News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩

ওস্তাদ যখন শত্রু


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০২৬, ০৯:৩৪ পিএম ওস্তাদ যখন শত্রু

গত ৮ বছর ধরেই নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হেফাজতে ইসলাম ও জমিয়তের বিভিন্ন সভা সমাবেশ, সেমিনারে অতিথি হিসেবে থাকতে মাওলানা আবু তাহের জিহাদী। তিনি একজন বুজুর্গ মাওলানা হিসেবেই আলেম সমাজে পরিচিত। নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় ঈদগাহে ঈদের নামাজের ঈমামতি করতেন। আওয়ামী লীগ আমলেই তাঁকে ঐতিহ্যবাহী দেওভোগ মাদ্রাসায় প্রিন্সিপাল তথা মুহতামিমের পদ দেওয়া হয়। তখন থেকেই তাকে ওস্তাদ হিসেবেই মানতেন ওসমান পরিবার ও তাদের ক্যাডার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কথিত মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান ও হারুন অর রশিদ। এর মধ্যে হারুনের বিরুদ্ধে ইয়াবা সেবনের অভিযোগ তুলেছিলেন ফেরদাউসুর। আর হারুন তুলেন ভয়ঙ্কর অভিযোগ ফেরদাউসের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন সময়ে আলেমদের গ্রেপ্তার করানো, বিভিন্ন ইস্যুতে টাকা হাতিয়ে নেওয়া সহ ওসমানদের পক্ষে থাকার দলিলও পেশ করেন হারুন।

এবার এ দুইজন মামা ভাগ্নে মিলে একজন বুজুর্গ আলেমকে সরাতে গিয়ে বিএনপি নেতাদের পেশিশক্তি ব্যবহার করেছে। এটা নিয়ে তুলকালাম কান্ড ঘটেছে। হারুন ও ফেরদাউসদের দাবী মাওলানা জিহাদী জামায়াত ঘরনার। অথচ আওয়ামী লীগ আমলে এ মাদ্রাসার সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন।

বিভিন্ন তথ্য ও ছবিতে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে মুহতামিমের পদ পাওয়ার পর ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ডজনখানেক অনুষ্ঠানে আবু তাহের জিহাদীকে অতিথি করেছিল ফেরদাউস গং।

প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে জিহাদী যদি জামায়াত ঘরনার হয়ে থাকে তাহলে এত বছর কেনই বা তাকে বিভিন্ন সভা সমাবেশে অতিথি করেছিলেন ফেরদাউস গং।

ঘনিষ্ঠজনেরা জানান, দেওভোগ মাদ্রাসায় বিশৃঙ্খলার পেছনে পলাতক কোন গোষ্ঠীর ইন্ধন রয়েছে। তারা নারায়ণগঞ্জকে অশান্ত করার চেষ্টা করছে। সেই এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে ফেরদাউস গং।

সম্প্রতি হারুনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠে। খোদ ফেরদাউস অভিযোগ করেছিলের হারুন ইয়াবাসেবনকারী। এসব নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। এর পরেই হারুনকে মাদ্রাসা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ নিয়ে দেখা দেয় উত্তেজনা। পরবর্তীতের হারুন ও ফেরদাউস অতীত ভুলে একসঙ্গে হয়ে মাদ্রাসায় আঘাত করারর পরিকল্পনা করে। সেটার অংশ হিসেবেই ৫ জুলাই আগে দলবল পাঠিয়ে মাদ্রাসায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করায়। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের উত্তেজনার মুখে অধ্যক্ষ (মুহতামিম) আবু তাহের জিহাদীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে এর আগে শিক্ষক মুফতি হারুন অর রশিদকে তার সপর্দে পুনরায় বহাল করা হয়েছে।

বিকেলে মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হেদায়েত উল্লাহ খোকন তাৎক্ষনিক মাদ্রাসার অফিসিয়াল প্যাডে স্বাক্ষর করে আবু তাহের জিহাদীকে অব্যাহতি দেবার ঘোষণা দেন। তিনি উল্লেখ করেন, অনিয়মের অভিযোগ তুলে ছাত্ররা তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। মাদ্রাসার সুনাম রক্ষার্থে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।

কে এই আবু তাহের জিহাদী

আবু তাহের দারুল উলুম দেওবন্দের উস্তাদ মাওলানা ফখরে বিহার আল্লামা বিহারি তাকে নিজের নামে “মুহাম্মদ হাসান” বলে ডাকতেন। দাদার কাছ থেকে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন শুরু করেন, অতপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল থানার অন্তর্গত ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম শাহবাজপুর মাদরাসার মক্তবে ভর্তি হন, এবং সেখানে তিনি নাহবেমীর জামাত পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। শাহবাজপুর মাদ্রাসার তার উস্তাদদের মধ্যে মাওলানা শামসুল হক, হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা আব্দুর রহমান চান্দিয়ারা প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

শাহবাজপুর মাদরাসায় নাহবেমীর জামাত শেষ করে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ইসলামী বিদ্যাপীঠ জামিয়া ইউনুসিয়া মাদরাসায় হেদায়াতুন্নাহু জামাতে ভর্তি হন, সেখানে তিনি হেদায়াতুন্নাহু থেকে জামাতে জালালাইন পর্যন্ত মোট পাঁচ বছর পড়াশোনা করেন। অত:পর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি দুনিয়াবিখ্যাত ইলম ও আমলের মারকায দারুল উলূম দেওবন্দের উদ্দেশ্যে ভারতে পাড়ি জমান। সেথায় তিনি মেশকাত ও দাওরা হাদিস (মার্স্টাস সমমান) সম্পন্ন করেন। দারুল উলূম দেওবন্দে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য লাভ করেন। যাদের মধ্যে মাওলানা আসআদ মাদানী, আব্দুল হক আযমী রহ. আরশাদ মাদানী, ফখরে বিহার আল্লামা মুহাম্মাদ হাসান বিহারী, দারুল উলূম দেওবন্দের প্রধান মুফতি হাবীবুর রহমান খায়রাবাদী, শাইখুল হাদিস আল্লামা নাসিরুদ্দিন খান, আল্লামা সাইদ আহমদ পালনপুরি, প্রখ্যাত আরবী ভাষাবিদ ওয়াহীদুজ্জামান, আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী, সাহেবজাদা আনজার শাহ কাশ্মীরী প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১৯৮৫ সালে ঢাকা মিরপুরস্থ দারুর রাশাদ মাদ্রাসায় খেদমতে আত্মনিয়োগের মাধ্যমে তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের সূচনা হয়। পরবর্তিতে তিনি কিছু ধর্মপ্রাণ মুসলমানের আন্তরিকতা ও সার্বিক সহযোগিতায় ঢাকা মুসলিমবাজারে ও কল্যানপুরে দুটি সুপ্রতিষ্ঠিত ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ হাতে গড়ে তুলেন। ২০১৮ সালে দেশের অন্যতম প্রাচীন ইসলামী বিদ্যাপিঠ নারায়ণগঞ্জ জেলায় অবস্থিত জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম দেওভোগ থেকে তার নিকট প্রিন্সিপালের দায়িত্বগ্রহণ করার আবেদন পেশ করা হলে তিনি তা সাদরে গ্রহণ করেন। অধ্যাবদি তিনি নিষ্ঠা ও দক্ষতার সহিত দারুল উলূম দেওভোগ, ঢাকা, বি-বাড়িয়া, মুন্সিগঞ্জ, শেরপুরের একাধিক প্রতিষ্ঠানের খেদমতে বিভিন্নভাবে নিয়োজিত রয়েছেন। তার ভক্তবৃন্দরা তার নামে গাজিপুরে জামিয়া তাহেরিয়া আশরাফুল উলূম নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তাছাড়াও তিনি বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার শুরা ও আমেলার একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

প্রাথমিক কর্মজীবনে তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহে খেদমত আঞ্জাম দিয়ে কিছু মুখলিছ, যুগ-সচেতন হক্কানী আলেম তৈরী করা। তাই তিনি প্রাথমিক কর্মজীবনের একটি অংশ মাাদ্রাসার চার দেয়ালের ভিতরে থেকে আপন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যপানে অভিরাম ছুটতে থাকেন। আল্লাহর মেহেরবানীতে মেহনতের ফসল ধীরে ধীরে পেতে থাকেন। এরই মধ্যে তারই হিতাকাংখী কিছু মুরুব্বী তার মধ্যে আলোচনা দক্ষতার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরে তাকে ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমেও দ্বীন প্রচারের পরামার্শ দেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন মসজিদে খতীব হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তারপর ধীরে ধীরে ওয়াজ মাহফিলের ময়দানে পদার্পন করেন। দাওয়াতী কাজে তিনি প্রায় ৪০ বছর যাবত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চষে বেড়িয়েছেন। পথহারা মানুষদেরকে দিয়েছেন পথের দিশা। তার আলোচনার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ খুঁজে পেয়েছে তাদের ঠিকানা। দেশের পাশাপাশি দাওয়াতী কাজের জন্য তিনি সৌদি আরব, হিন্দুস্থান, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ওমান, দুবাই প্রভৃতি রাষ্ট্র ভ্রমণ করেন।