অচিরেই চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে


এটিএম জামাল | প্রকাশিত: ০৪:০৭ পিএম, ১১ এপ্রিল ২০২০, শনিবার
অচিরেই চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে

ডাক্তার নার্সসহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৯ জনের মধ্যে ৪০ জন করোনা পজেটিভ। সিএমএইচ-এ তিনজন চিকিৎসক পজেটিভ। এভাবে যদি চিকিৎসকরা আক্রান্ত হতে থাকেন তবে কে কাকে চিকিৎসা দিবে? ভালো করে খুঁজলে দেখা যাবে প্রায় ঘরে ঘরেই এই রোগ ঢুকে গেছে। আমরা যে পদের গরু ছাগল। তামাসা দেখতে গিয়ে নিজে আক্রান্ত এবং অন্যকে আক্রান্ত করবো। যাদের কোনো অপরাধ নাই বিশেষ করে ঘরে যে সব বয়স্ক মানুষ অসহায় ভাবে বসে আছেন।

আমি নারায়ণগঞ্জ থাকি। অতি ঘনবসতি পূর্ণ এই শহর। এখানে আগাগোড়া হাসপাতাল অপ্রতুল। প্রাইভেট প্র্যাকটিস বলতে গেলে বন্ধ। যে সকল চিকিৎসক ঢাকা থেকে আসতেন তারা এখন আর আসেন না। হয়তো আসতে পারেন না। যার যার এলাকা সবার আগে এটাই বাস্তবতা। এই মুহূর্তে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে যে সব নিউজ দেখছি তাতে করে মনে হয় এই শহর ইটালি কিংবা নিউইয়র্ক হতে খুব বেশি সময় আর নিবে না।

আজকের একটি ঘটনা বলি বর্তমানে আমরা কতটা অসহায়।

রাত তিনটা পয়তাল্লিশে আমার ঘুম ভাঙে একটি অতি জরুরী ফোন কলে। আমি ঘুমিয়েছি রাত আড়াইটায়। প্রথমে আমি ভয় পেয়ে যাই। যিনি কল করেছেন তিনি আমার বড় বোন। তিনি তখন কথা বলতে পারছিলেন না। ফোনে কেবল কাঁদছেন। আমি মূষঢ়ে পড়ি। কোনো বড় ধরণের বিপদের কথা ভেবে। একটু পর বুঝতে পারি আমার একজন আত্মীয় চরম রোগাক্রান্ত। সিমটম করোনার প্রভাব বোঝা যায়।

(আমি এখানে কারোর নাম উল্লেখ করবো না তাদের প্রাইভেসির স্বার্থে)

আমাকে একটু চিন্তা করার সময় দিতে বলি মেঝ আপাকে। চিন্তা করে দেখলাম, এত রাতে আমার তিনজন ডাক্তার বন্ধু রয়েছেন যারা আমার কলে বিরক্ত হবেন না। তার মধ্যে দুজন দেশে অন্যজন আমেরিকায়। দেশের একজনকে ফোন দিলাম কোনো বিরক্ত না হয়ে সে আমাকে চিকিৎসাপত্র দিয়ে দিলো। বললো, সকাল পর্যন্ত দেখতে হবে। এত রাতে কিছু করা সম্ভব হবে না। এরপর ফোন অবিরাম ফোন আসতে থাকে। একটার পর একটা। আমি জানি প্রিয়জন অসুস্থ হলে হৃদয়ে কী ঘটে।

নিজেদের গাড়িতে রোগী নিয়ে খুব সকালেই বের হলো ঢাকার উদ্দেশ্যে। সিদ্ধান্ত হলো করোনা পজেটিভ কি না তা দেখা। প্রথমে যাওয়া হলো বেতার ভবন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে সেখানে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হয়। এই তথ্যটি জানি বন্ধু এহসানুল হক বাবুর মাধ্যমে। বাবু যুগান্তর পত্রিকার উপ সম্পাদক। সারা দেশের সব খবর তার নখ-দর্পণে। না, এখানে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। আজ শুক্রবার তাই বন্ধ। তারা দেরী না করে গাড়ি নিয়ে চলে যায় কুর্মিটোলা করোনা হাসপাতাল। সেখানে রোগী নিজে ডাক্তার বলে তাকে আলাদা মর্যাদা সহকারে তারা বলেন, তাকে এখানে পজেটিভ কনফার্ম না হয়ে রাখা ঠিক হবে না। কারণ এখানে সবাই পজেটিভ রোগী। আর এই মুহূর্তে তিনি যে চিকিৎসা নিচ্ছেন, আমরা তাকে এখানে এই একই চিকিৎসা দিবো। তারা পরীক্ষার জন্য পাঠালেন আইইডিসিআর-এ, মহাখালী। সেখান থেকে বললো রোগীকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ যেতে, সেখানেই আজ পরীক্ষা করা সম্ভব। ঠিক ন’টার দিকে মেডিক্যাল এসে দেখা গেলো অসংখ্য রোগীর হাহাকার। সেই হিসেবে ডাক্তার কম।

আমাদের রোগীর সাথে যারা গেছেন তাদের সাথে আমার সার্বক্ষণিক কথা চলছে। তাদের কথা শুনি আর বাসায় বসে শুধু অসহায়বোধ করি। এটাও ভাবি, কোন দোষে কার দোষে আল্লাহ্ আমাদের এমন কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দিলেন? হঠাৎ মনে হলো আমার আরেক ডাক্তার বন্ধুর কথা। তিনি স্বাচিপের একজন বড় মাপের যোগ্য নেতাও বটে। যার ভলিউম অনেকদূর পর্যন্ত চলে যায়। তাকে ফোন দেই। আধঘন্টার মধ্যে সব ব্যবস্থা করে দিলেন। সবারতো সৌভাগ্য থাকে না এমন যোগ্য বন্ধুর!

যেখান থেকে শুরু করছিলাম। চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কথা। আমার এই আত্মীয় নিজে ডাক্তার হয়ে আজ যে অসহায় অবস্থা ফেস করলেন, তা কী বিশ্বাসযোগ্য? না, বিশ্বাস যোগ্য নয়। তাহলে আমাদের সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? কে এমন লম্বা সফর দিয়ে শেষে পর্যন্ত টিকে থাকবে। আমি জানি না। হয়তো আমার বেলায়ও এমনই ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে। বাস্তবতার নীরিখে এ ছাড়া আর কী ভাবতে পারি? পর্যাপ্ত অর্থ, শক্তি কিছু না। ঠিক এই মুহূর্তে। সব বিফলে। মনে রাখবেন আপনার বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় ঘরে নিজ কোয়ারেন্টাইনে। কিছুদিন পর পুলিশেরও শক্তি ফুরিয় যাবে আপনাকে আটকানোর দেখবেন। আপনার ভালো আপনি এখনই দেখুন।

যারা এখনও ভাবছেন। বিষয়টি নিয়ে খেলা মনে করছেন। তারা কিছুই জানেন না। এ রোগের ভয়াবহতার সম্পর্কে। অদৃশ্য একটি ক্ষুদ্র কণা মাত্র কতটা মারাত্মক প্রাণঘাতি হতে পারে। তা জানেন না।

যেমন একটি সামান্য রশি গলায় জড়িয়ে ঝুলিয়ে দিলে যেমন ফাঁসির রজ্জু হয়ে যায়। এবং সেই সামান্য রশিই উপরে কোথাও আটকে গেলে মৃত্যু ঘটায় কয়েক মুহূর্তে। ঠিক তেমনি অদৃশ্য এই অতি ক্ষুদ্র করোনাভাইরাস আপনাকে তামাসার মধ্যেই মৃত্যু ঘটিয়ে দিবে। তাই সাবধান থাকুন। ঘরে থাকুন। নিরাপদে থাকুন। সামান্য যা কিছু আছে তা নিয়ে আপাতত ভালো থাকুন। বিভিন্ন সংস্থা সাহায্য দিবে বলে যে আশ্বাস দিচ্ছে তাদের ফোন করুন। বলছে তারা খাবার ঘরে পৌঁছে দেবে। এ কথা বিশ্বাস করুন। লজ্জা-শরমের এখন সময় নয়। সমাজপতিদের উপর স্থানীয় নেতাদের উপর দায়িত্ব ফেলেন। এটাই তাদের কাজ। সময় মতো তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে দিন। এভাবে যতটুকু পারেন অন্ন জোগার করুন। আগে বেঁচে থাকুন খেয়ে না খেয়ে।

নতুবা কুকুর বেড়ালের মতো মরতে হবে রাস্তা-ঘাটে খুব শীঘ্রই, কথাটি মনে রাখবেন। হ্যাঁ, মনে রাখার জন্য এই নামে মালা জপতে থাকুন, সবাই চিকিৎসা পাবে না রে। আয় ঘরে থাকি। সাবধানে থাকি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর