৃত্যু খবর শুনে এলাকার কেউ এগিয়ে আসেন নি। এমনকি পরিবারের লোকজনও সংক্রমনের ভয়ে কাছে আসছিলেন না। পরে বিষয়টি জানতে ১০নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইফতেখার আলম খোকন নিজে ছুটে যান সেই বাড়িতে। লাশ দাফন কাফনের ব্যবস্থা করেন তিনি। কিন্তু লাশ দাফনে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি ভ্যান ঠিক করা হলে সেই ভ্যান চালক করোনার কথা শুনে পালিয়ে যান। ফলে কাউন্সিলর নিজেই ভ্যান চালিয়ে লাশ নিয়ে দাফন করেন।

ঠিক এমনই একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছিল ২৬ এপ্রিল। এদিন দুপুরে করোনা উপসর্গ নিয়ে নিজ বাসার সিড়িতেই মারা যান খোকন সাহা। খোকন সাহা নারায়ণগঞ্জ শহরের গলাচিপা এলাকায় একটি বাড়ির চতুর্থ তালায় বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে থাকতেন। বেশ কয়েকদিন যাবৎ অসুস্থ ছিলেন। এর মধ্যেই অবস্থা গুরুতর হয় তাঁর। হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ফোন করে আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীদের ডাকতে থাকেন স্ত্রী তৃশা সাহা। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেননি। বাধ্য হয়ে শ্বাশুরির সহযোগীতা নিয়ে নিজেই হাসপাতালে নেওয়ার জন্য সিড়িতে করে নামতে থাকেন। কিন্তু অসুস্থ শরীর সিড়ি বেয়ে নামার ধকল নিতে পারেনি। তিন তালাতে নামার পরেই শরীর ছেড়ে দেয়।

খোকন সাহার স্ত্রী তৃশা সাহা নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্স রাস্তায় আছিল। আমরা নিচে নামানোর চেষ্টা করতাছিলাম। অ্যাম্বুলেন্স দিয়া আমরা ঢাকা নিয়া যাইতাম। সবাইরে ডাকছি একটা লোকও আসে নাই। কেউ নাকি ধরবে না। আমি আমার শ্বাশুরি আর আমার মেয়ে ধইরা নামানোর চেষ্টা করি। তিন তালার ভাড়াটিয়ার কাছে আমার মেয়ে পানি চাইছিল। ধমক দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিছে।’

সিঁড়িতে যখন খোকন সাহা ছটফট করছিলেন তখন সন্তানের এমন অবস্থা দেখে বৃদ্ধা মা দৌড়ে চার তালায় গিয়ে পানি নিয়ে আসেন ছেলেকে খাওয়ানোর জন্য। মুখে সামান্য পানি দেওয়া মাত্র সেখানেই প্রাণ যায় খোকন সাহার। এরপর প্রায় তিন ঘন্টা সেখানেই পড়ে ছিলেন। আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশি কেউ এগিয়ে আসেনি।

কয়েক ঘণ্টা পর আবারো ফোন করা হলে কাউন্সিলর খোরশেদ তাঁর স্বেচ্ছাসেবী টিম নিয়ে ছুটে যান মৃতের সৎকারে। স্বেচ্ছাসেবী দলের সাহায্যে সিঁড়িতে পড়ে থাকা লাশ নামিয়ে নিয়ে আসেন। নিজেদের গাড়ি দিয়ে শ্মশান পর্যন্ত নিয়ে আসেন লাশ। আত্বীয়-স্বজনদের মধ্যে কেউ এগিয়ে না আসেননি। যে কারণে মুখে আগুন (মুখাগ্নি) দেওয়ার দায়িত্বও পড়ে কাউন্সিলর খোরশেদের কাঁধে। কাউন্সিলর খোরশেদও সেই দায়িত্ব সাদরে গ্রহণ করেন। লাশ নিয়ে চলে আসার সময় নিহতের স্ত্রীকে কথা দিয়ে আসেন যে যথাযথ সম্মানের সাথেই তাঁর সৎকার করবেন তিনি।

এদিকে গত ১৯ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের ইউনানি চিকিৎসার পথিকৃৎ ডা. কৈলাশ বনিক করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান। তিনি ১০ দিন যাবৎ জ্বর, সর্দি, কাশি ও গত তিন দিন ধরে স্বাস কষ্টে ভুগছিলেন। তার কোনো ছেলে সন্তান ছিল না। এমতাবস্থায় কোনো আত্মীয় স্বজনও এগিয়ে আসেননি মৃতদেহ সৎকারে। ফলে কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ এগিয়ে আসেন মৃতদেহ সৎকারের জন্য। এটা তাদের ১৪ তম সৎকার ছিল।

একই দিনে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সিপিবি’র নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সদস্য ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ড সেক্রেটারি বিকাশ সাহা।

বিকাশ সাহার ছেলে অনির্বাণ সাহা বলেন, ‘বাবা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন শুনে আত্মীয় স্বজন কেউ আসেনি। আমার একার পক্ষে বাবার মরদেহ দাহ করা সম্ভব ছিল না। কারণ দাহ করতে অনেক নিয়ম-কানুন আছে। এতো কিছু আমি একা কীভাবে করবো। আর কেউ এগিয়েও আসছিল না। তাই খোরশেদ কাকাকে খবর দিই, তিনি এসে সহযোগিতা করেন।’

এর আগে গত ১০ এপ্রিল নন্দীপাড়া ডিএন রোড এলাকার করোনা হিন্দু সম্প্রদায়ের এক লোক মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু এখানেও সংক্রমনের ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেন নি। তার আত্মীয় স্বজনদেনও মধ্যেও কেই এগিয়ে আসেন নি। সংশ্লিষ্ট ১৪ ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোঃ সফিউদ্দিন প্রধান ডাকাডাকি করেও কাউকে পাননি। পরবর্তীতে তিনি নিজেই ভ্যানে করে নিয়ে মাসদাইর শশ্মান নিয়ে সৎকারের ব্যাবস্থা করেন।

এর আগের দিন ৭ এপ্রিলও ঠিক সেরকম একটি ভয়ানক ঘটনা ঘটে যায়। প্রচন্ড জ্বর ও ঠান্ডাজনিত রোগে নারায়ণগঞ্জে সঙ্গীত জগতের আলোচিত মুখ ‘হিরো লিসান’ ইন্তেকাল করেন। যাঁর প্রকৃত নাম ছিল খাইরুল আলম হিরো। পরে শহরের দেওভোগ এলাকার বাসা থেকে তার মৃতদেহ একটি অ্যাম্বুলেন্সে উঠানোর চেষ্টা করলে আশেপাশের লোকজনের বাধায় সেটা ফেলে রেখেই চলে যান চালক। ওই সময়ে পরিবারের লোকজনও আসেনি ধরতে। ফলে মৃতদেহ পড়ে থাকে বাড়ির গেটের ভেতরেই।

খোরশেদ নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘এ যেন এক কেয়ামতের আলামত। এ যেন এক কেয়ামতের ময়দান। কারণ কেয়ামতের ময়দানেও আমরা ইয়া নফসি ইয়া নফসি করবো। সেখানে বাবা চিনবে না মাকে, স্ত্রী চিনবে না স্বামীকে, সন্তান বাবা মা কেউ কাউকে চিনবে না।’

খোরশেদ বলেন, ‘আমাদের মৃত্যুর পরে লাশের সঙ্গে কেউ যাবে না এটা নির্মম সত্য হলেও নিজের পরিবারের লোকজনদের জানাযা দেওয়া যাচ্ছে না। মৃতদেহও শেষ সময়ে কেউ দেখতে পারছে না। এর চেয়ে বড় নির্মম আর কি হতে পারে। কিন্তু এটাই এখন বাস্তবতা। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। এ ধরনের করোনাতে মৃত্যু হলে বড় কষ্ট লাশের পাশে কেউ থাকছে না। পরিবার পরিজন স্ত্রী সন্তান স্বামী বাবা মা কাউকেই পাশে পাওয়া যাচ্ছে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘করোনায় মৃত্যুবরণ করা হলে আশেপাশের লোকজনও সরে যাচ্ছে। কেউ করোনাতে আক্রান্ত হলে ওই বাড়ির উপর আক্রোশে ফেটে পড়েন আশেপাশের লোকজন। এটা ঠিক না। এটা এইডস রোগ না। এটা বিশ্বের একটি মহামারী। অনেক দেশের উচ্চ পর্যায়ের লোকজন এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।’

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর