দিনটি ১ সেপ্টেম্বর ২০২২। উৎসবমুখর পরিবেশে জেলা বিএনপির হাজারো নেতাকর্মী জড়ো হচ্ছিলেন শহরের দুই নম্বর রেলগেইট এলাকায়। উদ্দেশ্য, দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে শান্তিপূর্ণ মিছিল ও শোভযাত্রা করবেন। মিছিল শুরু হতেই বাঁধা দেয় পুলিশ। অতর্কিত লাঠিপেটা শুরু করে বিএনপির প্রবীন নেতাদের উপর। ক্ষুব্ধ হয়ে কর্মীরা ইট পাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ তার জবাব দেয় চাইনিজ রাইফেল দিয়ে। নিরস্ত্র বিএনপি কর্মীদের উপর বৃষ্টির মত গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। যেই গুলিতে নিহত হয় যুবদল কর্মী শাওন প্রধান।
তবে হত্যা করেই থামেনি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। পুলিশ নিহতের লাশ আটকে রেখে বড়ভাইকে দিয়ে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে নেয়। যেই স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে। আর নিহতের গ্রামে স্থানীয় আওয়ামী লীগের লোকজন যুবদল কর্মী শাওন প্রধানকে যুবলীগ নেতা দাবী করে বিক্ষোভ মিছিল করে। যুবদল কর্মীকে হত্যার পর লাশ নিয়ে এমন ঘৃণ্য রাজনীতি দেখে হতবাক হয়ে পড়ে নগরবাসী।
শাওন মৃত্যুর দুই বছরের মাথায় ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন আর সাড়ে তিন বছরের মাথায় ক্ষমতায় বিএনপি। শাওনের মা ঘটনার পর থেকে স্বাভাবিক হতে পারেননি আর। কথা বলেন খুবই কম। চোখের সামনে নিজের ছেলের লাশকে নিয়ে আওয়ামী লীগ কর্মীদের ঘৃণ্য রাজনীতি করতে দেখেছেন। দেখেছেন কিভাবে আওয়ামী লীগ তার ছেলের রাজনৈতিক দলের নাম পরিবর্তনের জন্য এলাকায় বালু ব্যবসা, ইট ব্যবসা এবং বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব দিতে। যা ঘৃণাভরে ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি ও তার পরিবার।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন বন্দরের যুবদল কর্মী আবুল হাসান স্বজন। গুলিবিদ্ধ হবার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবুল হাসান একবার চোখ খুলে বড়ভাইয়ের কাছে জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘শেখ হাসিনা কি পালিয়েছে’? তার ভাই উত্তরে জানান ‘হ্যা শেখ হাসিনা প্লেনে করে ভারতে পালিয়েছে’। মুচকি হেসে আবুল হাসান উত্তর দেয় আলহামদুলিল্লাহ। এটাই ছিল তার শেষ কথা।
বিএনপির এমন অসংখ্য পরিবার নারায়ণগঞ্জে রয়েছে যারা আওয়ামী লীগ আমলে হারিয়েছে স্বজনদের। আড়াইহাজার রূপগঞ্জ অঞ্চলে বহু বিএনপি কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন আওয়ামী লীগের অত্যাচারে। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্যাতিত থাকার পর দল ক্ষমতায় এলেও এই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বাড়ছে চাপা ক্ষোভ। কারন, চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন বিএনপি নেতাদের মিছিলে বাড়ছে আওয়ামী লীগের কর্মীদের উপস্থিতি। কোন কোন ক্ষেত্রে পুনর্বাসিত হচ্ছে তারা। বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা জামিনে বের করে নিয়ে আসছেন দাগী আসামীদের। মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে পুলিশ ও বিএনপি নেতাদের ম্যানেজ করে এলাকায় ফের আওয়ামী লীগ সংগঠিত করছেন নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা।
জুলাই শহীদ আবুল হাসান স্বজনের ভাই অনিক হাসান বলেন, ‘চোখের সামনে আওয়ামী লীগের লোকজনকে ঘুরে বেড়াতে দেখছি। তারা এখন আমাদের নিয়ে হাসিঠাট্টা করে। আবার বিএনপির কেউ কেউ এই সন্ত্রাসীদের পুনর্বাসন করছে। আজকে দিনে দুপুরে আওয়ামী লীগ নারায়ণগঞ্জে মিছিল করে। কি বলবো ভাই, এগুলো দেখলে কষ্টে বুক ফেটে যায়। যেই আওয়ামী লীগ আমাদের এত অত্যাচার করলো, তারা এখন দিনে দুপুরে ঘুরে বেড়ায়। আওয়ামী লীগ একটা কালসাপ। ওদের যারা বিশ্বাস করে কাছে নিবে, তার দুর্গতি হবেই।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির বহু নেতাকর্মী বর্তমানে প্রশাসনের কর্মকান্ডে ক্ষুব্ধ। তারা বলছেন, ‘এককালে মোবাইল নাম্বার ট্র্যাকিং করে বিএনপি কর্মীদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেত পুলিশ। যেন বিএনপির রাজনীতি করা কোন বড় ধরণের অপরাধ। অথচ বর্তমানে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ সংগঠন হবার পরেও এই সংগঠনের লোকজন প্রকাশ্যে শুধু ঘোরাফেরাই করে না, তারা এখন দিনের আলোতে মিছিল মিটিং করে বেড়াচ্ছে। অথচ প্রশাসন অতীতে গোয়েন্দা নজরদারি করে বিএনপির গণতান্ত্রিক কর্মসূচীতে বাধা দিত। আর এখন নিষিদ্ধ সংগঠনকে বাধা দিতে পারছে না।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘গত দেড় বছরে আওয়ামী লীগ সুবিধা করতে পারেনি। কিন্তু তখন থেকেই অভিযোগ উঠেছিলো বিএনপিপন্থী কিছু আইনজীবী তাদের জামিন করিয়ে এবং অর্থের বিনিময়ে তাদের প্রশ্রয় দিচ্ছে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সেই অংশটি এখন ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। শহরে ও শহরতলীতে মিছিল করছে আওয়ামী লীগ। নিয়মিত পোস্টারিং, গোপন কর্মসুচী পালন, অভিজাত রেস্তোরায় বৈঠক সবই চালু আছে তাদের। বিএনপি ক্ষমতায় আসার তিন মাসেই এমন চিত্র দেখায় স্বাভাবিক ভাবেই মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে কিছুটা ছাড় দিচ্ছে বিএনপি। যা নিঃসন্দেহে বিএনপির শহীদ পরিবারগুলোর জন্য হতাশাজনক।































-20260522173818.jpg)




আপনার মতামত লিখুন :