News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা রবিবার, ০৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

শাহ নিজামের সেই ডেরা অরক্ষিত


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: অক্টোবর ৪, ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম শাহ নিজামের সেই ডেরা অরক্ষিত

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পাশে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় দেড় একর জায়গা এখন পড়ে আছে অরক্ষিত অবস্থায়। চারপাশে গড়ে ওঠা স্থাপনার অধিকাংশই নেই, পড়ে আছে ভাঙাচোরা অবকাঠামোর চিহ্ন। দিনের বেলায় অনেকটা নির্জন, আর সন্ধ্যার পর সেখানে বাড়ছে মাদকসেবীদের আনাগোনা এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। অথচ কয়েক বছর আগেও জায়গাটি ছিল জমজমাট বিনোদনকেন্দ্র। সেখানে ছিল ‘নাসিম ওসমান মেমোরিয়াল অ্যামিউজমেন্ট পার্ক’, যা স্থানীয়ভাবে ‘নম পার্ক’ নামে পরিচিত ছিল।

নারায়ণগঞ্জের কুতুবপুর এলাকায় ফতুল্লা স্টেডিয়ামের বিপরীতে অবস্থিত এই জায়গাটির মালিক সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। নথিপত্র অনুযায়ী, সওজের ১ দশমিক ৪৪ একর জমি সাময়িকভাবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে সেখানে বাণিজ্যিক বিনোদন পার্ক গড়ে তোলার চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একপর্যায়ে মন্ত্রণালয়ের সম্পত্তি শাখা জমি ব্যবহারের অনুমতিও বাতিল করে। কিন্তু এরপরও দীর্ঘ সময় পার্কটি চালু ছিল।

সরকারের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের ৫ আগস্ট পার্কটি ভাঙচুরের শিকার হয়। এরপর থেকে জায়গাটি আর নতুন কোনো কাজে ব্যবহার করা হয়নি। বর্তমানে পুরো জমিটি অনেকটাই পরিত্যক্ত। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত তদারকি না থাকায় সন্ধ্যার পর সেখানে মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে সরকারি এই জমি এভাবে পড়ে থাকায় ক্ষোভও রয়েছে তাঁদের মধ্যে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, লিংক রোডের পাশে হওয়ায় জায়গাটি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা গেলে জনসাধারণের কাজে লাগতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা যায়, ২০১৫ সালের ৩১ আগস্ট সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সম্পত্তি শাখা সওজের মালিকানাধীন ১ দশমিক ৪৪ একর জমি ব্যবহারের বিষয়ে প্রস্তাব দেয়। সড়কের পাশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, ফুলের বাগান এবং স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের জন্য অস্থায়ী বসার স্থান তৈরির উদ্দেশ্যে জমিটি ব্যবহারের কথা বলা হয়।

পরে ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রæয়ারি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সম্পত্তি শাখা নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদকে ওই জমি সম্পূর্ণ অস্থায়ী ভিত্তিতে ব্যবহারের অনুমতি দেয়। এ অনুমতির ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্তও দেওয়া হয়েছিল।

এরপর সদর উপজেলা পরিষদ ২০ এপ্রিল মেসার্স জেডএনটি প্রোপ্রাইটর শাহ নিজাম উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। নথিতে বলা হয়, ওই চুক্তির মাধ্যমে সওজের জমিতে ‘নাসিম ওসমান শিশু মেমোরিয়াল ইকো পার্ক’ নামে একটি বিনোদনকেন্দ্র গড়ে ওঠে। সেখানে চাইনিজ রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়।

২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর পার্কটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম সেলিম ওসমান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান, জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন এবং পার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও তৎকালীন মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ নিজামসহ অন্যরা।

সওজের নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৫ জুলাই পার্ক-সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে শাহ নিজামকে বলা হয়েছিল। তবে তিনি তখন কাগজপত্র দেখাতে পারেননি বলে সওজ সূত্রে জানা যায়। তাঁকে এ বিষয়ে সদর উপজেলা কার্যালয়ে যোগাযোগের কথা বলা হয়।

পরে নথিপত্র পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেখতে পায়, সওজের জমি ব্যবহারের মূল অনুমতির সঙ্গে উপজেলা পরিষদের করা চুক্তির মিল নেই। মন্ত্রণালয়ের দেওয়া অনুমতিতে জমিটি সৌন্দর্যবর্ধন ও অস্থায়ীভাবে ব্যবহারের কথা থাকলেও সেখানে বাণিজ্যিক বিনোদনকেন্দ্র গড়ে ওঠে।

এ কারণে ২০১৬ সালের ২০ এপ্রিল দেওয়া জমি ব্যবহারের অনুমতি বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে সওজের জমিতে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনুমতি বাতিলের আগ পর্যন্ত আনুপাতিক হারে মাশুল আদায়ের নির্দেশও দেওয়া হয়।

নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সওজের জমি তৃতীয় পক্ষকে দেওয়ার ফলে ভবিষ্যতে সরকারি জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে এবং সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

তবে অনুমতি বাতিলের পরও দীর্ঘ সময় পার্কটি চালু ছিল। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সওজ কর্তৃপক্ষ এতদিন জায়গাটি দখলমুক্ত করতে পারেনি এমন অভিযোগও রয়েছে।

পার্কটি চালু থাকা অবস্থায় সেখানে বিনোদনের জন্য সাধারণ মানুষের উপস্থিতির পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের আনাগোনাও ছিল বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পার্কটির ব্যবস্থাপনার সঙ্গে শাহ নিজামের সম্পৃক্ততা ছিল।

সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহŸায়ক রফিউর রাব্বী একসময় পার্কটিকে ‘কাশিমবাজার কুঠি’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, জায়গাটি শুধু বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো না; বিভিন্ন সালিস-বিচারের পাশাপাশি সেখানে নির্যাতনের ঘটনাও ঘটত। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা পার্কটিতে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এরপর পার্কের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

পার্কটি ভেঙে যাওয়ার পর প্রায় দুই বছর হতে চললেও জায়গাটিতে নতুন কোনো স্থাপনা বা সরকারি কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে সওজের মালিকানাধীন মূল্যবান জমিটি এখন কার্যত অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে।

স্থানীয়দের মতে, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পাশে হওয়ায় জমিটির বাণিজ্যিক ও জনকল্যাণমূলক দুই ধরনের গুরুত্বই রয়েছে। তবে নতুন করে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়ার পরিবর্তে সরকারি প্রয়োজনে ব্যবহার কিংবা জনসাধারণের উপকারে আসে এমন কোনো প্রকল্প নেওয়ার দাবি তাঁদের।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম জানান, জায়গাটি সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন। সেখানে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ট্রেনিং সেন্টার বা এ ধরনের কোনো স্থাপনা করা যায় কি না, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন।