ভালোবাসায় পরাজিত হলো বাধা নারায়ণগঞ্জ ফিরলো রানা

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৪:০২ পিএম, ২৪ মে ২০২০ রবিবার

ভালোবাসায় পরাজিত হলো বাধা নারায়ণগঞ্জ ফিরলো রানা

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সৈয়দপুর এলাকার সিকদার বাড়ি এলাকার সিকদার রানা সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরেছেন। তবে এ দেশে ফেরার পেছনে রয়েছে এক হৃদয়নাড়া দেওয়ার কাহিনী। ২২ মে রাত ১১টায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্স এর একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে বাংলাদেশে এসে পৌঁছান রানা। নিরাময় অযোগ্য পাকস্থলীর ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে গত এপ্রিল মাস থেকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতাল চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। তাঁর শেষ ইচ্ছায় দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তিনি হয়তো আর কয়েকদিন বাঁচতে পারেন ধারণা চিকিৎসকদের।

প্যালিয়েটিভ কেয়ার সোসাইটি অব বাংলাদেশের যুগ্ম সম্পাদক ডা. রুবাইয়াৎ রহমান জানিয়েছেন, সাধারণত ফাঁসির আসামীর কাছে তার শেষ ইচ্ছার কথা জানতে চাওয়া হয়। সেরকমই, শেষ ইচ্ছার কথা জানতে চাওয়া হয়েছিল রানার কাছেও। তবে সে কোনো ফাঁসির আসামী নয়। তার ঘটনাটি একটু অন্যরকম।

পুরো নাম শিকদার রানা (৩৪)। ছোট বেলায় বাবাকে হারিয়ে অন্যান্য ভাইদের সাথে পরিবারের হাল ধরতে জীবনের তাগিদে নারায়ণগঞ্জের বাড়ি ছেড়ে পাড়ি জমান সিঙ্গাপুরে। ভালোই চলছিল সবকিছু। শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের কাজ। মাসান্তে বাড়িতে খরচ পাঠানো। কিন্তু হঠাৎ করেই এলো বিপদ! এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি একদিন হঠাৎ প্রচন্ড পেটে ব্যথা ও বমি নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ল রানা। রোগের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হলো সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে। পরীক্ষায় জানা গেল এক নির্মম সত্য- পাকস্থলির ক্যান্সার হয়েছে তার, তাও আবার শেষ ধাপে। অর্থাৎ, রোগটি এতটাই ছড়িয়ে গেছে যে, নিরাময়ের জন্য আর কোনো চিকিৎসা নেই। যে ভাগ্যকে প্রতিপক্ষ ভেবে ছোটকাল থেকেই লড়াই চালিয়ে আসছে, সে কিনা উল্টো এক হাত দেখিয়ে দিল তাকে। রানার ভাষায়, জীবনে কেবলমাত্র সুখের ছোঁয়া পাইতে শুরু করসিলাম!

চিকিৎসা বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ সিঙ্গাপুরের মত দেশও জানিয়ে দিল, এই রোগ মুক্তির অপারগতার কথা। জীবনের শেষ কয়েকটা দিনের অল্প কিছু চিকিৎসা আর শুশ্রুষার জন্য রানাকে নেয়া হলো প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা প্রশমন সেবা বিভাগের আওতায়। অনতিক্রম্য রোগে আক্রান্ত মানুষদের শারীরিক ভোগান্তি কমানোর পাশাপাশি তারও তার পরিবারের সামাজিক, মাসনিক ও আত্মিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার নাম প্যালিয়েটিভ কেয়ার। এটি রোগ ভালো করে দেয়ার চিকিৎসা নয়, বরং রোগের কারণে সৃষ্ট কষ্ট ও ভোগান্তি কমানোর একটি বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতি।

শেষবার সিঙ্গাপুর ফেরার সময় ৬ বছরের সন্তান বাবাকে বলেছিল, যেতে দিতাম না। শুধু আমার খেলনা কিনের আনার জন্যই কিন্তু তোমাকে যেতে দিচ্ছি। প্যালিয়েটিভ কেয়ারের বিশেষজ্ঞরা রোগী ও তার পরিবারের একত্রে কাটানোর শেষদিনগুলো সুন্দরভাবে অতিবাহিত করার জন্য একটি কর্ম পরিকল্পনা করে থাকেন যাকে বলা হয়, আগাম সেবা পরিকল্পনা। এরই অংশ হিসেবে রানার কাছে তার শেষ ইচ্ছার কথা জানতে চাওয়া হলে রানা বলেন, মরতে যদি হয়ই, তবে সন্তানকে জড়িয়ে আমার পরিবারের কাছে মরতে চাই। আমি আমার দেশে ফিরে যেতে চাই।

এই ইচ্ছাপূরণ করা হয়ত খুব একটা কঠিন বিষয় হতো না যদি এই চির চেনা পৃথিবীটা আচমকা কোভিড-১৯ মহামারিতে আক্রান্ত না হয়ে পড়তো। রানার চাওয়া শুনে একটু কী থমকে গেলেন প্যালিয়েটিভের হৃদয়বান মানুষগুলো ! কোভিড-১৯ বিপর্যয়ে সিঙ্গাপুর থেকে সকল প্রকার বিমান চলাচল বন্ধ। সিঙ্গাপুর প্যালিয়েটিভ কেয়ারের অন্যতম পথদ্রষ্টা অধ্যাপক ডাঃ সিনথিয়া গোহ ও তার দল তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করলেন সেখানকার বাংলাদেশ কমিউনিটি ও মাইগ্র্যান্ট ওয়ারকার অ্যাসোসিয়েশনের সাথে। এদের পাশে এসে দাঁড়ালো এশিয়া প্যাসিফিক হসপিস এন্ড প্যালিয়েটিভ কেয়ার অ্যালায়েন্স। সকলের প্রচেষ্টায় একটি তহবিল গঠন হয়ে গেল। সবার চাওয়া একটাই, টু ফুলফিল দ্য লাস্ট উইশ অব শিকদার রানা।

খুব অল্প সময়ে জোগাড় হয়ে গেল প্রয়োজনীয় টাকা। সেই টাকায় ভাড়া করা হলো ব্যয়বহুল একটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্স। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা মিলে রানার ৬ বছরের ছেলের জন্য চকলেট, খেলনা মিলিয়ে তৈরি করে দিলেন একটি ড্রিম ব্যাগ। আর জীবনের এই প্রান্তিক দিনগুলো সুন্দরভাবে অতিবাহিত করার জন্য হাতে গুঁজে দিলেন কিছু অর্থ। এ যেন মানবতার এক অপরূপ উন্মোচন। মানুষের ভালোবাসায় পরাজিত হলো স্বপ্ন পূরণের পথের সবগুলো বাধা।

বাংলাদেশের সাথে এশিয়া প্যাসিফিক হসপিস এন্ড প্যালিয়েটিভ কেয়ার অ্যালায়েন্স এর একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে বেশ আগে থেকেই। সেই বুন্ধত্বের জের ধরে অধ্যাপক সিনথিয়া বাংলাদেশে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের পুরোধা অধ্যাপক নিজামুদ্দিন আহমদকে সঙ্গে নিয়ে সেন্টার ফর প্যালিয়েটিভ কেয়ার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় ক্যান্সার ও গবেষণা ইন্সটিটিউট এর সহকারী অধ্যাপক ডাঃ লুবনা মরিয়ম, ইউনাইটেড হাসপাতালের পক্ষ থেকে ডাঃ রুমানা দোউলা, হসপিস বাংলাদেশ এর ডাঃ শাহিনুর রহমান, আশিক ফাউন্ডেশন এর সালমা বেগম, এদের সবার সাথে যোগাযোগ করেন। একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ তৈরি হয়, নাম দেয়া হয় ‘ব্যাক টু হোম’।

সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশের সবার দোয়ায় গত ২২ মে রাত ১১ : ৪৫ মিনিটে শিকদার রানাকে নিয়ে একটি ভাড়া করা এয়ার অ্যাম্বুল্যান্স বাংলাদেশের মাটিতে অবতরণ করে। রানার সেই আবেগী চোখগুলো যেন এয়ারপোর্টেই তার সন্তানকে আঁকড়ে ধরতে চুমু খেতে চাচ্ছিলো। পরিবারে সবাই তখন অপেক্ষমান সেন্টার ফর প্যালিয়েটিভ কেয়ার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে।

তার শেষ ইচ্ছা অনুসারে সে ফিরে এলো তার পরিবারে মাঝে, নিজ দেশে। জীবনের এই ক্রান্তিলগ্নে রানা ও তার পরিবারের সকল ধরনের চিকিৎসাগত সামগ্রিক সেবার দায়িত্ব নিয়েছে সেন্টার ফর প্যালিয়েটিভ কেয়ার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। সহযোগী থাকবে এর সাথে বাংলাদেশের সকল প্যালিয়েটিভ কেয়ার প্রদানকারী অঙ্গসংস্থাসমূহ।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এই ধরনের উদাহরণ খুব একটা বিরল না হলেও বাংলাদেশের মত একটি গরীব দেশের একজন খেটে খাওয়া শ্রমিকের জন্য এই মানবিক উদাহরণ আমাদের শেখায়, পৃথিবীতে মানবতা বলে কিছু একটা এখনো অবশিষ্ট আছে। ভালোবাসা মরে যায়নি।

অন্তরের অন্তস্থল থেকে কৃতজ্ঞতা সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের প্যালিয়েটিভ কেয়ার বিভাগ ও অধ্যাপক সিনথিয়া গোউহর প্রতি। একই সাথে ধন্যবাদ এশিয়া প্যাসিফিক হসপিস অ্যান্ড প্যালিয়েটিভ কেয়ার অ্যালাইন্স, মাইগ্র্যান্ট ওয়ারকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সিঙ্গাপুর ও সবার জন্য যারা এই মহৎ কাজে এগিয়ে এসেছেন। একই সাথে ধন্যবাদ বাংলাদেশ দূতাবাস সিঙ্গাপুর, সিভিল এভিয়েশান বাংলাদেশ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রত্যেককে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এগিয়ে এসেছেন রানার শেষ ইচ্ছা পূরণে।

রানার মুখে সেই মায়া ভরা হাসিটি এখনো আছে, ওর সামনে বসে যখন আমি এই লেখাটা লিখছিলাম। হঠাৎ আমার হাতটা জড়িয়ে ধরে ও বলে উঠল, ‘মরণ খুব শান্তির হইতে পারে, যদি মনের কষ্টগুলান কমানি যায়। আমার শরীরের কষ্ট সব কইমা গেসে আমার পরিবাররে দেইখ্যা। আইজ আমার ঘুমের ওষুধ লাগবো না- এমনেই ঘুমামু শান্তির ঘুম ঘুমাই না, অনেকদিন!’

আমরা জানি, রানাকে আমরা আমাদের মাঝে ধরে রাখতে পারবো না। এমনকি, পরিবারকে শোনাতে পারব না রোগ ভালো করে দেয়ার মত কোনো আশার বাণীও। তবে সবাই মিলে এতটুকু বুঝেছি আজ অনেকদিন পর, রানা শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। প্যালিয়েটিভ কেয়ার শরীরের পাশাপাশি কিছুটা হলেও কমাতে পেরেছে তার মন আর আত্মার ভোগান্তি।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও