নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে নারায়ণগঞ্জ জেলা ট্রাক ট্যাংকলরি কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাব্বির আহমেদ শহীদ ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে উঠা চাঁদাবাজি ও অপহরণের অভিযোগ এবার প্রকাশ্যে এসেছে। নিতাইগঞ্জে শহীদ ও তার অনুগামীরা শ্রমিক ইউনিয়নের আড়ালে গড়ে তুলেছে টর্চার সেল এমনটিই অভিযোগ এক ভুক্তভোগীর। শনিবার বিকেলে টর্চার সেল থেকে পালিয়ে বেঁচে ফেরা অপহৃত ট্রাক মালিক রাশেদ আহত অবস্থায় নিজের উপর চলা অত্যাচারের বর্ননা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
রাশেদ দীর্ঘদিন ধরে নিতাইগঞ্জে ট্রাক শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। সম্প্রতি ধার দেনা করে নিজে একটি ট্রাক ক্রয় করেন। সেই থেকেই তার ট্রাকের উপর নজর পরে শহিদ গ্রæপের সদস্যদের। কৌশলে ডেকে এনে তাকে অপহরণ করে আটকে রাখে এবং ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবী করে। সেই টাকা না দিলে তার ট্রাক তাদের নামে লিখে দিতে হবে অথবা দিতে হবে প্রাণ। এমনই নির্মম নির্যাতনের খবরে শিউরে উঠেছেন নিতাইগঞ্জের ব্যবসায়ীরা।
শনিবার আহত অবস্থায় রাশেদ বলেন, স্ট্যান্ডের সেক্রেটারি শহীদের লোকজন আমার থেকে তারা ২০ লাখ চাঁদা চাইছে। টাকা না দিলে আমি কয়েকদিন আগে যেই ট্রাক কিনছি সেটা ওদের নামে লিখে দিতে হবে। নাহলে আমাকে মেরে ফেলবে। আমাকে সকাল ১১ টায় অপহরণ করে নিয়েছে। আমি ছাদ থেকে লাফিয়ে পালায়া হাসপাতালে আসছি। ওর নাকি ৫০ লাখ টাকা লাগবো। এজন্য আমার মত চারজনকে অপহরণ করে ৫০ লাখ টাকা আদায় করবে।
কারা এই ঘটনার সাথে জড়িত জানতে চাইলে বলেন, শহীদের অনুসারী শুভ, শাহীন, আরাফাত, ইমরান, রাজীব সহ আরও কয়েকজন মিলে আমাকে মারধর করে। এর আগে সকাল ১০ টায় শাহীন আমাকে ফোন দিলেও আমি রিসিভ করিনাই। এরপর শুভ আমাকে ফোন দিয়ে ডেকে এনে তাদের ক্লাবে নিয়ে যায়। সেই ক্লাবের পাশে কয়েকদিন আগে মার্ডার হয়েছে। সেখানে নিয়ে আমাকে আটকে রেখে দফায় দফায় মারধর করে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপায়। টাকা না পেলে আমার স্ত্রীকে ধর্ষণ করার হুমকি দেয়, এবং আমার সন্তানকে বিক্রি করে দেয়ার হুমকি দেয়। পুরো নিতাইগঞ্জ ট্রাক স্ট্যান্ড এখন সন্ত্রাসের রাজত্ব হয়ে উঠেছে।
শহীদ ও বাপ্পীর বিরুদ্ধে কাশিপুর, বাবুরাইল, মাসদাইর, নিতাইগঞ্জ, শহীদনগর এলাকায় সাধারণ মানুষকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে। ভুক্তভোগীরা নীরবে মুক্তিপন দিয়ে মুক্তি পেয়ে ফিরে আসতো। ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে কোন কথা বলার সাহস পেত না। এবারই স্ট্যান্ডের একজন ভুক্তভোগী মারধরের পর পালিয়ে মুক্তি পেয়ে অপহরণের খবর প্রকাশ্যে আনে।
শুধু অপহরণই নয়, এই অত্র অঞ্চলের পুরো মাদক ব্যবসা, ভুমিদস্যুতা, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে এই শহীদ বাপ্পী গ্যাং। এরা অতীতে শামীম ওসমান, আজমেরী ওসমানের ছত্রছায়ায় এলাকায় গড়ে তুলে অপরাধের রাজত্ব। ক্ষমতার পালাবদলে রাতারাতী তারা বিএনপির সাইনবোর্ড ব্যবহার করে বিএনপি নেতা রূপ ধারণ করেছে। আর চালাচ্ছে রামরাজত্ব।
অনুসন্ধানে বেশ কয়েকটি নাম উঠে এসেছে। এই অপরাধীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পশ্চিম দেওভোগ এলাকার রাজু সাজু, বাবুরাইল শেষ মাথা এলাকার শহিদ, বাবুরাইল তাতিপাড়া এলাকার সবুজ, নয়াপাড়া এলাকার বাপ্পি শিকদার, হাটখোলা এলাকার মোল্লা রবিন এবং মোল্লা বাপ্পি। এছাড়া সক্রিয় সদস্যদের মধ্যে আছে সানি, তোরান, মুন্না, পায়েল, অনিক, ফরিদ সহ অনেকে।
এই মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারী চক্র এখন এতটাই শক্তিশালী যে তারা খোদ এলাকায় কারখানা বসিয়ে তৈরী করছে ইয়াবা। কাঁচামাল বাইরে থেকে নিয়ে এসে কাশিপুরের ৮ এবং ৬ নং ওয়ার্ডের দুটি স্পটে কারখানায় তৈরী হচ্ছে ইয়াবা। এরপর সেগুলো সদস্যদের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয় ফতুল্লা থানার অন্যান্য ইউনিয়ন, শহর এবং মুন্সিগঞ্জে। এছাড়া প্রতিটি এলাকায় রয়েছে তাদের নিজস্ব এজেন্ট। বিশেষত কাশিপুর আমবাগান, হাসেমবাগ, বাশমুলী, হোসাইনি নগর, ইব্রাহিম ব্রিজ, ব্যাংক কলোনী, বাংলাবাজার, খিল মার্কেট, আমবাগান, তাতিপাড়া, মুন্সিবাড়ি উল্লেখযোগ্য।
এসব মাদক ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে প্রায় সব তথ্যই রয়েছে পুলিশের কাছে। একদিকে একশ্রেনীর পুলিশ সদস্যকে হাত করেই চলছে এই মাদক ব্যবসা। অন্যদিকে এই অঞ্চলে পুলিশের কোন কোন অফিসার অভিযান চালাতে চাইলেও হামলার ভয়ে সেভাবে সাহস করছে না। পেছনে রয়েছে তাদের সিসিটিভি ও নিজস্ব সোর্স দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বাহিনী। যারা দ্রæত খবর দিয়ে সরিয়ে দেয় অপরাধীদের। আর সেটাতে ব্যার্থ হলে চালায় হামলা।
সম্প্রতি ফতুল্লার মাসদাইরে র্যাবের গোয়েন্দা তিন সদস্যের উপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়। যেই হামলায় তিন র্যাব সদস্য গুরুত্বর আহত হন। এই হামলার সাথে জড়িতরা উল্লেখিত গ্রæপের সাথে সম্পৃক্ত বলেই জানা গেছে। একই ভাবে দেওভোগে সাবেক পুলিশ সদস্যের বাড়িতে লুটপাট চালানোর ঘটনায় পুলিশ হাজির হলে এই গ্রæপের সদস্যরাই এসে পুলিশকে ঘেরাও করে ৫ অপরাধীকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। ধারালো অস্ত্রের মহড়া দেখে পুলিশ নিজেরাই পিছু হটে। এভাবে একের পর এক অপরাধ করে যাচ্ছে নির্বিঘেœ।
এসব অপরাধীদের বিষয়ে পুলিশ ও র্যাব অবগত থাকলেও সমাধান করতে পারছে না কেউই। স্থানীয় বাসিন্দারা এই অপরাধ চক্রের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে পড়েছে। বাসিন্দারা জানান, এই অঞ্চলে এখন কোন মানুষ স্বাভাবিক ভাবে চলাচল করতে পারছে না। এমনকি বাসার ভেতরেও শান্তি এই এই এলাকায়। সন্ধ্যার পর থেকে ছিনতাই এখন নিত্যদিনের ঘটনা। বাসা বাড়ির এসির কম্প্রেসার খুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে রাতের আধারে। এমনকি বাসার থাই গøাসও রক্ষা পাচ্ছে না।
কেউ জমি বিক্রি বা কিনতে চাইলেই দিতে হচ্ছে চাঁদা। বাসা বাড়ির সংস্কার কাজ করতে গেলেও মালামাল সরবরাহের নামে উচ্চ মূল্যে কিনতে হচ্ছে রড, সিমেন্ট, ইট, বালু। পুলিশকে এদের ব্যাপারে অভিযোগ দিলে বিস্ময়কর ভাবে তথ্য জেনে যায় অপরাধীরা। অথচ পুলিশের কাছে দেয়া তথ্য গোপন থাকার কথা। তথ্য ফাঁস হয়ে যাবার কারনে এখন আর কেউ সাহস করে অভিযোগও দিতে পারে না।
































আপনার মতামত লিখুন :