মানবিক র‌্যাব কর্মকর্তার বদলীতে কেঁদেছেন হাজারো হতদরিদ্র পরিবার


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৯:০৩ পিএম, ১৯ মে ২০২০, মঙ্গলবার
মানবিক র‌্যাব কর্মকর্তার বদলীতে কেঁদেছেন হাজারো হতদরিদ্র পরিবার

সোমবার ১৮ মে সকাল ৯টা থেকে র‌্যাব-১১ এর প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে আছেন ৬৫বছরের অন্ধ বৃদ্ধা ভিক্ষুক রাফিয়া খাতুন। মা কাঁদেন কেন, জিজ্ঞাসা করতেই বললেন “বাবারে গত ৬দিন খাইয়া না খাইয়া দিন কাটাইছি। ঐ পোলাডা খাওনের পোটলা না দিলে না খাইয়া থাকতে হইতো পোলাপান নিয়া। শুনছি পোলাডা যাইবো গা, ওরে একটু দোয়া করতে আইছি”।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে র‌্যাব -১১ এর প্রধান ফটকে ভিড় বাড়তে থাকলো। ৫০ থেকে ১০০, সেই থেকে শত শত। তবে প্রতিদিনকার মত আজ তারা ত্রাণ পেতে আসেননি। শুধু এক নজর দেখতে এসেছেন র‌্যাবের সেই লোকটিকে, যিনি গত ২মাসে সিদ্ধিরগঞ্জ, শহর, ফতুল্লা এলাকার ৮হাজার পরিবারের মাঝে ফুটিয়েছেন হাসি, মিডিয়া যাকে নাম দিয়েছে ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’।

তিনি র‌্যাব-১১ এর সিনিয়র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলেপ উদ্দিন, যিনি বদলী হয়ে যোগ দিয়েছেন র‌্যাব সদর দপ্তরে। একজন সরকারী কর্মকর্তার বদলীর খবরে সাধারণ মানুষের মাঝে এই আবেগ সচরাচর দেখা মিলা অনেকটাই দুস্কর।

জানা গেছে, ৭ খুনের ঘটনার পর র‌্যাবের প্রতি সাধারন মানুষের যে আস্থার ঘাটতি হয়েছিল, সেই আস্থা ও গৌরব ফিরিয়ে আনতে যে র‌্যাব সদস্যদের অবদান অনস্বীকার্য তার মধ্যে একজন আলেপউদ্দিন।

জঙ্গী বিরোধী অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে যিনি এ পর্যন্ত নেতৃত্ব স্থানীয় অর্ধশতের বেশী জঙ্গী গ্রেফতার করেছেন, কৃতিত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ দুইবার পুলিশের সর্বোচ্চ সম্মানজনক রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম) পেয়েছেন।

জঙ্গি ও অপরাধীদের কাছে এএসপি আলেপ উদ্দিন একটি মূর্তিমান আতঙ্কের নাম হলেও করোনা দুর্যোগে এই র‌্যাব কর্মকর্তাকে ভিন্নরূপে দেখছেন তার কর্মস্থলের বাসিন্দারা।

রাত গভীর হলেই শহরের কোন কোন বস্তি বা দরিদ্র এলাকায় ঘুমন্ত মানুষের বাড়ীর দরজায় টোকা দিয়ে বলতে শোনা গেছে, “একটু উঠুন, আমরা র‌্যাব থেকে এসেছি”। ঘিঞ্জি অলিগলিতে ত্রানের বস্তা বা প্যাকেট তুলে নিয়েছেন কাঁেধ। ত্রান দেয়ার পাশাপাশি জিজ্ঞাসা করতেন “মা ,বাড়ীতে দুধের বাচ্চা আছে”।

শিশু খাদ্যের জন্য দিতেন নগদ সহায়তা। ত্রানের তালিকায় বাদ পরেননি সমাজের পিছিয়ে থাকা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ কিংবা অন্ধ-পঙ্গু ছিন্নমূলের মানুষও। আলেপ উদ্দিনের এই মানবিকতার খবর গোপন থাকেনি সাধারন মানুষের কাছে। ধারাবাহিকতায় পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, রাত গভীর হলে এখন বিপুল সংখ্যক মানুষ পথে পথে অপেক্ষা করেন এই কর্মকর্তার জন্য। ফলে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করেও অপেক্ষমান এসব মানুষের কাছে ছুটে যাচ্ছেন তিনি।

এব্যাপারে সদ্য বদলী হওয়া র‌্যাব কর্মকর্তা আলেপউদ্দিন জানান, খুব বেশী মনে পরবে যে মানুষগুলো কার্যালয়ের সামনে ত্রানের আশায় বসে থাকবেন হয়তো। আমাদের চাকরি বদলী হওয়ার। তবে আমার পক্ষে এই ত্রানকার্যক্রম সম্পন্ন করা অসম্ভব ছিল, সব কৃতিত্ব র‌্যাব-১১এর। আমাদের চেষ্টা ৮০০০ হাজার জনক জননী তাদের সন্তানদের মুখে যে সাময়িক হাসি ফুটিয়েছে, সেই আনন্দই আমার চরম তৃপ্তি। আমি কৃতজ্ঞ আমার অধিনায়ক মহোদয়, আমার এডিজি অপারেশন স্যার, পরিচালক লিগ্যাল মিডিয়া স্যার ও সকল সাংবাদিক বন্ধুদের কাছে। আমাদের পাশে থাকার জন্য ধন্যবাদ জানাই, মডেল গ্রুপ, আরকে গ্রুপ, প্রাণ গ্রুপ, ইস্কয়ার নিট, নিট কনসার্ন সহ ব্যক্তি পর্যায়ের অসংখ্য শুভাকাঙ্খীকে।

এদিকে সোমবার রাত ৮টায় সরজমিনে দেখা গেছে র‌্যাব-১১ কার্যালয়ের সামনে প্রায় হাজার খানেক দরিদ্র মানুষের অপেক্ষা। আলেপ উদ্দিন বদলী হয়েছেন, এমন সংবাদ শুনে নি:স্তব্ধ শত শত মানুষ, চোখের কোণে জমে উঠেছিল নোনা জল।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর