আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ। উক্ত নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে দুইজন প্রার্থী বেশ আলোচনায় রয়েছেন। তার হলেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। অপরজন হলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন। দুইজনের বন্দরের সন্তান। দুইজনেরই রয়েছে নিজ নিজ এলাকায় ব্যাপক প্রভাব।
তবে দুজনে ভোটের লড়াই থেকে আলোচনায় আসার কারণ রয়েছে ভিন্ন লড়াইয়ের গল্প। এই সেই লড়াইয়ে দুজনের পাশে থেকে শক্ত ভাবে তাদের হাত ধরে দুই ব্যক্তির ডুবন্ত তরী ভাসিয়ে রেখেছেন তাদের দুজন ঘনিষ্ঠজন।
একজন হলেন সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালামের একমাত্র ছেলে আবুল কাউসার আশা। অন্যজন হলেন মাকসুদ হোসেনের সহধর্মিনী মিসেস নার্গিস মাকসুদ। এই দুই প্রার্থীর নির্বাচনী মাঠে টিকে থাকার লড়াইটা লড়ে গেছেন একজনের ছেলে ও অপরজনের স্ত্রী।
সূত্রমতে, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন। মার্কা বিতরণের দিন তার জন্য দল থেকে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। কিন্তু সাবেক তিনবারের এমপি আবুল কালামের জন্য এবার ধানের শীষ প্রতীক বা দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পথ এতোটা সহজ ছিলোনা। নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে সব শেষ চূড়ান্ত ভাবে আবুল কালামকে দলীয় প্রার্থী করা হয়। গত ৩ নভেম্বর বিএনপি থেকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের প্রার্থী হিসেবে মাসুদুজ্জামান মাসুদের নাম ঘোষণা করা হয়। প্রায় দেড় মাস বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদ শহর-বন্দর সাধারণ মানুষ ও বিভাজন বিএনপিকে একত্রিত করে প্রশংসিত হন। কিন্তু গত বছর ১৬ ডিসেম্বর হঠাৎ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো ঘোষণা দিয়ে আলোচনা সৃষ্টি করেন মাসুদুজ্জামান। এমন সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে তার বিরুদ্ধে রাজপথে ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঘেরাও করেন বিএনপি নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা। কর্মীদের দাবির প্রেক্ষিতে মাসুদুজ্জামান মাসুদ নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেও কেন্দ্রের কাছে সেটি আর গ্রহণযোগ্য হয়নি। এরপর নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আসেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। দল থেকে তাকে মনোনীত করা হয়েছে বলে এমপি প্রার্থীদের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় তিনি যোগদেন। সেই সাথে নারায়ণগঞ্জের বিএনপি নেতাদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করেন।
কিন্তু হঠাৎ ২৪ ডিসেম্বর সকালে সবাইকে চমকে দেন অ্যাডভোকেট আবুল কালাম পুত্র আবুল কাউসার আশা। নিজের ফেসবুক আইডিতে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের প্রার্থী হিসেবে অ্যাডভোকেট আবুল কালামের নামে বিএনপির দেওয়া চিঠি পোস্ট করে লিখে ‘আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকরার’। এতে এই মনোনয়ন বাগিয়ে আনার পথটি এতো সহজ ছিল না।
জানা গেছে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপি মনোনয়ন প্রত্যাশি ছিলেন সাবেক এমপি আবুল কালাম, মহানগর বিএনপি আহবায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান, সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু, যুগ্ম আহবায়ক আবুল কাউসার আশা, মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ, শিল্পপতি আবু জাফর আহম্মেদ বাবুল ও নব্য যোগদানকারী শিল্পপতি মাসুদুজ্জামান। দীর্ঘ ছয় মাস তাদের মধ্যে মনোনয়ন যুদ্ধে গত বছর ৩রা নভেম্বর দলের হাইকমান্ড মাসুদুজ্জামান মাসুদকে মনোনীত করা হয়। এতে করে মনোনয়ন বঞ্চিত পাচঁজন এক টেবিলে বসে মাসুদুজ্জামানকে পরিবর্তন করে বঞ্চিতদের মধ্যে যে কাউকে মনোনীত করার দাবি তুলেন। এর মধ্যে ফাঁটল ধরে মনোনয়ন বঞ্চিতদের ঐক্যে। কয়েকদিনের ব্যবধানে মনোনয়ন প্রত্যাশী মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব মাসুদুজ্জামান মাসুদ শিবিরে পাড়ি জমায়। হয়ে যান নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান। এতে করে মনোনয়ন প্রত্যাশী অন্যদের মনে চিড় ধরলেও বাবার পাশে ঠাঁই দাঁড়িয়ে একাই লড়াই করে গেছেন আবুল কাউসার আশা। বিভিন্ন সভা সমাবেশে লাগাতার চমৎকার বক্তব্যে প্রশংসিত হন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি যুগ্ম আহবায়ক আবুল কাউসার আশা। শেষ অবদি বাবার জন্য দলীয় মনোনয়ন এনে হাতে তুলে দেন। ওইদিন দুপুরে নবীগঞ্জে কদম রসুল দরগাহ শরীফে শুকরিয়া আদায় করে দোয়ার আয়োজন করেন আবুল কালাম। দোয়া কান্না জড়িত কণ্ঠে ছেলের অবদানকে অকপটে স্বীকার করে ছেলেকে বন্দরবাসী হাতে তুলে দেন প্রবীন এই রাজনীতিবিদ।
অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন ৩ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২৭ নং ওয়ার্ডের দুটি হোল্ডিং এর ৯৮ হাজার ৫০০টার হোল্ডিং ট্যাক্স বাকি থাকায় আরপিও ১২এর ১ এত এন ধারা লঙ্ঘন হয় তাই তার মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা রায়হান কবির। তিনি আরও জানান, সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করা যাবে ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি। ইসি আপিল নিষ্পত্তি করবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে।
মাকসুদ হোসেনের আস্থাভাজনরা জানিয়েছেন, আগামী ২১ জানুয়ারি প্রতীক পাবার আশায় রয়েছি। বন্দরের মানুষ তাদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করতে প্রস্তুত রয়েছি। যে দলই আসুক, মাকসুদ হোসেন শহর-বন্দর নির্বাচনী এলাকা উন্নয়ন করতে পারবেন। মানুষ এখন কোন দলের প্রার্থীদের উপর ভরসা করছে না। কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত রয়েছে শহর-বন্দরের মানুষ। মাকসুদ হোসেন কেমন জনপ্রতিনিধি বন্দরের প্রতিটি মানুষ জানেন ও বুঝেন। কেউ যদি হেভিওয়েট প্রার্থী হয়ে থাকেন, সেটা ব্যাপারে জনগণ রায় দিবে। আমরা আগামী সপ্তাহে মধ্যে মাকসুদ হোসেন স্বতন্ত্র প্রার্থীতা ফেরাত পাবেন, সেই অপেক্ষায় রয়েছি।
তবে এই পর্যন্ত আসার জন্য মাকসুদের পথটাও সহজ ছিল না। মাকসুদ হোসেন বন্দরে জাতীয় পার্টি নেতা এবং ওসমান পরিবারের ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত এবং নিজ ইউনিয়ন এলাকায় দুর্দান্ত প্রভাবশালী চেয়ারম্যান ছিলেন। কিন্তু সব শেষ বন্দর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে স্থানীয় সাবেক সাংসদ সেলিম ওসামনের সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র নির্বাচনে নামেন মাকসুদ হোসেন। সে সময় সরাসরি সাবেক এমপি সেলিম ওসমান মাকসুদ হোসেনের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া থেকে শুরু করে প্রকাশ্যে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেওয়ার হুমকিও দেন। এর মধ্যে মাকসুদকে একাধিক মামলার আসামি করা হয় তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে দিয়ে। গুঞ্জন রয়েছে এসব মামলা করানোর পেছনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী এম.এ রশিদের প্রত্যক্ষ হাত ছিল। সে সময় মামলায় পলাতক থেকে জামিন এনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে পরাজিত করে বিজয়ী হোন। মামলায় পলতাক থাকা অবস্থায় মাকসুদ হোসেনের হয়ে নির্বাচনী প্রচারণা করেন তার স্ত্রী নার্গিস মাকসুদ।
এরপর শপথ গ্রহণের পর মাকসুদের জামিন বাতিল করে তাকে কারাগারে প্রেরণ করে আদালত। জামিয়ে বেরিয়ে এসে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েকদিনের মাথায় ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক প্রজ্ঞাপনে সারাদেশের সকল উপজেলা চেয়ারম্যানদের প্রত্যাহার করে নেন। ফলে চেয়ারম্যান পদ হারান মাকসুদ হোসেন। এরপর তিনি দমে না গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য পদে লড়ার জন্য মাঠে নামেন। এরমধ্যে মাকসুদ হোসেনকে বিরুদ্ধে বৈষম্য বিরোধী একাধিক মামলায় আসামি করা হয়। এসব মামলায় মাকসুদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হলে তার হয়ে মাঠে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করেন তার স্ত্রী নার্গিস মাকসুদ। স্বামীর হয়ে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে অংশ নিতে থাকেন সেই সাথে স্বামীর পক্ষে প্রচারণা ও উঠান বৈঠক করতে ছুটে বেড়ান বন্দর উপজেলা, সিটি কর্পোরেশন এলাকা সহ নারায়ণগঞ্জ নগরীতেও। এর মধ্যে মাকসুদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করতে জোড়ালো বক্তব্য রাখেন মহানগর বিএনপি বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা। তাদের বক্তব্যের পর মাকসুদ হোসেনের ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। চেষ্টা চালানো হয় মাকসুদ হোসেনকে গ্রেপ্তারের। কিন্তু এতোকিছুর মধ্যেও স্বামীর পাশে থেকে স্বামীর হয়ে সকল কার্যক্রম পরিচালনা করে গেছেন নাগির্স হোসেন। এক কথায় একজন সহধর্মিনী হিসেবে স্বামীর ছায়া সঙ্গীর নিরলস চেষ্টা চালিয়েছেন নাগির্স হোসেন।






























-20260102160818.jpg)



আপনার মতামত লিখুন :