৮ বছর পর আলোচনায় সেই মডেল মাসুদ


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:০২ পিএম, ১৮ মে ২০২০, সোমবার
৮ বছর পর আলোচনায় সেই মডেল মাসুদ

২০১২ সালের সেপ্টেম্বর। ওই মাসের ১৫ তারিখে অনুষ্ঠিত হয় গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ এর নির্বাচন। বিকেএমইএ’র সবশেষ আলোচিত নির্বাচন ছিল সেটা। ওই নির্বাচনে বর্তমান সভাপতি সেলিম ওসমান সভাপতি নির্বাচিত হলেও সাবেক সভাপতি ফজলুল হক ও তার প্যানেল নিয়ে ঘটে নাটকীয়তা। প্রথমাবস্থায় ফজলুল হক প্যানেলের তিনজন হেভিওয়েট প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হলেও এফবিসিসিআই এর শুনানীতে ফেরত পান প্রার্থীতা। তাদের একজন ছিলেন মাসুদুর রহমান যিনি মডেল গ্রুপের চেয়ারম্যান। ওই নির্বাচনেই আলোচনায় ছিলেন মাসুদ। ৮ বছর পর এবার করোনা ইস্যুতে ফের আলোচনায় সেই মাসুদ যার বিরুদ্ধে সেই ভোটের দিন তোলা হয়েছিল বিএনপি জামায়াত শিবিরের লালনের তকমা। ভোটের সময়ে কেউ কেউ মাসুদের লোকজনদের উপরও চড়াও হয়েছিলেন।

৮ বছর পর এবার করোনা ইস্যুতে মাসুদ হঠাৎ করেই বেশ আলোচনায়। অনেক প্রতিষ্ঠান ও শিল্পপতিরা করোনায় সহযোগিতার হাত বাড়ালেও দিনশেষে মাসুদের বিষয়টিই উঁকি মারছে সর্বত্র। রাজনৈতিক অঙ্গনেও মাসুদকে নিয়ে বেশ হৈ চৈও ঘটছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে মডেল গ্রুপ ও মাসুদ
নারায়ণগঞ্জ জেলার ১৭৫০ জন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উপহার পাঠিয়েছেন মডেল গ্রুপ। ১৫ মে বিকেল ৪ টায় নারায়ণগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমপ্লেক্সে ১৭৫০ জনের উপহার তুলে দেয়া হয়।

নারায়ণগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার নুরুল হুদা বলেন, মডেল গ্রুপ থেকে জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এই উপহার সামগ্রী সত্যি প্রশংসনীয়। মডেল গ্রুপের মালিক একজন মুক্তিযোদ্ধা সন্তান। তার ভিতরে মুক্তিযোদ্ধার রক্ত রয়েছে। তিনিই বুঝতে পেরেছেন এই মহামারী ও আসন্ন ঈদে তার বাবা মত আরো মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। ৫ উপজেলার মধ্যে ৪ উপজেলার কমান্ডারদের কাছে উপহার সামগ্রী পাঠানো হচ্ছে, সেখান বিতরণ করা হবে। শনিবার জেলার মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স থেকে সদর উপজেলার ৭৬০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দেয়া হবে।

মডেল গ্রুপের ডিজিএম (এডমিন, এইচ আর, কমপ্লেন্স) অরুপ কুমার সাহা বলেন, মডেল গ্রুপের মালিক মাসুদুজ্জামান সব সময় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি ভালবাসা ও শ্রদ্ধা রয়েছেন। তিনিই মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়াতে পেরে খুবই খুশি হয়েছেন। জেলার ৫ উপজেলার (সোনারগাঁ ৩৫০, রূপগঞ্জ ২৫০, আড়াইহাজার ২৫০, বন্দর ১৬০, সদর ৭৪০) ১৭৫০ জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উপহার সামগ্রী দেয়া হয়েছে।

উপহার সামগ্রীতে রয়েছে মিনিকেট চাল ৫ কেজি, পোলাওয়ের চাল ২ কেজি, মুশুরীর ডাল ১ কেজি, ছোলা বুট ১ কেজি, তেল (সয়াবিন) ১ লিটার, সেমাই ৪০০ গ্রাম, আলু ২ কেজি, পিয়াজ ১ কেজি ও সাবান ১ পিছ।

জেলার ৫ উপজেলার সোনারগাঁয়ে ৩৫০, রূপগঞ্জে ২৫০, আড়াইহাজারে ২৫০, বন্দরে ১৬০, সদরে ৭৪০ মোট ১৭৫০ জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উপহার সামগ্রী দিয়েছে মডেল গ্রুপ।

পরদিন ১৬ মে উপহার সামগ্রী পৌছে দেওয়ার সময়ে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মোহাম্মদ আলী, নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল উপস্থিত ছিলেন।

এমপি মেয়র ডিসি সহ ৫ কোটি টাকার বরাদ্দ
করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধে ও নগরের জনজীবনের সুরক্ষায় মডেল গ্রু পের উদ্যোগে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে নানামুখী কর্মসূচী ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ১১ এপ্রিল শনিবার কারখানার সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ওই সংবাদ সম্মেলনে সামাজিক সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা কমসূচি, খাদ্য নিরাপওা কমসূচি, চিকিৎসা সুরক্ষা সামগ্রী প্রদান, অর্থ সহায়তা কমসূচী ও ইলেকট্রনিকস সহ প্রিন্ট মিডিয়া বাবদ প্রায় ৫ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যায় করে মডেল গ্রুপ তার নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর মাধ্যমে এবং সাধারণ মানুষের সহযোগীতায় নারায়ণগঞ্জের শহরের বিভিন্ন এলাকা, রাস্তাঘাট জীবাণুমুক্তকরন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছেন। ১৫ হাজার শ্রমিকদের মাঝে চাল, ডাল, পিয়াজ,আলু, তেল, সোলা বুট ও সাবান সম্বলিত একটি করে সহায়তা প্যাকেট পৌছে দেয়া হবে।

এছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি কপোরেশনের মেয়রকে ২০ লাখ টাকা, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্যকে ২০ লাখ টাকা, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্যকে ২০ লাখ টাকা, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসককে ২০ লাখ টাকা, পুলিশ সুপারকে ১০ লাখ টাকা, আলাদাভাবে নারায়ণগঞ্জ সিটি কপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য ১০ লাখ টাকা, মধ্যবিত্ত নাগরিক শ্রেনীর জন্য বিশেষ কমসূর্চীর ক্ষেত্রে ২০ লক্ষ টাকা, ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ার সংবাদ কমীদের জন্য ১০ লক্ষ টাকা, দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ১২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকুকেক ৫ লক্ষ টাকা, মডেল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদুজ্জামানের জন্মস্থান ১১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জমশের আলী ঝন্টুকে ২০ লক্ষ টাকা ও ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদকে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়ার ঘোষনা ছিল যার বেশীরভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে।

যদিও ওই ঘোষণার দিনে আবার মডেল গ্রুপের গার্মেন্ট কারখানা ত্রাণ সামগ্রী দিতে গিয়ে কয়েক হাজার শ্রমিক জড়ো করেছিল। কারখানার ভেতরে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখলেও কারখানায় প্রবেশের আগে ও বের হওয়ার সময়ে ছিলনা শ্রমিকদের দূরত্ব। বরং ঝুঁকির মধ্যেই শ্রমিকেরা বাইরে দলবেধে কারখানায় প্রবেশ করে ও ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে বের হয়।

আলোচনা সমালোচনা
ইতিবাচক কাজের পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক কাজের তকমাও আছে মডেল গ্রুপ ও তাদের লোকজনদের বিরুদ্ধে। ইতোপূর্বে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী একাধিকবার বলেছিলেন, জেলা প্রশাসকের বাসভবনের উল্টো পাশে বিআইডব্লিউটিএ’র ঘাট থেকে ট্রাকে করে গলা চুনা বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হয়। ট্রাক থেকে এসব চুনা পড়ে পিচ উঠে রাস্তা নষ্ট হয়ে গেছে। বিভিন্ন সময় সিটি করপোরেশন থেকে অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় করা হলেও তা বন্ধ করা যায়নি।’

স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, খানপুর বরফকল ঘাট এলাকাতে নদীর তীরের জায়গা লিজ নিয়েছেন পিংকি ট্রেডার্সের মনির হোসেন নামের একজন। তিনিই মূলত মডেল গ্রুপের ডিজিএম। তিনি তিন বছর ধরে এই জায়গা লিজ নিয়ে সেখানে টাইলস, সিমেন্টের কাঁচামাল বিভিন্ন জাহাজ থেকে আনলোড করে গন্তব্যস্থলে পৌছে দেয়। বরফকলের সামনে সিরাজউদ্দৌলা সড়ক দিয়ে ট্রাকে করে এসব মালামাল বিভিন্ন স্থানে পৌছানোর সময়ে সড়কে যেমন পড়ে যায় তেমনি ত্রিপল দিয়ে ঢেকে না রাখায় বাতাসে উড়ে রাস্তায় পড়ে ড্রেন ভরাট ও রাস্তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ সড়কেই ডিসির বাংলো ও ৩০০ শয্যা হাসপাতাল।

নারায়ণগঞ্জ সদর থানাধীন আইইটি উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন হাজীগঞ্জ পুলিশ বক্সটি ভেঙ্গে দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছিল। পরে পুলিশ বক্স সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ওই জায়গাটি কিনে নিয়েছিল মাসুদুজ্জামান। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পুলিশ বক্সটি যে জমিতে ছিল সেটি ২০১৮ সালের শেষ দিকে মডেল গ্রুপের মাসুদুজ্জামান ক্রয় করে দখল নিয়েছিলেন। তবে পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশে ওই দখলকৃত স্থানে ফের পুলিশ বক্স নির্মাণ করে দিবেন এমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন মাসুদুজ্জামান।

সেই নির্বাচন
২০১২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আলোচিত সেই বিকেএমইএ’র নির্বাচনে ফজলুল হকের প্যানেলের প্রার্থী ছিলেন মাসুদুজ্জামান। ভোটের আগে ৩০ আগস্ট নির্বাচনের আপিল বোর্ডের সভায় আপিলকারী ৫ প্রার্থীর প্রার্থীতা বাতিল ঘোষণা করা হয়। তারা হলেন, ডিকে নিটওয়্যার লিমিটেডের মাহাবুবুর রহমান, আরমান ফেব্রিকসের মনির হোসেন, আনোয়ারা কটন লিমিটেডের মাহবুব আলম, মডেল ডি ক্যাপিট্যাল ইন্ডাষ্ট্রিজ লিমিটেডের মাসুদুজ্জামান ও আরবি নিটওয়্যারসের সাঈদ এ কিউ এম জাহিদ। এদের মধ্যে মাহাবুবুর রহমান, মাহবুব আলম ও মাসুদুজ্জামান ফজলুল হক প্যানেলের। ৬ সেপ্টেম্বর নির্বাচনে বাদ পড়া ৩ প্রার্থী বৃহস্পতিবার তাদের প্রার্থীতা ফিরে পান।

পরে ১৫ সেপ্টেম্বর দ্বি বার্ষিক (২০১২-২০১৪) নির্বাচনে নিরস্কুশ জয় পান বর্তমান সভাপতি সেলিম ওসমানের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত নিট পরিষদ। ২৭টি পরিচালক পদে সেলিম ওসমান সহ ২২ জন জয়ী হয়েছে। অপরদিকে সাবেক সভাপতি ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন প্রগ্রেসিভ নিট অ্যালায়েন্স প্যানেল থেকে ফজলুল হক সহ ৫ জন জয়ী হন যাদের মধ্যে মাসুদ ছিলেন। যদিও পরবর্তীতে বিকেএমইএ এর সভাগুলোতে ওই ৫ জনকে আর দেখা যায়নি। পরের নির্বাচনেও তারা অংশ নেননি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর