মৃত্যুর ঝুঁকিতে র‌্যাব ‘দিনে কঠোর রাতে নিবেদিত প্রাণ’ (ভিডিও)

সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১২:৪০ এএম, ১৩ এপ্রিল ২০২০ সোমবার

মৃত্যুর ঝুঁকিতে র‌্যাব ‘দিনে কঠোর রাতে নিবেদিত প্রাণ’ (ভিডিও)

করোনা ভাইরাস একটি প্রাণঘাতিক সংক্রামণ ব্যধি ভাইরাস যা একজন মানুষ থেকে অন্যজনে সংক্রামণ হয়ে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের মধ্যে সব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জকে। যেখানে ১ নারী সহ ৯ জন মৃত্যু বরণ করেছেন আর আক্রান্ত হয়েছে ১০৭ জন। যা দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে। এমন সংটাপন্ন মূহূর্তে জীবণের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন র‌্যাবের সদস্যরা। তাঁরা দিনের বেলায় তপ্তরোদে লকডাউন মেনে সাধারণ মানুষকে ঘরে রাখতে যতটা কঠোর হচ্ছেন, তেমনি রাতের বেলায় অনাহারী মানুষের জন্য ততটাই নিবেদিত প্রাণ। নিজেদের মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও থেমে নেই তাঁরা। অব্যাহত রেখেছেন তাদের কর্মপন্থা।

১১ এপ্রিল শনিবার সকাল থেকে  দুপুর পর্যন্ত শহরের চাষাঢ়ায় বঙ্গবন্ধু সড়কে লকডাউন মেনে মানুষকে ঘরে রাখতে যতটা কঠোর হতে দেখা গেছে ততটাই নিবেদিত প্রাণ হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জে রাতের বেলায় কর্মহীন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাত তখন প্রায় ১২টা। একটি গাড়িতে করে খাদ্য সামগ্রী নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়ালো র‌্যাব-১১ এর গাড়ি। নেই কোন শ্রমিক কিংবা সহকারীও। র‌্যাব-১১ এর সিনিয়র সহাকারী পরিচালক আলেপ উদ্দিন একজন সিনিয়র কর্মকর্তা হয়েও নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন খাদ্য সামগ্রীর বস্তা। তার দেখাদেখি র‌্যাবের অন্য সদস্যরাও কাঁধে নিয়ে রাতের অন্ধকারে হাঁটতে শুরু করেছেন।

একটি বাসার গেটে টুকা দিয়ে র‌্যাবের সিনিয়র কর্মকর্তা আলেপ উদ্দিন ডাকছিলেন, ‘আমরা র‌্যাব-১১ থেকে আপনাদের জন্য চাল ডাল নিয়ে এসেছি, আসেন। আমরা র‌্যাব-১১ থেকে এসেছি, যাদের চাল ডাল লাগবে তারা আসেন।’

র‌্যাবের এমন ডাকে অবাক হয়ে যান সেখানকার বাসিন্দারা। গেট খুলে র‌্যাবের কাঁধে চাল ডাল দেখে অশ্রুসিক্ত চোখ। জলে টলমল হওয়া চোখে মুখে এক তৃপ্তির হাসি। এ যেন সৃষ্টিকর্তার পাঠানো দূতেরা এসব কর্মহীনদের জন্য খাদ্য নিয়ে এসেছেন। পরে আলেপ উদ্দিন সহ অন্যরা প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য সামগ্রীর বস্তা তাদের হাতে তুলে দেন।

এখানেই শেষ নয়, আলেপ উদ্দিন আবারও জিজ্ঞাসা করেন, ‘দুধের বাচ্চা আছে করো। কয়জন আছে। এই নেন কিছু টাকা সেটা দিয়ে দুধ কিনে নিবেন। তাও ঘর থেকে বের হবেন না।’ এভাবে ঘুরে ঘুরে গভীর রাত পর্যন্ত সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার অসহায় মানুষদের ঘরে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেয় র‌্যাব সদস্যরা।

রাতে খাদ্য পৌছে দেওয়ার সময় কথা হয় এক পা নেই মনির মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, রাস্তার পাশে টঙ দোকান। কিন্তু লকাডাউনের জন্য ২৬ তারিখ থেকে বন্ধ। বাসায় যা ছিল সবাই শেষ। দুইদিন কোন রকম চিড়া মুড়ি খেয়ে জীবন যাপন করছিলাম। দুধের বাচ্চাটাকেও দুধ খাওয়াতে পারছিলাম না। বাজার থেকে গিয়ে কিনে আনবো সেই টাকাও নেই। বাচ্চাদের থেকে মুখ লুকিয়ে আল্লাহ আল্লাহ করছিলাম। আল্লাহ আমার ডাক শুনেছে। আল্লাহ এ আমার বাচ্চাদের জন্য র‌্যাবের মাধ্যমে খাবার পাঠিয়েছে। আল্লাহ র‌্যাবের প্রতিটি সদস্যকে ভালো ও সুস্থ রাখুক। তাদের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি।

রাতে যতটাই নিবেদিত প্রাণ কিন্তু দিনের বেলায় ততটাই যে কঠোর সেটা দেখা মিলে রোববার দুপুরে বঙ্গবন্ধু সড়কে টহল দেওয়ার সময়। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ জেলাকেই লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হতে পারবেনা। তাদের বাধ্যতামূলক ঘরে থাকতে হবে। তারপরও যখন অহেতুক মানুষ বের হয়ে সংক্রমাণ বাড়িয়ে যাচ্ছেন তখন তাদের ঘরে রাখতে এ টহল শুরু করে র‌্যাব সদস্যরা।

যে র‌্যাবের সিনিয়র কর্মকর্তা আলেপ উদ্দিন রাতের বেলায় সবাইকে ডেকে বিনয়ের সঙ্গে খাদ্য পৌঁছে দিয়েছেন দিনের বেলায় লাঠি হাতে ততটাই কঠোর কণ্ঠে অহেতুক বের হওয়া মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। কখনো হুশিয়ারী দিয়ে ছেড়েছেন আবার কখনো শাস্তি দিতেও থেমে যাননি। রাতে খাদ্য পৌছে যেমন দিয়েছে তেমনি মাথার উপর তপ্তরোধে দাঁড়িয়ে কাজ করছেন সেটাও সাধারণ মানুষের জন্যই।

অপরাধী ও আইন অমান্যকারীদের জন্য র‌্যাবকে সব সময় যতটা কঠোর দেখা যায় তাতে রাতের ওই নিবেদিত কর্মদের পোশাক না থাকলে কেউ হয়তো বিশ্বাস করবে না তারা র‌্যাবের সদস্য। সৃষ্টিকর্তার পাঠানো দূত ভেবেই জড়িয়ে ধরবেন। এসবই করছেন র‌্যাব সদস্যরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে।

গভীর রাতে যখন সবার ঘরে খাদ্য পৌঁছে দিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছিলেন তখন র‌্যাব-১১ এর সিনিয়র সহাকারী পরিচালক ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) পদ মর্যাদার আলেপ উদ্দিন বলেন, নারায়ণগঞ্জ একটি জনবহুল এলাকা। এখানে করোনার প্রভাবটা অত্যন্ত প্রকট। এ প্রকট হওয়ার কারণে আমরা নারায়ণগঞ্জকে লকডাউন করে দিয়েছি। আর তাই দিনের বেলায় মানুষকে ঘরে থাকতে নিশ্চিত করতে আমাদের ডিউটি দিতে হয়। এ লকডাউন করতে গিয়ে আমরা দেখলাম অনেক মানুষ অর্থনৈতিকভাবে অর্থ সংকটে ও খাদ্য সংকট আছে। আমরা সেই পরিমাণে না পারলেও ক্ষুদ্র পরিসরে চেষ্টা করছি মানুষের পাশে দাঁড়াতে। এ কারণেই রাতের বেলায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের যতটুকু সম্ভব র‌্যাব ১১ এর পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।

তিনি আরো বলেন, প্রতিদিনই রাতের বেলায় আমরা এ খাদ্য সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। দিনের বেলায় যেহেতু আমরা লকডাউন পরিচালনা করে সময় পাই না। এছাড়া দিনের বেলায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাও কঠিন হয়। যার কারণে আমরা রাতের বেলায় এ খাদ্য সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। এছাড়াও আমরা একেবারে ক্ষুদ্র পরিসরে বাচ্চাদের দুধের জন্য ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও