ভাষা সৈনিক আক্কাস আলীর স্মরণ সভা


প্রেস বিজ্ঞপ্তি | প্রকাশিত: ১০:০১ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, সোমবার
ভাষা সৈনিক আক্কাস আলীর স্মরণ সভা

আক্কাস আলী ১৯০১ সালে নারায়ণগঞ্জের বাবুরাইলে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতার নাম খোন্দকার বাবর আলী। আক্কাস আলীর পূর্ব পুরুষ খোন্দকার ওমেদ আলী ছিলেন সোনারগাঁয়ের এক পীরের জ্যেষ্ঠ পুত্র। ওমেদ আলী পীর-মুরিদ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বাসী ছিলেন না বলে পিতার সাথে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। ফলে পিতা তাঁতে ত্যাজ্যপুত্র করেন। ওমেদ আলী পিতার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে গৃহ ত্যাগ করে কুমিল্লা জাহাপুরের এক জমিদারের এস্টেটে দর্জির চাকুরী গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি বেশ কয়েক বছর ছিলেন। কিন্তু সেখানে জমিদারী কোন্দলে এক হত্যাকান্ডের ঘটনায় সরকার তাঁকে প্রধান সাক্ষী করেন। সত্য সাক্ষী দিলে তাঁর মনিব জমিদারের সাজা হবার সম্ভাবনা ছিল। তাই তিনি জমিদারের পরামর্শে নারায়ণগঞ্জের বাবুরাইলে পালিয়ে আসেন এবং এখানেই বসতি স্থাপন করেন। আক্কাস আলী ছিলেন পীরজাদা খোন্দকার ওমেদ আলীর একমাত্র পুত্র খোন্দকার বাবর আলীর জ্যেষ্ঠপুত্র।

পরিবারটি খুবই দরিদ্র ছিল। অনেক দুঃখ-কষ্টের ভেতর দিয়ে তিনি বেড়ে উঠেন। দারিদ্রতার কারণে তিনি তেমন কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে পারেননি। ১৯৩০ সালের দিকে ভাগ্য তাঁর প্রতি সুপ্রসন্ন হয়। তিনি ধীরে ধীরে তিনটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই ব্যবসাগুলো ছিল আক্কাসিয়া বেকারী, আক্কাসিয়া সল্ট, আক্কাসিয়া হোটেল। এই সময় তিনি হাজী উজির আলী নামে এক শিক্ষকের কাছে বাড়িতে বসে বাংলা এবং কিছুটা ইংরেজি শিখেন।

যুবককাল থেকেই আক্কাস আলী রাজনৈতিক সচেতন হয়ে উঠেন। চল্লিশ দশকের পরেই তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন তাঁর আদর্শপুরুষ। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আক্কাস আলী সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নির্দেশে নারায়ণগঞ্জে মুসলিম ন্যাশনাল গার্ড প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৭ সাল সিলেটে গণভোটে তিনি নিজ ব্যয়ে ন্যাশনাল গার্ড বাহিনী নিয়ে সিলেটে গিয়ে মুসলিম লীগের পক্ষে প্রচার কার্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সিলেট গণভোটে আক্কাস আলীর অবদানের কথা সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্র আত্মজীবনীতে উল্লেখ আছে। এই নির্বাচনে সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয়।

১৯৪৬ সালে তিনি একটি দৃষ্টিনন্দন বাড়ি নির্মান করেন। লক্ষ্যনীয় ব্যাপার, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বেই তিনি বাড়ির নাম রাখেন পাকিস্তান হাউজ। এতে বোঝা যায় তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে কি রকম নিবেদিত ছিলেন। ১৯৪৬ সালে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত মুসলিমলীগ কাউন্সিল অধিবেশনে আক্কাস আলী ছিলেন পূর্ববঙ্গের অন্যতম ডেলিগেট। সেখানে তিনি অন্যান্য বাঙালি নেতার সাথে পূর্ববঙ্গকে আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষনার জন্য দাবী তুলেছিলেন।

নারায়ণগঞ্জ তানজিম এসোসিয়েশন এবং রহমতউল্লাহ্ মুসলিম ইনস্টিটিউটের তিনি ছিলেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তানজিম এসোসিয়েশনের তিনি ছিলেন আজীবন কোষাধ্যক্ষ। ১৯৫০ সালে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে তিনি সাহসী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ঐসময় তিনি নিজ গ্রামের গুন্ডাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন।

যে পাকিস্তানের জন্য তিনি কঠোর সংগ্রাম করেছিলেন সে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিমলীগ সরকারের শ্যেন দৃষ্টির কারণে তার ব্যবসা বানিজ্য সব বিলুপ্ত হতে থাকে। এই সময় তিনি সমমনাদের নিয়ে স্বৈরাচারী মুসলিম লীগ বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন, ফলে তিনি কয়েকজন মুসলিম লীগ বিরোধী নেতার সাথে গ্রেফতার হন তবে তাঁদের বন্দীজীবন ছিলো মাত্র কিছুদিনের।

১৯৪৯ সালে মাওলানা ভাসানী যখন মুসলিম লীগ বিরোধী আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের সিদ্ধান্ত নেন তখন তিনি, খান সাহেব ওসমান আলী এবং আলমাছ আলী সর্বাত্মক ভাবে ভাসানী সাহেবকে সহযোগিতা করেন। এই বৎসর নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়া মিউচ্যুয়াল ক্লাবে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে যে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রাথমিক কমিটি গঠন করা হয় সেই ঐতিহাসিক সভার অন্যতম উদ্যোক্ত ছিলেন তিনি এবং পাইকপাড়ার বশির সরদার। তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সহ সভাপতি এবং কোষাধ্যক্ষ।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ঐ সময় মুসলিম লীগ সরকার তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করেন। ফলে তিনি অসুস্থ্য অবস্থায় আত্মগোপনে চলেন যান। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন তাঁকে মরণোত্তর ভাষাসৈনিক সনদ প্রদান করেন। আক্কাস আলী একজন দানশীল ব্যক্তি হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। তিনি ১৯৬৪ সালে ইন্তেকাল করেন।

ভাষা সৈনিক আক্কাস আলী’র স্মৃতিচারণ সভা ১৮ ফেব্রুয়ারী মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
সংগঠন সংবাদ এর সর্বশেষ খবর
আজকের সবখবর