দেশের অন্যতম শিল্প ও বাণিজ্যিক জেলা নারায়ণগঞ্জ। রাজধানী ঢাকার পাশেই অবস্থিত এ জেলায় গড়ে উঠেছে শত শত শিল্পকারখানা, তৈরি পোশাক শিল্প, নৌবন্দর, পাইকারি ব্যবসা, আবাসন প্রকল্প এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক। জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এ জেলাকে অনেকেই দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করেন। কিন্তু অর্থনৈতিক এই গুরুত্বের সঙ্গে নাগরিক জীবনের বাস্তবতার যেন বিস্তর ফারাক। প্রতিদিনের যানজট, সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ, ফুটপাত দখল, নদী দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ বিপর্যয় এবং চাঁদাবাজির মতো দীর্ঘদিনের সমস্যায় জর্জরিত জেলার লাখো মানুষ। তাদের প্রত্যাশা, পাঁচ এমপির হাত ধরে এসব সমস্যার সমাধান ঘটবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এসব সমস্যার কথা শোনা গেলেও কার্যকর সমাধান খুব কমই চোখে পড়েছে। বিভিন্ন সময়ে উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়নের বিস্তার এবং অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণের ফলে নাগরিক দুর্ভোগ আরও প্রকট হয়েছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যার নাম যানজট। সকালে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ভারী শিল্পপণ্যবাহী ট্রাকের কারণে জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে শহরের প্রধান সড়ক, শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন এলাকা এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত সড়কগুলোতে প্রতিদিনই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয় মানুষকে। এতে সময় ও অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি উৎপাদনশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শুধু যানজটই নয়, বর্ষা এলেই নতুন করে সামনে আসে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ। অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক জায়গায় পানি নেমে যেতে একাধিক দিন লেগে যায়। এতে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ছোট ব্যবসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল ভরাট এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে।
জেলার আরেকটি বড় সংকট গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ। শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় শিল্প উৎপাদন যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ গ্রাহকরাও। বিদ্যুতের লোডশেডিং ও ভোল্টেজ ওঠানামার অভিযোগও রয়েছে বিভিন্ন এলাকায়।
শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে। নদী ও খালে শিল্পবর্জ্য ফেলা, বিভিন্ন স্থানে অবৈধ দখল এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে জেলার পরিবেশ ক্রমেই বিপর্যস্ত হয়ে উঠছে। একসময় যে নদীগুলো জেলার অর্থনীতি ও মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল, সেগুলোর অনেক অংশই এখন দূষণ ও দখলের চাপে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। পরিবেশবাদীদের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণও নতুন নতুন সংকট সৃষ্টি করছে। দ্রুত গড়ে ওঠা আবাসিক ভবন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক স্থাপনার কারণে নগরের ওপর চাপ বাড়লেও সেই অনুযায়ী সড়ক, ড্রেনেজ, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান কিংবা গণপরিসরের উন্নয়ন ঘটেনি। ফলে জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক সুবিধার ঘাটতিও বাড়ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত চাঁদাবাজির অভিযোগও ব্যবসায়ী, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সাধারণ মানুষের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের অভিযান পরিচালিত হলেও অনেকের মতে, সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানে নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন।
জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের প্রতিনিধিদের প্রতি তাই মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। নাগরিকদের ভাষ্য, রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে এখন বেশি প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং দৃশ্যমান উদ্যোগ। যানজট নিরসনে সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা দূর করতে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল পুনরুদ্ধার, নদী রক্ষা, শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, গ্যাস ও বিদ্যুতের স্থিতিশীল সরবরাহ এবং পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন এসব বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ সমস্যা কোনো একটি এলাকা বা একটি সংসদীয় আসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যানজট, নদী দূষণ, জলাবদ্ধতা, পরিবেশ বিপর্যয় কিংবা শিল্পাঞ্চলভিত্তিক সংকট সবই একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে জেলা পর্যায়ে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
তারা মনে করেন, স্থানীয় সরকার, জেলা প্রশাসন, বিভিন্ন সেবা সংস্থা এবং সংসদ সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা গেলে অনেক সমস্যার সমাধান দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে একই সমস্যা বারবার ফিরে না আসে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিক থেকে নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা হলেও নাগরিক সেবার মান এখনো সেই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি। উন্নয়ন এবং জনদুর্ভোগের এই বৈপরীত্য দূর করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। শিল্প, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্র হিসেবে জেলার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল।
নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তারা চান নিরাপদ সড়ক, জলাবদ্ধতামুক্ত শহর, দূষণহীন নদী, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ, দখলমুক্ত ফুটপাত এবং স্বস্তির নগরজীবন। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা এসব সংকটের বাস্তব সমাধানই এখন জেলার মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতির পর এবার সেই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপ পায়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো নারায়ণগঞ্জ।





































আপনার মতামত লিখুন :