News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই, ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩

অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশায় কমছে না যানজট


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: জুলাই ৩, ২০২৬, ১০:০১ পিএম অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশায় কমছে না যানজট

দীর্ঘদিন পর নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাতগুলো যখন হকারমুক্ত হয়ে পথচারীদের জন্য কিছুটা স্বস্তির পরিবেশ তৈরি করেছে, ঠিক তখনই নতুন করে আলোচনায় এসেছে নগরীর আরেক বড় সংকট অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা। নগরবাসীর দাবি, ফুটপাত দখলমুক্ত করার ইতিবাচক প্রভাব থাকলেও সড়কে নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশার কারণে যানজট পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। বরং প্রতিদিন বাড়তে থাকা অটোরিকশার সংখ্যা শহরের যান চলাচলকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিশেষ করে চাষাঢ়া, বঙ্গবন্ধু সড়ক, ডিআইটি, ২নং রেলগেইট, কালীরবাজার, মন্ডলপাড়া, নিতাইগঞ্জ, লিংকরোড ও হাজীগঞ্জসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অসহনীয় যানজট লেগেই থাকে। নগরবাসীর অভিযোগ, যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানামা, সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী নেওয়া, নির্ধারিত রুট না মেনে চলাচল এবং অতিরিক্ত অটোরিকশার চাপ পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একসময় ফুটপাত দখলকে যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হলেও এখন বাস্তবতা বলছে, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অটোরিকশা খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনা ছাড়া বিকল্প নেই। কারণ শহরের অধিকাংশ সড়ক এমনিতেই সরু, তার উপর অনিয়ন্ত্রিতভাবে হাজার হাজার অটোরিকশা চলাচল পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

নগরবাসী বলছেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ যেভাবে প্রশংসিত হয়েছে, ঠিক একইভাবে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণেও দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। অনেকের মতে, বর্তমানে নগরীতে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি অটোরিকশা চলাচল করছে। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, যারা বিভিন্নভাবে এই খাত নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে প্রশাসনের নিয়মনীতি অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর হচ্ছে না।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীদের অভিযোগ, শহরের ব্যস্ত সড়কগুলোতে অটোরিকশার কারণে প্রায়ই সৃষ্টি হচ্ছে ধীরগতি। বিশেষ করে অফিস টাইমে কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটির সময় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। সামান্য দূরত্ব অতিক্রম করতেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় সাধারণ মানুষকে। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে মানসিক চাপ ও অর্থনৈতিক ক্ষতিও।

শুধু যানজটই নয়, বেপরোয়া অটোরিকশা চলাচলের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক চালকের নেই বৈধ কাগজপত্র বা প্রশিক্ষণ। আবার অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকও সড়কে অটোরিকশা চালাচ্ছে। এতে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে চলাচল করতে হচ্ছে পথচারী ও অন্যান্য যানবাহন চালকদের।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান ইতোমধ্যে অটোরিকশা খাত নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। নগর ভবনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, বর্তমানে লাইসেন্সপ্রাপ্ত অটোরিকশার সংখ্যা বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। দীর্ঘদিন ধরে একটি সিন্ডিকেট এই খাতকে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং সেই প্রভাবের কারণেই পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে।

তিনি জানান, পুরো ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার আওতায় আনতে প্রশাসন বেশ কিছু পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট রুটভিত্তিক অটোরিকশা চলাচল নিশ্চিত করা, ভিন্ন রঙের অটোরিকশা চালু করা, ডিজিটাল নাম্বার প্লেট সংযোজন, চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক পরিচয়পত্র প্রদান এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে চেকপোস্ট স্থাপন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে অটোরিকশা খাতে অনেকটাই শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া যাবে না। এজন্য প্রয়োজন টেকসই পরিকল্পনা ও কঠোর বাস্তবায়ন। নগরীর জন্য কতসংখ্যক অটোরিকশা প্রয়োজন, কোন রুটে কতগুলো চলবে, কোথায় স্ট্যান্ড থাকবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। একইসঙ্গে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকেও আধুনিকায়ন করতে হবে।

তারা আরও মনে করেন, অটোরিকশা চালকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা, যত্রতত্র পার্কিং বন্ধ করা এবং অবৈধ অটোরিকশার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। পাশাপাশি নগরবাসীকেও ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

গত ১৩ এপ্রিল চাষাঢ়া এলাকায় জিয়া হলের সামনে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে শুরু হওয়া হকার উচ্ছেদ অভিযান নগরবাসীর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। ওই অভিযানে অংশ নেন প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সমাবেশ শেষে শহরের বিভিন্ন এলাকায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়।

সেই উদ্যোগকে সা¤প্রতিক সময়ের সবচেয়ে সফল নগর ব্যবস্থাপনা পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অনেকেই। তবে নাগরিকদের মতে, সেই সফলতাকে ধরে রাখতে হলে এখন সড়ক ব্যবস্থাপনাতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ ফুটপাত পরিষ্কার হলেও যদি সড়কে যানজট কমানো না যায়, তাহলে নগরবাসীর ভোগান্তি পুরোপুরি দূর হবে না।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, প্রশাসন হকার উচ্ছেদের মতোই দৃঢ় অবস্থান নিয়ে অটোরিকশা খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে। পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে যানজট নিয়ন্ত্রণ করা গেলে নারায়ণগঞ্জ সত্যিকার অর্থেই একটি বাসযোগ্য ও স্বস্তির নগরীতে পরিণত হতে পারে।