News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ৫ বৈশাখ ১৪৩৩

অর্থনীতির স্তম্ভ নারায়ণগঞ্জ, মর্যাদার অভাব


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | আসামাউল হুসনা প্রকাশিত: এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম অর্থনীতির স্তম্ভ নারায়ণগঞ্জ, মর্যাদার অভাব

দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের মানচিত্রে নারায়ণগঞ্জের অবস্থান কোথায়, তা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। পাটশিল্পের ঐতিহ্য পেরিয়ে আধুনিক গার্মেন্টস, নিটওয়্যার, ডাইং-প্রিন্টিং সহ বহুমাত্রিক শিল্পে সমৃদ্ধ এই জেলা আজ লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস। বিপুল রপ্তানি আয় ও জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ৮ শতাংশ অবদানের কারণে নারায়ণগঞ্জ অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে দেশের শীর্ষস্থানীয় অঞ্চলগুলোর একটি এমনটাই মনে করেন ব্যবসায়ী মহল। কিন্তু এই শক্ত অবস্থানের বিপরীতে প্রশাসনিক শ্রেণিবিন্যাসে জেলার অবস্থান এখনও ‘বি’ ক্যাটাগরিতে; যা এক স্পষ্ট বৈপরীত্য এবং নীতিনির্ধারণী বাস্তবতার অসামঞ্জস্যের প্রতিফলন।

‘বি’ ক্যাটাগরি কোনো সাধারণ লেবেল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তুলনামূলক কম উন্নয়ন বরাদ্দ, দুর্বল অবকাঠামো পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। অথচ নারায়ণগঞ্জ বাস্তবে উৎপাদন ও রপ্তানিতে ‘এ’ শ্রেণির ভূমিকা পালন করছে। শিল্পাঞ্চল, বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা এবং বিপুল কর্মসংস্থানের এই কেন্দ্রটি প্রশাসনিকভাবে পিছিয়ে থাকা: এটি দীর্ঘদিনের এক অসংগতি।

এই বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে তুলে আসছেন নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু। তিনি বারবার সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, নারায়ণগঞ্জ কেবল একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়; এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। সেই অনুপাতে সুবিধা না পাওয়া একটি স্পষ্ট বৈষম্য। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা এই দাবিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

চেম্বারের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও বিকেএমইএ’র সহ-সভাপতি (অর্থ) মোরশেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, “‘এ’ ক্যাটাগরি শুধু মর্যাদার বিষয় নয়; এটি সরাসরি একটি জেলার উন্নয়ন সক্ষমতা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং শিল্পের টেকসই বিকাশের সঙ্গে যুক্ত। নারায়ণগঞ্জের মতো একটি জেলাকে এখনও ‘বি’ ক্যাটাগরিতে রাখা হলে সেই সম্ভাবনা পূর্ণ মাত্রায় কাজে লাগানো সম্ভব নয়।”

তিনি আরও বলেন, চেম্বার সভাপতি দিপু ভূঁইয়ার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়েছে; যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত না হলে বড় পরিসরের উন্নয়ন পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ সীমিতই থেকে যাবে।

এই বৈষম্যের প্রভাব কেবল কাগজে-কলমে নয়; এর বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় নারায়ণগঞ্জের রাস্তায়, খালে ও নাগরিক জীবনে। হকার সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে রেখেছে। সম্প্রতি উচ্ছেদ অভিযান চললেও এই সংকট যে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার অভাবেই তৈরি, সেটি স্পষ্ট। চাষাঢ়া-লিংক রোড সহ শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী যানজট উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করছে। বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতা নিয়মিত দুর্ভোগে পরিণত হয় অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ও খাল দখলের প্রভাব এতে স্পষ্ট। শিল্পবর্জ্য ও অপরিশোধিত বর্জ্যপানি সরাসরি নদীতে ফেলার কারণে পানি দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। আর চিকিৎসা সেবার চিত্রও উদ্বেগজনক; জেলার অর্থনৈতিক গুরুত্বের তুলনায় স্বাস্থ্য অবকাঠামো এখনও অপ্রতুল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি দীর্ঘদিনের।

এদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের জন্য ১১৫.৮ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১,৪২০ কোটি টাকা) এর একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এটি প্রমাণ করে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই জেলার গুরুত্ব স্বীকৃত।

সম্প্রতি সাতক্ষীরা জেলা ‘বি’ থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত হওয়ার ঘটনা দেখায়, সঠিক মূল্যায়ন ও নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলে পরিবর্তন সম্ভব। অর্থনৈতিক অবদান ও শিল্প কার্যক্রমের বিচারে নারায়ণগঞ্জের দাবি কোনো অংশে কম নয়; বরং অনেক বেশি।

প্রশ্নটি তাই সরল; যে জেলা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে, তাকে প্রশাসনিক অগ্রাধিকার থেকে আর কতদিন দূরে রাখা হবে? নারায়ণগঞ্জকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করা এখন আর কেবল একটি দাবি নয়; এটি সময়ের দাবি, বাস্তবতার দাবি এবং জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে একটি জরুরি সিদ্ধান্ত।

অর্থনীতিতে ‘এ’ হলেও মর্যাদায় ‘বি’ এই বৈপরীত্য কাটিয়ে উঠতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগ। নারায়ণগঞ্জের মতো সম্ভাবনাময় জনপদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত করা।