দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। এই শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জেও গড়ে উঠেছে শত শত পোশাক কারখানা। এসব কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন হাজারো শ্রমিক। তাদের শ্রমে সচল থাকছে শিল্পের চাকা, তৈরি হচ্ছে রপ্তানিপণ্য। তবে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। আগুন লাগলে দ্রুত বের হওয়ার পথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের পর্যাপ্ততা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শ্রমিক ও শ্রমিক নেতারা।
নারায়ণগঞ্জে ছয় শতাধিক পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রায় তিন হাজার কলকারখানা রয়েছে। বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থানের এই এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তার সামান্য ঘাটতিও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কারখানায় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম স্থাপন করাই যথেষ্ট নয়, সেগুলো সচল রাখা, জরুরি নির্গমনপথ খোলা রাখা এবং আগুন লাগলে শ্রমিকদের দ্রুত নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও নিশ্চিত করতে হবে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, অনেক কারখানায় উৎপাদন ও কাজের চাপকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, নিরাপত্তার বিষয়টি ততটা গুরুত্ব পায় না। আগুন লাগলে বের হওয়ার পথ ব্যবহারযোগ্য আছে কি না, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ঠিকমতো কাজ করছে কি না কিংবা শ্রমিকেরা জরুরি পরিস্থিতিতে কী করবেন এসব বিষয়ে ঘাটতি থাকার অভিযোগও রয়েছে। জীবিকার তাগিদে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেও কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হন অনেকে। তাদের ভাষ্য, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের জীবন ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হলে এ ধরনের অভিযোগ থাকার কথা নয়।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি এমএ শাহীন বলেন, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি থাকলে শিল্পকারখানায় দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে মালিকপক্ষের আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। একই সঙ্গে কারখানায় প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রাখা এবং শ্রমিকদের নিয়মিত সচেতনতা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি মো. হাফিজুল ইসলামও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, কারখানায় নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলেই হবে না, তা কার্যকর আছে কি না, সেটিও নিয়মিত যাচাই করতে হবে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগে থেকেই ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
তবে মালিকপক্ষের দাবি, নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ কারখানায় বর্তমানে অগ্নিনিরাপত্তা ও অগ্নিনির্বাপণের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রয়েছে। শিল্পাঞ্চলগুলোতে ফায়ার স্টেশন স্থাপনের ফলে দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর দ্রুত সাড়া দেওয়ার সুযোগও বেড়েছে।
নারায়ণগঞ্জ বিসিক গার্মেন্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বিকেএমইএর সহসভাপতি মোরশেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। শিল্পকারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মালিকদের আরও সচেতন থাকতে হবে। শুধু পোশাক কারখানা নয়, সব ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানেই শ্রমিকদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিনের দাবি, অন্যান্য জেলার তুলনায় নারায়ণগঞ্জের কারখানাগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ভালো। বর্তমানে অনলাইনে কারখানার অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। অগ্নিনিরাপত্তার শর্ত পূরণ না হলে অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা রয়েছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি অগ্নিকআণ্ডের সময় করণীয় সম্পর্কে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা তৈরিতে ফায়ার সার্ভিস কাজ করছে।
তবে মালিকপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিসের এসব দাবির পাশাপাশি কারখানাভিত্তিক নিরাপত্তাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম থাকলেও সেগুলো সচল কি না, জরুরি নির্গমনপথ বাধামুক্ত রয়েছে কি না এবং শ্রমিকেরা নিয়মিত মহড়ায় অংশ নিচ্ছেন কি না, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করে দুর্ঘটনার সময় প্রাণহানি এড়ানোর সক্ষমতা।
শিল্পের বিকাশ ও রপ্তানি আয়ের হিসাবের পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, একটি অগ্নিকাণ্ডে শুধু কারখানার সম্পদই নষ্ট হয় না, মুহূর্তেই বিপন্ন হয়ে পড়ে বহু শ্রমিকের জীবন এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের ভবিষ্যৎ। তাই দুর্ঘটনার পর ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে আগেই কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা, নিয়মিত পরিদর্শন এবং শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।





































আপনার মতামত লিখুন :