গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালানোর পরেই বিক্ষুব্ধ জনতা তৎকালের এমপি ও মন্ত্রীদের বাড়িঘরে হামলা করে ব্যাপক ভাঙচুর করে। গুড়িয়ে দেওয়া হয় সাম্রাজ্য।
সেলিম-শামীম ওসমানের বাড়ি ভাঙচুর-আগুন : পদত্যাগ করে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরে সারাদেশের মতো নারায়ণগঞ্জেও বিজয় উল্লাস করে ছাত্র-জনতা। ওইদিন দুপুরে আওয়ামীলীগ সরকার পতনের সংবাদে সাথে সাথে তৎকালীন এমপি শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়ি-গাড়ি, দলীয় অফিস ও তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আনন্দ মিছিল চলাকালে নারায়ণগঞ্জ শহরের বায়তুল আমান, রাইফেল ক্লাব, এ্যাটেল মাটি, শামীম ওসমানের বাড়ি, শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরি ওসমানের বাড়িতে সাতটি মোটরসাইকেলে আগুন ও দুটি হ্যামার গাড়ি ভাঙচুর আগুন জ্বালিয়ে দেয়, চাষাঢ়ায় সেলিম ওসমানের বাড়ি, আজমেরি ওসমান মার্কেট (আলম কেবিন সংলগ্ন) নারায়ণগঞ্জ ক্লাব, শহরের দুই নম্বর রেলগেট এলাকার আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এসময় লুটপাটও ঘটনা ঘটে।
গোলাম দস্তগীর গাজী : শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার সংবাদের পরেই রূপগঞ্জে তৎকালীন এমপি গোলাম দস্তগীর গাজীর টায়ার ফ্যাক্টরিসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িঘর, অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারী ও এলাকাবাসী। ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধদের ভাষ্য, ১৭ বছরের জুলুম-নির্যাতনের চাপা ক্ষোভের কারণেই এসব ঘটনা ঘটিয়েছেন জনগণ। ৫ আগষ্ট দুপুরে রুপসি এলাকায় অবস্থিত গাজী টায়ার ফ্যাক্টরি, ভুলতা, গোলাকান্দাইল, মুড়াপাড়া, কায়েতপাড়া, তারাবো, ভোলাবো, রূপগঞ্জ, কাঞ্চন, দাউদপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ কার্যালয়সহ বিভিন্ন ওয়ার্ড এবং আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। জানা গেছে, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার সংবাদের পরেই প্রতিটি ইউনিয়ন ওয়ার্ড এবং পাড়ামহল্লা থেকে দলে দলে লাঠিসোটা নিয়ে জড়ো হয়ে সড়কগুলোতে অবস্থান নেন বিক্ষুব্ধরা।
নজরুল ইসলাম বাবু : ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামীলীগ সরকারের হুইপ নজরুল ইসলাম বাবুর পৈতৃক বাড়ি আড়াইহাজার উপজেলার একেবারে পশ্চিম সীমান্তে দুপ্তারা ইউনিয়নের বাজবী গ্রামে দৃষ্টিনন্দন ডুপ্লেক্স বাড়িটি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতন এবং দেশত্যাগের পর গোটা উপজেলার দৃশ্যপট মুহূর্তেই পাল্টে যায়। এর আগেই পরিবারসহ আত্মগোপনে চলে যান বাবু। ওইদিন বিকেলে তাঁর বাড়িতে হামলা চালিয়ে দরজা জানালা, সিঁড়ির রেলিং, এসি, টিভি, ফ্রিজ, সোফা, আলমারি ভর্তি বইপুস্তক, ক্রেস্ট থেকে শুরু করে নগদ টাকার পাশাপাশি ঘরে রক্ষিত সমস্ত আসবাবপত্র লুটে নিয়ে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। এক সময় ডুপ্লেক্স বাড়িটি সরকার পতনের আগেও হাজারো লোকের সমাগমে মুখর থাকত। অথচ সেটি এখন পোড়োবাড়ি, বাড়িজুড়ে সুনসান নীরবতা।
আব্দুল্লাহ আল কায়সার : গত বছর ৫ আগষ্ট দুপুরের পর থেকে সোনারগাঁয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দেড়শতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ঘটে। শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করার পর নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে চলে গেলে টানা ৬-৮ আগস্ট পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটে। সোনারগাঁ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যায়। মোগরাপাড়া চৌরাস্তা আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করা হয়। সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহাগ রনির টিপুরদী এলাকায় একটি কারখানায় ও ইলিয়াসদী এলাকায় আনোয়ার আলী মেম্বার, কাজিমউদ্দিন, মাসুদুর রহমান ও মোশারফের ৫টি ঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। নুনেরটেক এলাকায় ইউপি সদস্য ওসমান গণিসহ নেতাকর্মীদের ১৬ বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। পাকুন্ডা গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা শাদত আলীরসহ ১৭টি বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়। বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের হামছাদী এলাকায় কৃষক লীগের আহবায়ক করিম আহমেদের খামারবাড়িতে হামলা করে ১২টি গরু, হাঁস, মুরগি, ছাগল, ভেড়া ও মাছ লুট করা হয়। ওই সময় আত্মগোপনে থাকা নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল কায়সার বলেন, সবসময় সহাবস্থানের রাজনীতি করেছি। দুবার সংসদ সদস্য ছিলাম। কাউকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করিনি। আশা করি বিএনপিও সহাবস্থানের রাজনীতি করবেন। যারা হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছেন তাদের প্রতি সমবেদনা জানাই।
আপনার মতামত লিখুন :