‘নাহিদা আপা খাদ্য সামগ্রী না দিলে আজ থেকে চুরি করতাম’

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:২৭ পিএম, ৩ এপ্রিল ২০২০ শুক্রবার

‘নাহিদা আপা খাদ্য সামগ্রী না দিলে আজ থেকে চুরি করতাম’

‘নাহিদা আপা খাদ্য সামগ্রী দিয়ে সহায়তা না করলে হয়তো আজ থেকেই আমি চুরি করতাম। বাড়িতে চার বছরের ছোট মেয়ে, বউ আর মা-বাবা না খেয়ে আছে। অথচ আমরা স্থানীয় না হওয়ায় সরকারি কোনো সহায়তা পাই না। করোনা ভাইরাসের এই পরিস্থিতি আমাদের মতো অনেককেই চোর বানিয়ে ছাড়বে’। কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন পঞ্চবটির বাসিন্দা মো. রাসেল।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমন রোধে সরকার দেশে যে ছুটি ঘোষণা করেছে তার ব্যপক প্রভাব পরেছে দিনমজুর ও শ্রমিক শ্রেনীর লোকের উপর। তাদের স্বল্প আয়ের কারণে তারা কখনো জরুরী পরিস্থিতির জন্য সঞ্চয় করতে পারেনি। যার ফলে করোনা ভাইরাসে উদ্ভুত এ পরিস্থিতে তাদের মধ্যে অনেককেই না খেয়ে থাকতে হচ্ছে।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় না হওয়ায় বা নারায়ণগঞ্জের ভোটার আইডি কার্ড না থাকায় সরকারি ত্রাণ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন অনেকে। তাদের মধ্যে একজন হলেন মো. রাসেল।

পেশায় বিদ্যুৎ মিস্ত্রি রাসেল ৫ সদস্যের সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ৫ বছর ধরে নারায়ণগঞ্জে বসবাস করলেও ভোটার আইডি কার্ডে তার ঠিকানা কেরানীগঞ্জের। যার ফলে স্থানীয়ভাবে কোনো ধরনের সহায়তা পাননি তিনি। তাছাড়া তিনি যে নিজ এলাকায় গিয়ে ত্রান সামগ্রী নিয়ে আসবেন তার ব্যবস্থাও নেই। পরিবহন ব্যবস্থা বা আর্থিক অবস্থা উভয়ই প্রতিকূল। আত্মসম্মানের কারণে তিনি কারও কাছে হাত পাততেও দ্বিধা বোধ করেন।

একটা সময় কোনো উপায় না পেয়ে তিনি একজন গণমাধ্যম কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এবং তার মাধ্যমে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদা বারিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। নাহিদা বারিক তার কথা জানার পর তৎক্ষনাত ব্যবস্থা গ্রহন করেন এবং তাকে উপজেলা পরিষদে ডেকে খাদ্য সামগ্রী দিয়ে সহায়তা করেন।

নাহিদা বারিক নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘প্রত্যেকটি ইউনিয়ন পরিষদে বলে দেয়া আছে যে যারা দিন মজুর তারা প্রত্যেকেই এই ত্রান পাবেন। সে কোন জেলার তা দেখা হবে না, বড় কথা তিনি এখন আমাদের এলাকায় আছেন। তার পরেও যদি কেউ আইডি কার্ড ছাড়া ত্রাণ পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিকে ত্রান দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে যোগ্য ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

রাসেল নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘আমাদের মতো অনেকে আছে, যারা না খেয়ে আছে অনেকদিন ধরে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় না হওয়ায় আমাদের ১ নং ওয়ার্ড থেকে আমরা কোনো সহায়তা পাইনা। যেখানেই গিয়েছি সেখান থেকেই তাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতির কথা তো আমরা আগে জানতাম না। তাহলে হয়তো প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে পারতাম। কিন্তু এখন ঘরে কিছুই নেই। আমাদের যেই স্বল্প আয়, তা দিয়ে সঞ্চয় করার মতো অবস্থা থাকে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগে চোরদের গালি দিতাম, এখন বুঝি তারা কেউ চোর হয়ে জন্মায় নাই। এই অভাব মানুষকে চোর বানিয়ে ছাড়ে। আমাদের এলাকায় অনেকে আছে, যারা কয়েকদিন ধরে প্রায় না খেয়ে আছে। বাইরের ভোটার হওয়ায় তারা সহায়তা পায় না।’

উল্লেখ্য, নারায়ণগঞ্জ শিল্প নগরী হওয়ায় বিভিন্ন জেলার মানুষ নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় এ জেলায় আসেন। এবং এখানে থেকেই নিজ নিজ ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। সেই সূত্রে নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় লোকের তুলনায় বাইরের জেলার লোকই বেশি রয়েছেন। তাদের মধ্যে সিংহভাগই দিনমজুর বা শ্রমিক।

স্বল্প আয়ের কারণে অর্থ সঞ্চয় করা হয়নি তাদের, আত্মসম্মানের ভয়ে কারও কাছে হাত পাততেও দুইবার ভাবেন তারা। অথচ আত্মসম্মান ভুলে যখন সরকারি ত্রানের আশায় স্থানীয় প্রশাসনের কাছে হাত পাতছেন, তখন স্থানীয় না হওয়ায় ত্রান মিলছে না তাদের। এখন দেখার বিষয় প্রশাসন এই মানুষগুলোকে কিভাবে সহায়তা করবে।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও