News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

হকার উচ্ছেদে সর্ষের মধ্যে ভূত


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ১০:০২ পিএম হকার উচ্ছেদে সর্ষের মধ্যে ভূত

নারায়ণগঞ্জ শহরের বাসিন্দাদের ভোগান্তির অপর নাম হলো হকার। এখানকার হকাররা প্রতিদিন সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত শহরের প্রধান সড়কের ফুটপাতগুলো দখলে রাখে। ফুটপাতের পাশাপাশি রাস্তাও তারা দখলে রাখে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার হয়ে আসছেন নারায়ণগঞ্জ শহরবাসী। কিন্তু কোনোভাবেই যেন এই হকারদের দমানো যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি সব সরকারের সময়েই সর্ষের মধ্যে ভূত থাকার কারণে হকাররা থেকেই ফুটপাতে থেকে যায়।

বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রয়েছে বিএনপি। আর এই বিএনপি সরকারের সময়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের হকারদের আশ্রয় দিয়ে আসছে বিএনপির কোনো নেতা ও তাদের অনুসারীরা। বিএনপির সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ফুটপাত দখলমুক্ত করণে হকার উচ্ছেদ অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকেই বিএনপির কোনো নেতা হকারদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে আসছেন। হকারদের কাছ থেকে আর্থিক সহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার বিনিময়ে ফুটপাতে বসার সুযোগ দিয়ে আসছেন। যাদের কারণে নারায়ণগঞ্জ শহরের হকার আর উচ্ছেদ হয় না।

জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে হকাররা যেন লাগামছাড়া হয়ে পড়েছিলো। সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত পুরো সড়কই দখল করে রাখতেন। এতে করে নগরবাসী অসহনীয় ভোগান্তির শিকার হয়ে আসছিলেন। এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে বিএনপি। আর এই ক্ষমতায় আসার পর নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান।

সেই সাথে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান নিয়োগ পাওয়ার পর নগরবাসীর প্রত্যাশা তিনি যেন নগরবাসীকে হকারদের ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেন। তারই অংশ হিসেবে গত ১৩ এপ্রিল শহরের সকল সড়কের ফুটপাতে সম্মিলিতভাবে হকারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে সিটি করপোরেশন। এর পর কয়েকদিন পর্যন্ত মোটামুটি শহরের ফুটপাত ছিল ফাঁকা। তবে হকাররা ফুটপাতে ফেরার জন্য চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। তারা বিভিন্ন জায়গায় দেন দরবার করতে থাকেন। কিন্তু এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ভূমিকা ছিলো খুবই কঠোর অবস্থান জানান দিয়ে আসছিলেন।

কিন্তু পরোক্ষভাবে বিএনপির কয়েকজন নেতা হকারদের ফুটপাতে বসার সুযোগ করে দেয়ার ব্যাপারে আশ^াস দিয়ে আসছিলেন। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনাকালিন সময়েও তাদেরকে কয়েকদিনের জন্য ফুটপাত থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন।

কয়েকজন হকারের সাথে কথা বলে বলে জানা যায়, হকাররা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। সিন্ডিকেটের বাইরে যারা রয়েছেন তাদের পরিমাণ খুবই কম। আর এই সিন্ডিকেটের আড়ালে রয়েছেন বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হকাররা আশ^স্ত হন অভিযান পরিচালনার কয়েকদিন পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশর কঠোর ভূমিকায় হকাররা ফুটপাতে বসার সুযোগ পাচ্ছিলেন না।

সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ কর্মীরা প্রতিনিয়ত হকার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে আসছিলেন। ফুটপাতে হকার পেলেই তাদের মালামাল জব্দ করা হতো। সেই সাথে হকাররাও ফুটপাতে বসতে পারতো না। আর এই উচ্ছেদ অভিযান চলাকালিন সময়ে হকাররা তাদের আক্রমণাত্বক রূপ দেখিয়েছেন। গত ৪ মে শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে কয়েকজন উচ্ছেদ কর্মীকে বেধড়ক মারধর করেছে।

সবশেষ নারায়ণগঞ্জ শহরে হকার উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের ওপড় হামলার চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। গত ২৫ অক্টোবর রাতে শহরের বঙ্গবন্ধু সড়ক ও শায়েস্তা খান সড়কে হকার উচ্ছেদ অভিযানের সময় এই ঘটনা ঘটে। ঘটনার খবর পেয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে এই ঘটনার পিছনে বিএনপির কোনো কোনো নেতা কিংবা তাদের অঙ্গ সহযোগি সংগঠনের নেতাদের ইঙ্গিত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর আগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জেলা পুলিশ প্রশাসন ২০১৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর থেকে হকারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে গিয়ে ফুটপাত ফাঁকা করে দিয়েছিলো। আর প্রশাসনের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিলেন তৎকালিন সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী। ফলে হকাররা কোন ভাবেই ফুটপাতে বসতে ব্যর্থ হয়ে আন্দোলন শুরু করেন হকাররা। এর ধারবাহিকতায় ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর মেয়র আইভীকে স্মরকলিপি প্রধান করেন। ওই সময় আইভীর বক্তব্যে পরই হকাররা আন্দোলনমুখর হয়ে যায়।

এরপর একের পর এক কর্মসূচি পালন ও স্থানীয় এমপি শামীম ওসমান এবং সেলিম ওসমানের কাছে যান হকাররা। ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি হকারদের সমাবেশে শামীম ওসমান হকারদের বঙ্গবন্ধু সড়কে বসার জন্য পক্ষে বক্তব্য দেন। আর পরদিনই হকারা আইভীর উপর হামলা চালায়। যেখানে যুক্ত হয় শামীম ওসমানের অনুগামী নেতাকর্মীরাও। ইট পাটকেলের সঙ্গে গুলি করা হয় মেয়র আইভীকে লক্ষ্য করে। সেসময় মেয়র আইভী সহ অর্ধশতাধিক তার অনুগামী নেতাকর্মী আহত হয়। এছাড়া পরেও প্রায়শই হকারদের পক্ষেই কথা বলেন শামীম ওসমান।

ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে হত্যাচেষ্টার পর পুলিশকে হত্যার চেষ্টা করেন বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতে বসা হকাররা। সদর মডেল থানায় একটি মামলা করে পুলিশ। ২০২১ সালের ৯ মার্চ বিকেলে ফুটপাতে বসার দাবীতে হকাররা বিক্ষোভ করে। সেদিন পুলিশের সাথে মারামারির ঘটনা ঘটে। আর সেই সময়ে হকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া আব্দুর রহিম মুন্সী ও আসাদুজ্জামান শামীম ওসমানের নির্দেশনায় পরিচালিত হতো। সেই সাথে সে সময় ফুটপাত হকারমুক্ত না হওয়ার পিছনে শামীম ওসমানের স্পষ্টই ইঙ্গিত ছিলো বলে ধরে নেয়া হয়।

এরপর সেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হকারদের আশ্রয়দাতা হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে মহানগর হকার্স শ্রমিক দল। আর তাদের নেতৃত্বেই বর্তমানে হকারদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে। যাদেরকে যেন কোনোভাবেই দমন করা যাচ্ছে না।