অনেক স্বপ্ন, অনেক পরিকল্পনা আর ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি নিয়ে দুটি মানুষ একসঙ্গে নতুন জীবন শুরু করে। একটি সংসার গড়ার পথে তারা কল্পনা করে নিরাপদ একটি ঘর, শান্ত বিকেল আর নির্ভরতার সম্পর্ক। সেই স্বপ্নের ভেতরেই জন্ম নেয় একটি নতুন জীবন একটি শিশু, যার পুরো পৃথিবী হয়ে ওঠে বাবা-মা।
কিন্তু জীবনের পথে সব হিসাব মেলে না। সময়ের সঙ্গে বদলায় মানুষ, বদলায় চাহিদা ও সহনশীলতা। কখনও মতের অমিল, কখনও অর্থনৈতিক চাপ, কখনও বা সম্পর্কের টানাপড়েন দুটি মানুষকে আলাদা পথে হাঁটতে বাধ্য করে। তখন যে সম্পর্কটি শেষ হয়, তার চেয়েও বেশি নড়বড়ে হয়ে পড়ে একটি শিশুর পৃথিবী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক একটি ঘটনা বহু মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। একজন মা তালাকের কাগজে স্বাক্ষর করে সম্পর্কের ইতি টানছেন, আর অন্যদিকে তার সন্তান সর্বশক্তি দিয়ে মাকে আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করছে। গগনবিদারী কান্নায় শুধু একটি আকুতি বাবা-মাকে একসঙ্গে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা বাড়ছে-এ কথা আজ আর অজানা নয়। কিন্তু আমরা খুব কমই ভাবি, এই বিচ্ছেদের প্রকৃত মূল্য কে দেয়। আদালতের নথিতে স্বাক্ষর পড়ে দুজনের, অথচ মানসিক ক্ষত বয়ে বেড়ায় একজন-সন্তান।
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ মেখলা সরকার বলেন, একটি শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশে বাবা ও মায়ের ভূমিকা ভিন্ন হলেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাবা-মায়ের মধ্যে সুস্থ সম্পর্ক, হাসিমুখ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা শিশুর মনে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে। কিন্তু নিত্যদিনের কলহ ও বিচ্ছেদ সেই নিরাপদ আশ্রয়টিকে ভেঙে দেয়। ফলে সংসার ভাঙার সবচেয়ে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে সন্তানদের ওপর।
বিচ্ছেদের পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সন্তানের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পান মা অথবা বাবা যেকোনো একজন। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, আইনি অনুমতি থাকা সত্ত্বেও সন্তানের সঙ্গে অপর অভিভাবকের যোগাযোগ সীমিত বা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে করে শিশু ধীরে ধীরে ভোগে অভিভাবকহীনতায়। সে নিজেকে একা, অবাঞ্ছিত ও অনিরাপদ মনে করতে শুরু করে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় সমাজের কটু কথা, আত্মীয়স্বজনের অবজ্ঞা ও হীনমন্যতা। ফলে শিশুটি নিজেকে গুটিয়ে নেয়, কথা কম বলে, বন্ধুবান্ধব থেকে দূরে থাকে। এই মানসিক সংকোচন তার পড়াশোনার ওপরও প্রভাব ফেলে। মনোযোগে ঘাটতি দেখা দেয়, আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তার মনে তৈরি হয় অজানা ভয়।
বিচ্ছেদের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু সন্তানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যৌক্তিক কারণে বিচ্ছেদ হওয়া নারীকেও আমাদের সমাজ অনেক সময় সন্দেহ ও অবজ্ঞার চোখে দেখে। চরিত্রহননের শিকার হতে হয়, সামাজিকভাবে একঘরে করে রাখা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক চাপ এককভাবে সন্তান লালন-পালন, বাসা ভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় বহন করা অনেক নারীর জন্য হয়ে ওঠে কঠিন সংগ্রাম।
এই বাস্তবতার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে-সামাজিক ও ব্যক্তিজীবনে বিচ্ছেদ এত গভীর প্রভাব ফেললেও কেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর হার ক্রমাগত বাড়ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। দুটি মানুষ ভিন্ন পরিবার, ভিন্ন পরিবেশ ও ভিন্ন মানসিকতা নিয়ে একত্রে জীবন শুরু করে। ফলে জীবনযাপনের ধরন, মূল্যবোধ, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিতে পার্থক্য দেখা দেয়। শুরুতে ছোট মনে হওয়া এই পার্থক্যগুলোই সময়ের সঙ্গে বড় আকার ধারণ করে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একে অপরের স্বভাব, অভ্যাস কিংবা দৃষ্টিভঙ্গি মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয় না। সহনশীলতার অভাব থেকে জন্ম নেয় ঝগড়া, অভিযোগ আর দূরত্ব। ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।
আরও একটি বড় কারণ হলো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ। বিয়ে মানে শুধু দুটি মানুষের মিলন নয়, অনেক সময় তা দুটি পরিবারেরও মিলন। বিশেষ করে নতুন বিয়ে হয়ে আসা একজন নারীর জন্য শ্বশুরবাড়ির পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া সহজ হয় না। পারিবারিক সিদ্ধান্তে মতের অমিল, নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ কিংবা অবমূল্যায়ন একসময় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এ ছাড়া অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, ঋণের চাপ, পরকীয়া সম্পর্ক, মাদকাসক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং পারস্পরিক যোগাযোগের অভাবও বিচ্ছেদ বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সমস্যা সমাধানের সংস্কৃতি আমাদের সমাজে দুর্বল হয়ে পড়ছে। মতবিরোধ দেখা দিলেই আলোচনার বদলে সম্পর্ক ছিন্ন করার পথটি সহজ মনে হচ্ছে অনেকের কাছে।
বিচ্ছেদ কখনও কখনও অনিবার্য বাস্তবতা হতে পারে। কিন্তু সেই বিচ্ছেদের ভার যেন সবচেয়ে দুর্বল কাঁধে অর্থাৎ একটি শিশুর কাঁধে চেপে না বসে, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের সবচেয়ে বড় বিবেচনা। কারণ আজ যে শিশুটি ভাঙা সংসারের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে, আগামী দিনে সে-ই হবে এই সমাজের নাগরিক, অভিভাবক ও পথনির্দেশক।
স্বপ্ন দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই স্বপ্নের অন্তত একটি অংশ নিরাপদ শৈশব সন্তানের জন্য বাঁচিয়ে রাখাই হোক আমাদের সামষ্টিক দায়িত্ব।






































আপনার মতামত লিখুন :