News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩

মাদকে অসহায় নগরবাসী


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২৬, ১০:১৮ পিএম মাদকে অসহায় নগরবাসী

একসময় শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যের জন্য পরিচিত নারায়ণগঞ্জ এখন ক্রমেই আরেকটি ভয়াবহ পরিচয়ের দিকে এগোচ্ছে মাদকের নিরাপদ রুট ও বাজার হিসেবে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি, সংঘবদ্ধ কারবারিদের দৌরাত্ম্য, কিশোর-তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তির বিস্তার এবং মাদককে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা অপরাধ সাধারণ মানুষের উদ্বেগকে চরমে পৌঁছে দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক নজরদারির কিছুটা শিথিলতার সুযোগ নিয়ে মাদক চক্রগুলো আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ফলে শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে জনবহুল এলাকাগুলো পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিলের অবাধ বেচাকেনা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নারায়ণগঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থান মাদক ব্যবসার বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে। রাজধানীর সঙ্গে সহজ যোগাযোগ, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, নৌপথ ও আশপাশের জেলার সংযোগকে কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ চক্র সহজেই মাদক পরিবহন ও সরবরাহ করছে। একসময় যেসব এলাকায় গোপনে মাদক লেনদেন হতো, এখন সেসব স্থানের অনেকগুলোই প্রকাশ্য মাদক স্পটে পরিণত হয়েছে।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। গত ৫ মে শহরের বোয়ালিয়া খাল লিচুবাগ এলাকায় ওয়ারেন্টভুক্ত এক আসামিকে ধরতে গিয়ে র‌্যাব-১১ এর সদস্যরা সশস্ত্র হামলার মুখে পড়েন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তিন সদস্য গুরুতর আহত হন। পরে একই দিনে পৃথক দুটি অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, দেশীয় ধারালো অস্ত্র, নগদ অর্থ, সিসি ক্যামেরা, একটি ড্রোন, ২৩৫ কেজি গাঁজা এবং ১১ হাজার পিস ইয়াবাসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল সাম্প্রতিক সময়ে জেলার অন্যতম বড় মাদকবিরোধী অভিযান।

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, এত বিপুল পরিমাণ মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার হওয়ার অর্থ হলো দীর্ঘদিন ধরেই এসব চক্র সংগঠিতভাবে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর অভিযান থাকলে এত বড় নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার সুযোগ পেত না বলেও তাদের দাবি।

মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের অন্তত ২০টি এলাকায় নিয়মিত মাদকের বেচাকেনা চলছে। এর মধ্যে চাষাঢ়া, ২ নম্বর রেলস্টেশন, গলাচিপা-উকিলপাড়া রেললাইন, জামতলা, মন্ডলপাড়া পুল, জিমখানা বস্তি, আমলাপাড়া, মাসদাইর, ইসদাইর, বাবুরাইল, দেওভোগ, জল্লারপাড়া, পাইকপাড়া, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, নিতাইগঞ্জসহ আরও কয়েকটি এলাকা উল্লেখযোগ্য। এসব এলাকায় নির্দিষ্ট কিছু খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও হেরোইন সরবরাহ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, অনেক জায়গায় ক্রেতাদের খুঁজে বের করারও প্রয়োজন হয় না; নির্দিষ্ট স্থানে গেলেই সহজে মাদক পাওয়া যায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় অপরিচিত যুবকদের আনাগোনা বেড়ে যায়। গভীর রাত পর্যন্ত চলে মাদক কেনাবেচা। প্রতিবাদ করতে গেলে হুমকি কিংবা ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনাও ঘটে। ফলে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পান না।

মাদকের ভয়াবহ প্রভাব এখন শুধু আসক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, শহরে সংঘটিত চুরি, ছিনতাই, মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া, বাসাবাড়িতে চুরি, এমনকি কিছু সহিংস অপরাধের সঙ্গেও মাদকাসক্তদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। মাদকের অর্থ জোগাড় করতেই অনেক তরুণ অপরাধের পথে জড়িয়ে পড়ছে। এতে সামাজিক নিরাপত্তা যেমন বিঘিœত হচ্ছে, তেমনি পরিবারগুলোও চরম সংকটে পড়ছে।

শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মতে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কিশোর ও তরুণ সমাজ। স্কুল-কলেজপড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী কৌতূহল কিংবা বন্ধুদের প্রভাবে প্রথমে মাদক গ্রহণ শুরু করে, পরে তা আসক্তিতে রূপ নেয়। একসময় লেখাপড়া ছেড়ে অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটছে। ফলে একটি সম্ভাবনাময় প্রজন্ম ধ্বংসের মুখে এগিয়ে যাচ্ছে।

সামাজিক সংগঠনগুলোর দাবি, শুধু অভিযান চালিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি, মাদক কারবারিদের অর্থের উৎস শনাক্ত করা, সীমান্ত ও পরিবহন ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি এবং মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগ।

নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি মনে করেন, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ই দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসাকে টিকিয়ে রেখেছে। তার ভাষ্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলেও পুরোনো চক্রের জায়গায় নতুন চক্র তৈরি হয়। ফলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। তিনি আরও অভিযোগ করেন, মাঠপর্যায়ের কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতা থাকায় অনেক সময় বড় কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, প্রশাসনের আন্তরিকতা ও কঠোর অবস্থান থাকলে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, শুধু খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না; গডফাদার, অর্থদাতা ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের ভেতরে কোনো ধরনের দুর্বলতা বা অনিয়ম থাকলে তা দূর করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযানকে আরও ধারাবাহিক ও গোয়েন্দাভিত্তিক করতে হবে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের দ্রুত জামিনে বের হয়ে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা ঠেকাতে আইনি প্রক্রিয়াও আরও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, সামাজিক সংগঠন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি।

শিল্প, ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জেলার ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে হলে মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার বিকল্প নেই। অন্যথায় মাদক শুধু একটি অপরাধের বিষয় হিসেবেই নয়, বরং নারায়ণগঞ্জের সামাজিক স্থিতিশীলতা, তরুণ প্রজন্ম এবং সামগ্রিক জননিরাপত্তার জন্য আরও বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে।