রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচির তুলনায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে বেশি গুরুত্ব দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে শক্তি বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন দলটির নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূলের অবস্থান, সম্ভাব্য প্রার্থী এবং ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলো নিয়ে দলটির ভেতরে নতুন করে হিসাব-নিকাশ চলছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে পরিবর্তন এসেছে, তার প্রভাব পড়েছে নারায়ণগঞ্জেও। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এবং পুরোনো দলগুলোর সাংগঠনিক তৎপরতা স্থানীয় রাজনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জামায়াতও নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান কতটা বিস্তৃত করা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে।
জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে দলটির আগ্রহ আরও বেড়েছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা কাজে লাগানোর সুযোগ খুঁজছে দলটি।
নারায়ণগঞ্জে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে জেলার ভিন্ন ভিন্ন এলাকার বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হয়। শিল্পাঞ্চল, শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকা, নগরকেন্দ্রিক জনবসতি এবং গ্রামীণ জনপদের ভোটের হিসাব এক নয়। ফলে সব এলাকায় একই কৌশলে এগোনোর পরিবর্তে এলাকাভিত্তিক সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থন যাচাই করা দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করতে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে বলে দলটির তৃণমূল পর্যায়ের তৎপরতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
জামায়াতের জন্য স্থানীয় নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে একটি দলের অবস্থান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তেমনি প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় সমস্যা সম্পর্কে ধারণা এবং ভোটারদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বড় ভূমিকা রাখে। এ কারণে কোনো এলাকায় সংগঠনের ভিত্তি শক্ত থাকলেও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী ছাড়া নির্বাচনে সাফল্য পাওয়া কঠিন হতে পারে।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থান, এনসিপির কার্যক্রম এবং অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির তৎপরতাও জামায়াতের হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থী বাছাই, দলীয় সমঝোতা এবং ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধরন নির্বাচনী ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বড় দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ বা নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হলে অন্য দলগুলোর সামনে সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে সাংগঠনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি ভোটারদের আস্থা অর্জনও জরুরি।
তরুণ ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোও দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হতে পারে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, নাগরিক সুবিধা ও দুর্নীতির মতো প্রশ্নগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এসব বিষয়ে কার্যকর অবস্থান ও বাস্তবসম্মত কর্মসূচি তুলে ধরতে পারলে জামায়াতসহ যেকোনো দল স্থানীয় পর্যায়ে জনসমর্থন বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারে।
তবে শুধু সাংগঠনিক শৃঙ্খলা কিংবা কর্মীদের সক্রিয়তা দিয়ে নির্বাচনী সাফল্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রার্থী নির্বাচন, স্থানীয় সমস্যার সমাধানে ভূমিকা, রাজনৈতিক বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে দলের সম্পর্ক সবকিছু মিলিয়েই ভোটের মাঠে অবস্থান নির্ধারিত হবে। পাশাপাশি অতীতের রাজনৈতিক বিতর্ক ও দলটির কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে থাকা প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে বদলে যাওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জে নিজেদের অবস্থান কতটা শক্ত করা সম্ভব, সেই হিসাবই এখন জামায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় নির্বাচনে দলটি কতটা প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামে, কোন কোন এলাকায় প্রার্থী দেয় এবং ভোটারদের কাছে কী ধরনের কর্মসূচি নিয়ে হাজির হয়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে তাদের পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান। সাংগঠনিক তৎপরতা শেষ পর্যন্ত কতটা জনসমর্থনে রূপ নেয়, সেটিই হবে জামায়াতের সামনে বড় পরীক্ষা।
































আপনার মতামত লিখুন :