নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে ট্রাক মালিক ও চালক রাশেদকে নির্মমভাবে মারধর ও অপহরণের ঘটনা প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেছিলো জেলা পুলিশ। কুখ্যাত সন্ত্রাসী আজমেরী ওসমানের কায়দায় টর্চার সেল পরিচালনা এবং অপহরণের বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। তবে ঘটনার বেশ কিছু দিন পেরিয়ে গেলেও মূলহোতা শহীদ ও তার সহযোগীরা এখনো অধরাই রয়ে গেছে। পুরো নিতাইগঞ্জ ট্রাক স্ট্যান্ড এখন এই শহীদ ও তার অনুসারী চক্রের রামরাজত্বে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি ট্রাক চালক ও মালিক রাশেদকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে শহিদ গ্রুপের অন্যতম ক্যাডার শুভ। মুক্তিপণের টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে রাশেদকে দফায় দফায় অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে টাকা দিতে না পারলে রাশেদের সদ্য কেনা ট্রাকটি তাদের নামে লিখে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়, অন্যথায় প্রাণনাশের হুমকি মেলে। জীবন বাঁচাতে রাশেদ একপর্যায়ে টর্চার সেলের ছাদ থেকে লাফিয়ে পালিয়ে বাঁচেন এবং নিতাইগঞ্জের ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল এড়িয়ে দূরবর্তী খানপুর হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেন।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে ক্ষোভ ও আতঙ্কের সুরে ভুক্তভোগী রাশেদ বলেন, স্ট্যান্ডের সেক্রেটারি শহীদের লোকজন আমাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তারা আমার কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। টাকা না দিলে আমার নতুন ট্রাকটি লিখে দিতে বলে। শহীদের অনুসারী শুভ, শাহীন, আরাফাত, ইমরান ও রাজীবসহ কয়েকজন মিলে আমাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়েছে ও পিটিয়েছে। টাকা না দিলে আমার স্ত্রীকে ধর্ষণ এবং সন্তানকে বিক্রি করে দেওয়ার হুমকিও দেয় তারা।
এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কাশিপুর, বাবুরাইল, মাসদাইর, নিতাইগঞ্জ ও শহীদনগর এলাকায় সাধারণ মানুষকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা শহীদ ও বাপ্পীর দীর্ঘদিনের পেশা। এতদিন প্রাণের ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি। কিন্তু এবার রাশেদ পালিয়ে এসে গণমাধ্যমের সামনে মুখ খোলায় পুরো সিন্ডিকেটের অন্ধকার জগৎ প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু অপহরণ বা চাঁদাবাজিই নয়, এই অঞ্চলের মাদক ব্যবসা, ভূমিসদস্যুতা, চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক এই 'শহীদ-বাপ্পী গ্যাং'। অতীতে তারা ক্ষমতাধর রাজনৈতিক নেতা শামীম ওসমান ও আজমেরী ওসমানের ছত্রছায়ায় থেকে অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাতারাতি তারা বিএনপির 'সাইনবোর্ড' ব্যবহার করে ভোল পাল্টে ফেলে এবং নতুন করে তান্ডব শুরু করে।
এদিকে শহীদের এই বেপরোয়া অপরাধমূলক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কঠোর বার্তা এসেছে। কোনো বিএনপি নেতা যেন এই চিহ্নিত অপরাধীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় (শেল্টার) না দেন, সেই নির্দেশনা ইতিমধ্যে স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান বিএনপির একাধিক নেতাকে ফোন করে তাকে নিতাইগঞ্জের কমিটি থেকে সরিয়ে দেয়ার পরামর্শ দেন এবং নতুন করে কমিটি সাজানোর কথা বলেন। এরপর থেকেই অনেকটা লোক চক্ষুর আড়ালে আছে শহীদ।
সেই হামলার পর নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সি জানিয়েছিলেন, বিষয়টি আমি গুরুত্বের সাথে অবগত আছি। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট থানাকে এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমরা কোনো অপরাধীকে ছাড় দেব না, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।"
তবে স্থানীয়দের দাবি, একের পর এক অপকর্ম করেও শহীদ এখনো আইনের আওতায় আসেনি। তার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে নিতাইগঞ্জকে সন্ত্রাসমুক্ত করা জরুরী। তাহলে স্বস্থি পাবে সাধারণ ব্যবসায়ী ও চালকেরা।

































আপনার মতামত লিখুন :