নারায়ণগঞ্জে শহরে ফুটপাতে দোকান বসানোকে কেন্দ্র করে আসাদ বাহিনীর হাতে হকার যুবায়ের নিহত হলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে কয়েকজন বিএনপি নেতাদের আর্শিবাদে বেঁচে যায় আসাদ। হকার জুবায়েরকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার বিচারে সহযোগীরা ফাঁসলেও খালাস পেয়ে গিয়েছিল আসাদ। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের শাসনামলে গডফাদার শামীম ওসমানের ছত্রছায়ায় আসাদ ও রহিম মুন্সি বাহিনী ফুটপাতের চাঁদাবাজি সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করলেও বর্তমানে সেখানে এসেছে নতুন মুখ। তবে কয়েকজন বিএনপি নেতাদের আশীর্বাদে এখনো চাষাঢ়া সোনালী ব্যাংক ও সাধু পৌলের গির্জার সামনে বহাল রয়েছে রহিম মুন্সি ও আসাদ এবং তাদের অনুগামীদের দোকান।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে সাধু পৌলের গির্জা সংলগ্ন মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসের পাশর্^বর্তী বলাকা পেট্রোল পাম্পের সামনে ২০২১ সালের ১৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ফুটপাতে দোকান বসানো নিয়ে বিরোধে হকার জুবায়েরকে (১৮) প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। জুবায়েরকে উদ্ধার করে প্রথমে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল ও পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। নিহত জুবায়ের ফতুল্লার উত্তর মাসদাইরের আমজাদ হোসেনের পুত্র। ওই ঘটনায় নিহত জুবায়েরের মা মুক্তা বৃহস্পতিবার দিনগত গভীর রাতে বাদি হয়ে হকার নেতাসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ৫ জনকে আসামী করে হত্যা মামলাটি দায়ের করেন। মামলার আসামীরা হলো, আসামী ইকবাল ওরফে ডাক্তার (৩০), হকার নেতা আসাদ (৪০), স্বপন (৩২), সায়মন (২১), হাসান (১৯), সানি (২৩), রাসেল (২৪), মহসিন (৬০)সহ অজ্ঞাত ৪/৫ জন।
মামলায় মুক্তা উল্লেখ করেন, শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে সাধু পৌলের গির্জার সামনে ফুটপাতে সাদেকের জুতার দোকানে চাকুরী করতো জুবায়ের। ফুটপাতে দোকান বসানো নিয়ে স্বপনের সঙ্গে ঝগড়া হয় জুবায়েরের। পরে জুবায়েরকে বলাকা পেট্রোল পাম্পের সামনে নিয়ে চর থাপ্পড় মারতে থাকে স্বপন। এসময় হকার নেতা আসাদের হুকুমে মামলার প্রধান আসামী ইকবাল মহসিনের দোকান থেকে ধারালো চাকু এনে জুবায়েরকে কুপিয়ে জখম করে। সায়মন মৃত্যু নিশ্চিত করতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জুবায়েরের হাতের রগ কেটে দেয়। অপর দুই আসামী হাসান ও সানি লোহার রড ও কাঠের ডাসা দিয়ে পিটিয়ে হাড়ভাঙ্গা জখম করে। রাসেল ও মহসিনসহ অজ্ঞাত আসামীরাও মারধর করে জুবায়েরকে ফেলে পালিয়ে যায়। পরে জুবায়েরকে উদ্ধার করে প্রথমে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল ও পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। মামলায় বাদি উল্লেখ করেন পূর্ব পরিকল্পিত তার ছেলে জুবায়েরকে হত্যা করা হয়েছে।
মামলার আসামীরা হলো, সোনারগাঁও থানাধীন বুরুমদীর আব্দুস সামাদ মুন্সীর ছেলে ইকবাল হোসেন, একই এলাকার সামসুদ্দিনের পুত্র হকার নেতা আসাদুল ইসলাম আসাদ, বন্দর বাগবাড়ী ১১৯ উইলসন রোডের মৃত নূর ইসলামের পুত্র মো: স্বপন, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ থানাধীন উত্তর কুমড়াকান্দ এলাকার মো: মুহিতুর রহমানের পুত্র মো: আনোয়ার হোসেন সানি, ফতুল্লার মাসদাইর কান্দুনিয়ার বাড়ির (রফিকের মালিকানাধীন বাড়ি) ভাড়াটিয়া মৃত লোকমান বেপারীর পুত্র মো: মহসিন বেপারী, কুমিল্লার মুরাদনগর থানাধীন ভেলুয়া এলাকার মো: আব্দুল মান্নানের পুত্র সায়মন ওরফে ইউনুস মিয়া, একই এলাকার মো: কবির হোসেনের পুত্র মো: হাছান আল মামুন, কুমিল্লার বাঙ্গারাবাজার থানাধীন চাপিতলা দক্ষিণপাড়া এলাকার মো: ইয়ার হোসেনের পুত্র মো: রাসেল হোসেন।
এরপর ৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। হকার নেতা চাঁদাবাজ আসাদ ও তার পালিত সন্ত্রাসীরা মামলার বাদিকে মামলা তুলে নিতে এবং কোর্টে না যেতে হুমকী দিয়েছিল। পরে তিনি বিষয়টি ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন। এছাড়া হকার জুবায়েরকে যারা হাসপাতালে নিয়েছিল এবং পুলিশ যাদের নাম চার্জশীটে স্বাক্ষী হিসেবে অর্ন্তভুক্ত করেছে তাদের কাউকেই আর ফুটপাতে বসতে দেয়নি হকার নেতা আসাদ ও তার অনুগামীরা। স্বাক্ষী দেয়ায় স্বাক্ষীদের মারধরও করে আসাদ ও তার পালিতরা। তবে স্বাক্ষীদের ফুটপাতে বসতে না দিলেও আসাদের মনোনীতরা সেখানে ঠিকই বসেছে।
২০২৫ সালের ৬ মে নারায়ণগঞ্জে শহরে আলোচিত হকার জুবায়ের হত্যা মামলায় ৪ জনের মৃত্যুদÐ ও দুইজনের যাবজ্জীবন কারাদÐ দিয়েছেন আদালত। ওইদিন দুপুরে অতিরিক্ত দায়রা জজ ৪র্থ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান ভূঁইয়া ৫ জনের উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন। এসময় একজন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হাসান পলাতক ছিল। মৃত্যুদÐপ্রাপ্তরা হলঃ ইকবাল ওরফে ডাক্তার, স্বপন, সায়মন ও সানি। যাবজ্জীবন কারাদÐপ্রাপ্তরা হলেন- রাসেল ও হাসান। খালাসপ্রাপ্তরা হল, হকার নেতা আসাদ ও মহসিন।
হকারদের সূত্রে জানা গেছে, হকার নেতা আসাদ তার পালিত সন্ত্রাসীদের দিয়ে হুমকী ধমকী দেয়ায় সেসময় সাক্ষীরা কেউই তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়নি। এছাড়াও ৫ আগষ্ট পট পরিবর্তনের পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র জনতা হত্যা মামলায় হকার্স লীগের নেতা রহিম মুন্সি ও আসাদ আত্মগোপনে যায়। পরে রহিম মুন্সি ও আসাদের সঙ্গে মিলে নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাতের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নেয় মহানগর বিএনপির এক বহুল আলোচিত শীর্ষ নেতার ভাই। রহিম মুন্সি আত্মগোপনে থাকলেও হকার নেতা আসাদ কিছুদিন পরে ফিরে আসে। এরপর সে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতারও হয়। পরে মহানগর বিএনপির কয়েকজন নেতাদের আর্শিবাদে আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসে আসাদ। শুধু জামিনেই নয় আইনের ফাঁকফোকরে এরপর হকার জুবায়ের হত্যা মামলা থেকেও খালাস পেয়ে যায় হকার নেতা আসাদ। বর্তমানে রহিম মুন্সিকে চাষাঢ়া এলাকায় প্রকাশ্যে দেখা গেছে। শহরের চাষাঢ়ায় সোনালী ব্যাংকের সামনে রহিম মুন্সি ও তার অনুগামীদের দোকান এখনো বহাল রয়েছে। একই ভাবে সাধু পৌলের গির্জার সামনেও আসাদ ও তার অনুগামীদের দোকান এখানো বহাল রয়েছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পরে শহরের ফুটপাতে হকার কমার বদলে বেড়েছে। মূলত বিএনপির কয়েকজন নেতার হাত ধরেই ফুটপাতে বর্তমানে চাঁদাবাজির মহোৎসব চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের উস্কানীতে ফুটপাত সড়ক দখলদার হকাররা ইতোমধ্যে নাসিকের উচ্ছেদকারী টিমের উপর একাধিক হামলার ঘটনাও ঘটিয়েছে। এসব সুবিধাভোগী বিএনপি নেতাদের অর্থলোভের কারণে নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান একাধিকবার হকার পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েও ব্যর্থ হচ্ছেন বলে অভিমত নগরবাসীর।






















-20261014113949.jpg)












আপনার মতামত লিখুন :