বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রকাশ্য মারামারির ঘটনায় জনমনে বাড়ছে আতঙ্ক ও উদ্বেগ। নারায়ণগঞ্জে কিছুদিন পর পর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, হাতাহাতির ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে নিয়মিত সংবাদে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সহিংসতা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির জন্য বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
দলীয় সূত্র জানায়, নির্বাচনের আগ থেকেই কঠোর অবস্থানে ছিলো বিএনপি। কোথাও অনিয়ম দেখলেই কঠোর হাতে নিবৃত করতো দলটি। বহিস্কারাদেশ পাঠিয়ে তাদের দল থেকে বের করে দেয়া হতো। কিন্তু নির্বাচনের আগে ফের তাদের ফিরিয়ে আনা হয়েছে দলে। অনেকেই ভেবেছিলেন নির্বাচনের আগে দলের ইমেজের কথা চিন্তা করে সতর্ক অবস্থানে থাকবে বিএনপি। কিন্তু সেটা আর বাস্তবায়ন হলো না। ফতুল্লায় বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষ এবং ককটেল বিষ্ফোরনের ঘটনা আতঙ্ক ছড়িয়েছে ভোটারদের মনে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষ যেমন ভীত, তেমনি দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও বিব্রত।
শনিবার ফতুল্লার কুতবপুর ইউনিয়নের হাজীবাড়ি এলাকায় ফতুল্লা থানা তাঁতী দলের সভাপতি ইউনুস মাস্টার ও ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদীনের বিরোধের জেরে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে র্যাব, সেনাবাহিনী ও পুলিশ অভিযান চালিয়ে জেলা ছাত্রদল নেতা সহ উভয় গ্রুপের ৮জনকে আটক করে। পরে অবশ্য ৭ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শিয়াচর হাজীবাড়ি মোড় এলাকায় ইউনুস মাস্টার ও কুতুবপুর ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদীনের সাথে দীর্ঘ দিন ধরেই বিরোধ চলছিলো। এলাকায় মাদক ব্যবসা, কলকারখানার ওয়েস্টেজ মাল ও ভূমি দস্যুতা একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ করে জয়নাল। সম্প্রতি তার এই আধিপত্যের উপর ভাগ বসায় ইউনুচ মাস্টার ও তার অনুসারীরা।
সেই বিরোধের জের ধরে শনিবার দুপুর থেকে দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। উভয় গ্রুপের কয়েকশত সন্ত্রাসী হাতে ধারালো দেশীয় অস্ত্র এবং হাত বোমা নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায়। এসময় ব্যাপক বোমা বিস্ফোরন ঘটিয়ে এলাকায় সাধারন মানুষের মধ্যে আতংক সৃস্টি হয়। ভাংচুর করা হয় একাধিক বাসা বাড়ি। ঘটনার পর পুলিশ জানায়, উভয় গ্রুপের ৮ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের কয়েকজনের কাছ থেকে গাজা ও হেরোইন উদ্ধার করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে বিস্ফোরিত বোমার কিছু অংশ।
এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে। একদিকে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষ ঠেকাতেই চলে এসেছে পুলিশ, সেনাবাহিনী। নির্বাচনের আগে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন এমন শঙ্কা অনেকেরই। সেই সাথে ভোটকেন্দ্রে কতটা নিরাপদ থাকতে পারবে ভোটাররা তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। সেই সাথে নারায়ণগঞ্জ ৪ আসনে একাধিক বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় এই অঞ্চলে বেশী উত্তেজনা থাকবে কিনা এমন শঙ্কা করছেন কেউ কেউ। যেই পরিস্থিতিতে পরিস্থিতিতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে যে দল ভোটের আগেই সহিংসতায় জড়িয়ে যাচ্ছেন এবং কর্মীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারছে না, তারা নির্বাচনের সময়ে কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ ভোটারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা দলটির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর ফলে নিরপেক্ষ ও মধ্যপন্থী ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। যদিও বিএনপির সিনিয়র নেতারা এই ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জোড়ালো আহ্বান জানালেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে বিএনপির মারামারি ও কোন্দল শুধু দলীয় সংকটই নয়, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে নির্বাচনী পরিবেশকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভোটের মাঠে তার প্রভাব পড়বে—এমন আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।































আপনার মতামত লিখুন :