ঘরে স্ত্রী করোনায় আক্রান্ত, স্বামী ব্যস্ত মৃতকে দাফনে

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৭:৪০ পিএম, ২৫ মে ২০২০ সোমবার

ঘরে স্ত্রী করোনায় আক্রান্ত, স্বামী ব্যস্ত মৃতকে দাফনে

২৫ মে পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন, পাশাপাশি এদিন নিজের ১৯ তম বিবাহ বার্ষিকী। তবে ঈদের আগের দিন রাত ১১ টায় ফোন আসে নারায়ণগঞ্জের বন্দরের ধামগড় ইউনিয়নের ইস্পাহানী বাজারে একজন ব্যবসায়ী করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন দাফনে কাউকে পাওয়া যাচ্ছেনা। কেউ এগিয়ে আসছেনা। এসময় ঈদের রাতের প্রথম অংশেই রাত সাড়ে ১২টায় স্বেচ্ছাসেবী টিম নিয়ে রাতের মধ্যেই গোসল জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন করা হয়।

বলছি করোনা আক্রান্তদের সেবায় নারায়ণগঞ্জের আলোচিত কাউন্সিলর যিনি করোনার শুরু থেকেই নানা কার্যক্রম ও করোনায় মৃতদের দাফন কাফনে এগিয়ে এসে এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক দাফন করেছেন সেই মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদের কথা।

সোমবার (২৫ মে) ভোরে দাফন শেষে ফিরে কথা হলে এসব কথা বলেন তিনি। তিনি জানান, এটি তাদের টিমের ৫৮তম দাফন। এর আগে ২৪ মে রাত সাড়ে ১১ টায় আরেকজনের করোনা পজিটিভ মরাদেহের দাফন শেষে ফিরেই এই দাফনটি করতে যান।

খোরশেদ বলেন, ‘‘আজ আমার ১৯ তম বিবাহ বার্ষিকী ও পবিত্র ঈদের দিন। গতকাল আমার স্ত্রীর টেস্ট রিপোর্টে করোনা ধরা পড়লেও আমার পরিবারের বাকি সবাই ভালো আছেন। আমি আমার এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আলাদা থাকছি। হঠাৎ রাতে বন্দরের এক ব্যবসায়ীর ছেলে এলএলবি অনার্সে অধ্যয়নরত আকিব জানায় তার বাবা মারা গেছেন। তাকে বলি অ্যাম্বুলেন্স থেকে লাশ নামিয়ে রাখো আমরা আসছি। সে এতে জানায় কেউ এগিয়ে আসছেন না তাই লাশও নামাতে পারছে না সে। পরে সকল ক্লান্তিকে পেছনে ফেলে, স্ত্রী করোনায় আক্রান্ত ও বিবাহ বার্ষিকী ভুলে যাই পাশাপাশি কিছুক্ষন পর ঈদ সেটিও ভুলে গিয়ে টিম মেম্বারদের নিয়ে দাফনের জন্য রওনা দিয়ে সাড়ে ১২ টায় পৌছাই।’’

রাত দেড়টায় গোসল ও জানাজা শেষে দাফন করি। কিন্তু কবরে দেয়ার জন্য বাঁশ না পাওয়ায় সেন্টারিংয়ের বাঁশের মাচা দিয়ে দাফন করি। এই সময়েও আমাদের দাফনের টিমে অংশ নেন হীনা, হাফেস শিব্বির, আনোয়ার, সেলিম মোল্লা, সুমন ও রাফী। ঈদের দিনও আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

করোনার সময়ে আলোচিত এ মুখের কার্যক্রমের প্রশংসা দেশ ছাড়িয়ে বিশ্ব মিডিয়ায়ও উঠে আসে। তিনি তার স্ত্রী আক্রান্ত হলেও তার সকল কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন বলে জানান। ঈদের দিনও তারা সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

প্রসঙ্গত কাউন্সিলর খোরশেদ এখন পর্যন্ত তার টিম ৫৫ টি লাশ দাফন করেছে করোনার শুরু থেকে। এর মধ্যে ১৮টি করোনা পজিটিভ, ৭টি স্বাভাবিক মৃত্যু ও বাকিগুলো করোনার উপসর্গে মারা গেছেন।

ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন থেকে শত শত লাশ দাফনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিলেও কার্যত করোনা আক্রান্ত কিংবা করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর পর মানুষ খোরশেদের টিমকে ফোন দিচ্ছেন এবং তাদের উপর আস্থা রাখছেন। এ ছাড়াও ঈদের পরদিন থেকে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়া ব্যক্তিদের যারা সেচ্ছায় রক্তের প্লাজমার জন্য রক্তদান করতে চান তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে রক্তগ্রহণ কার্যক্রম করবেন তার টিম।

খোরশেদ জানান, সম্প্রতি কয়েকটি লাশের দাফনের সময় আমরা শরীরে অন্যরকম দাগ ফুটে উঠতে দেখতে পাচ্ছি। এগুলো করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়াদের। এরকম দাগের উপসর্গ আমেরিকাতে আক্রান্তদের মৃত্যুর পর পাওয়া গেছে বলে জেনেছি। যদি এটি হয়ে থাকে তাহলে খুবি ভয়াবহ দিক এটি। আমরা ঈদেও প্রস্তুত রয়েছি।

খোরশেদ নিজের উদ্যোগে করোনার শুরু থেকেই তার ওয়ার্ডের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করেন, হ্যান্ড স্যানিটাইজার সঙ্কট হওয়ার পর নিজে হাজার হাজার বোতল তৈরি করে বিতরণ করেন, ঘরে ঘরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন। করোনায় আক্রান্তদের দাফন পাশাপাশি সৎকার কাজের অংশ নিচ্ছেন। এলাকায় সড়কে ও ঘরে জীবানুনাশক স্প্রে করছেন, যানবাহন জীবাণুমুক্ত করতে স্প্রে অব্যহত রেখেছেন, ডিজিটাল পদ্ধতিতে অনলাইন ও মাইকে ঘরে ঘরে দোয়ার ব্যবস্থা করেছেন, মানুষকে সচেতন করতে নিয়মিত প্রতি এলাকায় মাইকিং করাচ্ছেন, নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে টিম গঠন করে এলাকায় এলাকায় আড্ডা বন্ধ করতে অনুরোধ করছেন এবং তার ওয়ার্ডবাসীর স্বাস্থ্যসেবা ও পরামর্শে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে টেলি মেডিসিনসেবা চালু করেছেন তিনি। এছাড়া শুধু তার ওয়ার্ড নয়, নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের মরদেহ দাফনে কেউ এগিয়ে না এলেই তিনি ও তার স্বেচ্ছাসেবক টিম এগিয়ে আসছেন। তার ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় তিনি বিনামূল্যে সবজি বিতরণ কার্যক্রমও শুরু করেছেন এবং এটি ঈদের পরও অব্যাহত থাকবে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও