News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

দুই বছরে যতটা বদলেছে রাজনীতির মাঠ


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: অক্টোবর ১৬, ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম দুই বছরে যতটা বদলেছে রাজনীতির মাঠ

একসময় নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির মাঠ মানেই ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, প্রভাবশালী নেতাদের আধিপত্য, দলীয় কার্যালয়কেন্দ্রিক তৎপরতা আর রাজপথ দখলের প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগের প্রভাব ছিল দৃশ্যমান। জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের রাজনীতিতেও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব ছিল প্রবল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই চিত্র আমূল বদলে গেছে। দুই বছর পর এসে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির মাঠে নেই আগের সেই আওয়ামী লীগ, বদলে গেছে নেতৃত্বের বিন্যাস, নতুন করে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে বিএনপি, আর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উঠে এসেছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি। তবে পরিবর্তনটি শুধু দলীয় পালাবদলে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনীতির ভাষা, নেতৃত্বের ধরন, নির্বাচনী সমীকরণ এবং মাঠের শক্তির হিসাবেও এসেছে বড় পরিবর্তন।

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়। নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের চারটিতে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা এবং একটি আসনে এনসিপির প্রার্থী জয়ী হন। নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে নজরুল ইসলাম আজাদ, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে আজহারুল ইসলাম মান্নান, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আবদুল্লাহ আল আমিন এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে আবুল কালাম বিজয়ী হন। এ ফলাফল শুধু পাঁচটি আসনের নির্বাচনী ফল নয়; বরং ৫ আগস্টের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি বড় প্রতিফলন বলেই মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।

৫ আগস্টের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে আওয়ামী লীগের অবস্থানে। দীর্ঘদিন জেলার রাজনীতিতে প্রভাবশালী থাকা দলটির জেলা ও মহানগরের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বড় অংশ আত্মগোপনে চলে যান। দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাবেক মন্ত্রী, সাবেক মেয়র ও সাবেক সংসদ সদস্যসহ আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতা গ্রেপ্তার, আত্মগোপন কিংবা এলাকার বাইরে অবস্থান করছেন।

আওয়ামীলীগের পতনের পর স্বাভাবিকভাবেই রাজপথে সবচেয়ে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে বিএনপি। দীর্ঘ সময় মামলা, হামলা ও গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নিয়ে রাজনীতি করা বিএনপির নেতাকর্মীরা ৫ আগস্টের পর প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরতে শুরু করেন। সভা-সমাবেশ, মিছিল, সাংগঠনিক কর্মসূচি ও নির্বাচনী প্রস্তুতিতে দলটির সক্রিয়তা বাড়তে থাকে।

২০২৬ সালের নির্বাচনে পাঁচ আসনের চারটিতে জয় বিএনপিকে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে বড় ধরনের সাংগঠনিক ও নির্বাচনী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে এই সাফল্যের সঙ্গে দলটির সামনে এসেছে নতুন চ্যালেঞ্জও। দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকা বিএনপির নেতাকর্মীদের এখন জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং মাঠের রাজনীতিকে সংঘাতের বদলে জনসম্পৃক্ততার দিকে নেওয়ার চাপ রয়েছে।

তবে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির পর বিএনপির জন্য মাঠ পুরোপুরি ফাঁকা থাকেনি। ৫ আগস্টের পর নারায়ণগঞ্জে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির তৎপরতাও বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই দুই দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জের এই আসনে বিএনপির একাধিক পরিচিত নেতার পাশাপাশি এনসিপির আবদুল্লাহ আল আমিন এবং জামায়াত-সমর্থিত রাজনৈতিক শক্তির প্রার্থীও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলেন। একটি আসনে এনসিপির জয় তাই নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন একটি বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। আগে যেখানে আওয়ামী লীগ-বিএনপি দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য, সেখানে এখন বিএনপির পাশাপাশি নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোও নিজেদের জায়গা তৈরির চেষ্টা করছে।

দুই বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনীতির মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি এখন জেলার স্বার্থে সমন্বয়ের কথাও সামনে আসছে। এরই একটি উদাহরণ মিলেছে ৮ আগস্ট। নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে মতবিনিময় সভায় জেলার পাঁচ সংসদীয় আসনের এমপিরা একসঙ্গে উপস্থিত হয়ে নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার কথা জানিয়েছেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও জেলার স্বার্থে এক থাকার এই বার্তা স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন ধরনের সমন্বয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

দুই বছরে দল বদলেছে, নেতৃত্ব বদলেছে, সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব বদলেছে। কিন্তু মাঠের রাজনীতির সংস্কৃতি কতটা বদলেছে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। দখল, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার এসব অভিযোগ যদি নতুন বাস্তবতায়ও থেকে যায়, তাহলে শুধু দলীয় পালাবদলকে রাজনৈতিক পরিবর্তন বলা কঠিন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়া চলমান থাকায় রাজনৈতিক প্রতিশোধের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠছে। অর্থাৎ দুই বছর পরও রাজনীতি পুরোপুরি সংঘাতমুক্ত হয়নি। বরং পুরোনো শক্তির জায়গায় নতুন শক্তি এসেছে এবং নতুন শক্তিগুলোর মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে।

দুই বছর আগে ৫ আগস্টের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি যে জায়গা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল, আজকের চিত্র তার সঙ্গে এক নয়। আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের আধিপত্য ভেঙেছে, বিএনপি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে, নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এনসিপি সংসদে জায়গা করে নিয়েছে, জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলোও নিজেদের ভোটের পরিসর বাড়ানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের উত্থান ঘটেছে এবং জেলার স্বার্থে দলমত নির্বিশেষে সমন্বয়ের কথাও সামনে এসেছে। তবে পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন সামনে। ক্ষমতার পালাবদলকে যদি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনে রূপ দেওয়া যায়, তাহলে ৫ আগস্ট-পরবর্তী দুই বছর নারায়ণগঞ্জের জন্য সত্যিকারের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হবে। আর যদি পুরোনো আধিপত্য, সংঘাত, দখল ও প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি নতুন নামে ফিরে আসে, তাহলে পরিবর্তনটি শুধু ক্ষমতার পালাবদল হিসেবেই থেকে যাবে। তাই দুই বছর পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির মাঠে পরিবর্তন স্পষ্ট কিন্তু সেই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী ও গুণগত, তার উত্তর এখনো পুরোপুরি মেলেনি।