News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩

নূর হোসেনের সাম্রাজ্য : আওয়ামী লীগে নিয়ন্ত্রণ, বিএনপিতে সমঝোতা!


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | সিদ্ধিরগঞ্জ প্রতিনিধি প্রকাশিত: জুলাই ১০, ২০২৬, ১০:২৪ পিএম নূর হোসেনের সাম্রাজ্য : আওয়ামী লীগে নিয়ন্ত্রণ, বিএনপিতে সমঝোতা!

নূর হোসেন| এটি শুধু একটি নাম নয়, এর পেছনে রয়েছে সাতটি তাজা প্রাণ কেড়ে নেওয়া এক নরঘাতকের কালো অধ্যায়ের গল্প যা বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও সমালোচিত হয়েছে| ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়া সত্বেও আওয়ামী শাসনামলে কারাগার থেকে স্বজন দ্বারা নিজের সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ রেখেছেন এই শীর্ষ সন্ত্রাসী| ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ হারালেও সময়ের পরিক্রমায় আবারও সেই সাম্রাজ্যের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক নূর হোসেন|

৮০ এর দশকে ট্রাকের হেলপার থেকে প্রথমে ট্রাকস্ট্যান্ডের সভাপতি, এরপর জাতীয় পার্টিতে যোগদান করে দল পাল্টে ৯০ এর দশকে বিএনপির রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছিলেন| তবে বিএনপিতে যুক্ত হয়ে সুবিধাজনক অবস্থান ˆতরিতে ব্যর্থ হওয়ায় ৯০ দশকেই আবারও দল বদলে আওয়ামী রাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে নারায়ণগঞ্জের অন্যতম গডফাদারে রুপান্তরিত হয়ে উঠে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের বহিস্কৃত সহ-সভাপতি ও সাবেক ৪নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূর হোসেন| ক্যারিয়ারে একাধিক রাজনৈতিক দল পরিবর্তন ঘটলেও সাম্রাজ্যের স্বৈরতন্ত্রের একমাত্র শাসক তিনি| যার নিয়ন্ত্রণে বিশাল এক সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে অবৈধভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অঢেল অবৈধ গড়েছেন| তবে ২০১৪ সালে সাবেক প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে গুম করে হত্যার অপরাধে নূর হোসেন গ্রেফতার হলে তার সম্রাজ্যের হাত বদলে ভাই-ভাতিজার নিয়ন্ত্রণে যায়| যার অদৃশ্য পরিচালক ছিলেন এই নরঘাতকই|

এদিকে দীর্ঘ লম্বা সময়ের ব্যবধানে ২০২৪ এর ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলেও হোসেনের সাম্রাজ্য বহাল রয়েছে| যার পাহারাদারের তীর নারায়ণগঞ্জ জেলার বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের হাতে বলে চাউর আছে|

সাতখুনের দায়ে গ্রেফতার হবার পূর্বে ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের মাধ্যমে সন্ত্রাসী বাহিনী দ্বারা পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতের চাঁদাবাজি, মাদক বিক্রি, বালুর ঘাট, ট্রাকস্ট্যান্ড ও দখল বাণিজ্যের মাধ্যমে নূর হোসেন যে সাম্রাজ্য গড়ে গেছেন তিনি গ্রেফতারের পর সেই সম্রাজ্যের পাহারাদার হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন আপন ছোটভাই সাবেক ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর উদ্দিন, ছোটভাই নুরুজ্জামান জজ মিয়া, আরেক ভাই নূর সালাম, ভাতিজা সাবেক কাউন্সিলর ও সিদ্ধিরগঞ্জ ছাত্রলীগের আহ্বায়ক শাহজালাল বাদল, ভাগিনা আন্ত:জেলা শ্রমিকলীগ নেতা দেলোয়ার হোসেনসহ ঘনিষ্ঠ ¯^জনরা|

আলোচিত নূর হোসেনের সম্রাজ্যের পরিবহন সেক্টর,বালুর ঘাট,শিমরাইল এলাকার বিভিন্ন কারখানাসহ ৪নম্বর ওয়ার্ডের নিয়ন্ত্রণ করেছেন নূর উদ্দিন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শিমরাইলের উভয় লেনের অবৈধ ফুটপাত,বাসস্ট্যান্ড, লেগুনাসট্যান্ড, সাইনবোর্ড এলাকার চট্টগ্রামমুখী লেনের বাসস্ট্যান্ড এবং ৩নম্বর ওয়ার্ডের দখল বানিজ্যের নিয়ন্ত্রক ছিলেন ভাতিজা সাবেক কাউন্সিল শাহজালাল বাদল,শীতলক্ষ্যা নদী ঘেঁষে গড়ে উঠা বালু,পাথরসহ যাবতীয় ব্যবসার বড় অংশ, শিমরাইল ট্রাকস্ট্যান্ডের একাংশসহ বিভিন্ন সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করতেন নুরুজ্জামান জজ মিয়া, শিমরাইল মোড়সহ ৩-৪ ন¤^র ওয়ার্ডের জমি দখলসহ বিভিন্ন সেক্টর নূর সালাম এবং মাদক কারবার, যাত্রাবাড়ী টু গাউছিয়াসহ দূরপাল্লার বিভিন্ন পরিবহন খাতের চাঁদা উত্তোলন, ট্রাকস্ট্যান্ডের একাংশসহ বিভিন্ন অপরাধের নিয়ন্ত্রক ছিলেন ভাগিনা দেলোয়ার হোসেন|

এদিকে আওয়ামী শাসনামলে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানের ছত্রছায়ায় একছত্র অধিপত্যে দেখানো হোসেন পরিবার ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সাম্রাজ্যের সকল সেক্টরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে| বিশেষ করে ৫ আগস্টের দিন হতেই তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতিসহ দলটির অঙ্গ সংগঠন সর্বসেক্টরের নেতৃবৃন্দরা ভাগাভাগির মাধ্যমে নিজেদের দখলে নিয়ে যান| যা প্রায় ১৮ মাস তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল| অপরদিকে আওয়ামী সরকারের পতন ঘটার সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও স্থানীয় জনতা শাহজালাল বাদলের বাড়িঘর ভাংচুরসহ ক্ষয়ক্ষতি সাধনের প্রচেষ্টা চালালে জেলা বিএনপির বর্তমান এক শীর্ষ নেতার হস্তক্ষেপে সম্পদের রক্ষা মেলে| চাউর আছে জাতীয়তাবাদী দলের ওই শীর্ষ নেতার ছায়াতলেই হোসেন পরিবারের আশ্রয়স্থল| এছাড়াও সম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হোসেন পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে বর্তমান সাংসদের ছেলের সঙ্গে সমঝোতা বসার আলোচনাও রয়েছে|

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক সমঝোতার মধ্যস্থাকারীদের সঙ্গে চলাফেরা করা একজন বলেন,জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর ছেলের সঙ্গে ভোট কাস্টিং প্রস্তাবনা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার মৌখিক চুক্তিবদ্ধ হয়ে সমঝোতায় এসেছেন হোসেন পরিবার| যার মাধ্যমে বর্তমানেও সব সেক্টর ঘাতকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন|

স্থানীয়দের বরাতে জানা গেছে, আওয়ামী সরকারের পতনে হোসেন পরিবারের প্রায় সকল হরতাকর্তা আত্মগোপনে চলে গেলেও ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর তারা পুনরায় এলাকায় ফিরতে শুরু করেছেন| আর দিব্যিরভাবে পরিচালিত হচ্ছে সেই সাম্রাজ্যও| এছাড়াও আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে নূর উদ্দিন ও শাহজালাল বাদল পূনরায় কাউন্সিলর পদপ্রার্থী হবারও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন বলে জানা গেছে|

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী জানান,হোসেন সাম্রাজ্যের দৃশ্যমান পরিবর্তন না হবার পেছনে বিএনপির ওই শীর্ষ নেতার স্বার্থ জড়িত রয়েছেন| বিএনপি নেতার সঙ্গে ফাঁসির দণ্ডে কারাভোগ করা নূর হোসেনের সুসম্পর্ক দেড় যুগের বেশি সময়ের| অর্থাৎ দল পাল্টালেও সাম্রাজ্যের মালিক একজনই|

বিএনপি নেতারা আরও বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর হোসেনের ভাইরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল| তাদের মধ্যকার নূর সালামকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে| তবে সময়ের ব্যবধানে বর্তমানে নুরুজ্জামান জজ মিয়া এলাকায় বসবাস করছেন| একই সাথে নূর উদ্দিন ও ভাতিজা শাহজালাল বাদলও নিয়মিত যাতায়াত করে সাম্রাজ্যের ভাগ বুঝে নিচ্ছেন|