News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বুধবার, ০৪ মার্চ, ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২

ত্বকী হত্যার তের বছর পূর্তিতে বিচার কেন চাই


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রকাশিত: মার্চ ৪, ২০২৬, ০৭:২৭ পিএম ত্বকী হত্যার তের বছর পূর্তিতে বিচার কেন চাই

ত্বকী হত্যার বিচার চেয়ে আমরা সমবেত হচ্ছি গত তের বছর ধরে, এবং প্রত্যেক বছরই আমাদের অনুভূতি হয় এই রকমের যে, আমরা অপরাধী। এই কিশোরকে আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারিনি। আমরা যে কেবল ত্বকী হত্যার বিচার চাই, তা নয়। আমরা এটাও চাই যে, ত্বকীরা যেন সমাজে বাঁচতে পারে। তাদের যে মেধা, তাদের যে সম্ভাবনা, তাদের জ্ঞানানুশীলনের যে আগ্রহ, সেগুলো যেন তারা বিকশিত করতে পারে।

ত্বকীকে আমি প্রতীক হিসেবে দেখতে পাই। বাংলাদেশের কিশোরদের একজন প্রতীক। যে কিশোর গান গায়, পড়াশোনা করে, সুধীজন পাঠাগারে নিয়মিত যায়, আন্দোলনে থাকে, মিছিলে যায় এবং স্বপ্ন দেখে যে, এই অন্যায়ে ভরা সমাজ, জগৎটাকে সে বদলাবে। ত্বকীকে আমি সেই কৈশোরের, সেই অঙ্গীকারের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে পাই। আবার তার ওপরে যে আক্রমণ হয়েছে, সে যে বাঁচতে পারল না, এত অল্প বয়সে কৈশোরেই সে ঝরে গেল, সেটাও একটা প্রতীক। যেন আলোর সঙ্গে অন্ধকারের যে দ্বন্দ্ব বাংলাদেশে চলছে, তারই প্রতীক। তো আমরা এই দুটো সত্যের মধ্যে আছি। এই যে কিশোররা আছে, আলো আছে, ত্বকী আছে, আবার অন্ধকার আছে; যে অন্ধকার ত্বকীকে গ্রাস করে ফেলেছে। প্রশ্ন হলো, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটা জয়ী হবে। আমরা ত্বকীর মৃত্যুর কথা স্মরণ করি তখন বিশেষভাবে এই প্রশ্নটাই সামনে আসে যে, কে জয়ী হবে বাংলাদেশে। আলো, নাকি অন্ধকার?

ত্বকীকে কেন হত্যা করা হয়েছে সেটা আমরা জানি। ত্বকীর  কোনো অপরাধ ছিল না, অপরাধ ছিল তার পিতা রফিউর রাব্বির। তিনি দুটি অপরাধ করেছেন; একটা হচ্ছে, তিনি নারায়ণগঞ্জে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, অন্যটি হচ্ছে তিনি সংস্কৃতির চর্চা করতেন। এক সময় নারায়ণগঞ্জ বিখ্যাত ছিল সংস্কৃতি চর্চার জন্য, খেলাধুলার জন্য। সেই নারায়ণগঞ্জকে যারা এই চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসের কেন্দ্রে পরিণত করেছিল ত্বকীর পিতা তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। এই  দুই অপরাধের শাস্তি দেবার জন্য তার এই কিশোর সন্তানটিকে হত্যা করা হয়েছে এবং তার বিচার আজো হচ্ছে না। 

ইতিমধ্যে সরকারেরও বদল হয়েছে আওয়ামী লীগ গিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার গিয়েছে, এখন নতুন সাকার এসেছে। আমরা সরকারের ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই, রাষ্ট্রের ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই। আমরা তো দীর্ঘকাল ধরে সংগ্রাম করে এসেছি। এই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এখনো এই দ্বন্দ্বটা রয়ে গেছে। আমরা আমাদের চতুর্দিকে এখন যেটা দেখতে পাচ্ছি, সেটা হলো একটা ভীতি। মানুষ একটা ভয়ের মধ্যে আছে। নানান রকমের ভয়। তার নিরাপত্তা নেই, মেয়েদের নিরাপত্তা নেই, জীবিকার নিরাপত্তা নেই, চলাফেরার নিরাপত্তা নেই। রাস্তায় বেরুলে গাড়ি চাপা পড়ে মারা যায়, হত্যাকাণ্ড হয়, জিনিসপত্রের দাম অসম্ভব বাড়ছে। এ ছাড়া কোন কথা বলে বিপদে পড়বে- এই ভয়ও আছে। অন্যদিকে আবার এই সমস্ত ভয়ের কারণে হতাশার সৃষ্টি হচ্ছে। ভয়ের আরেকটা কারণ হচ্ছে বিচার নেই। বিচারহীনতার একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। একদিকে ভীতির সংস্কৃতি, আরেকদিকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। তার কারণে একটা হতাশা দেখা দিচ্ছে যে, আমরা বোধহয় পরাজিত হয়ে গেছি।

আমরা জয়ী হয়েছিলাম সংগ্রাম করে। ব্রিটিশ আমলে সংগ্রাম করলাম। পাকিস্তান আমলে সংগ্রাম করলাম। অত বড় জঘন্য যে শক্তি পাকিস্তানি শাসক, তাদের তাড়িয়ে দিলাম। আবার চব্বিশে ঘাড়ের উপর চেপেবসা জগদ্দল পাথরকেও সরিয়ে দিলাম। কিন্তু আমরা যেন পরাজিত হয়ে আছি। সেই পরাজয় যেন চতুর্দিকে আমরা দেখতে পাই। সে জন্যই আমাদের প্রতিবাদ করতে হবে। আর বেঁচে থাকার জন্যই ত্বকী সহ এমনি নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে হবে। এই বিচার চাওয়া দরকার হয়ে পড়ে।

আরেকটা কথা আমার খুব মনে পড়ে। নারায়ণগঞ্জ শহর ছিল সংস্কৃতির প্রতীক, খেলাধুলার প্রতীক। আমরা আমাদের কৈশোরে, আমাদের যৌবনে ওই শহরে যাতায়াত করতাম ঢাকা থেকে। আমরা আনন্দিত হতাম ওই সমস্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে, নদীর ধারে গিয়ে। নারায়ণগঞ্জ বিখ্যাত ছিল খেলাধুলার জন্য। সেই নারায়ণগঞ্জের যে দুর্দশা আজকে হয়েছে, সেই দুর্দশা আমাদের বাংলাদেশেরই প্রতীক। যেন বাংলাদেশের সমস্ত সম্ভাবনাগুলো ওইভাবে দমিত হয়ে গেছে। তার কারণ হচ্ছে এই, আমরা নতুন রাষ্ট্র পেলাম বটে কিন্তু এই রাষ্ট্র যে ধরনের রাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিল, সেইরকম হলো না। এটা একটি আদর্শ রাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিল। কথা ছিল সমাজ হবে বৈষম্যহীন, রাষ্ট্র ও সমাজে নাগরিকদের সমান অধিকার থাকবে, সুযোগ থাকবে সমান। এখানে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে এবং সর্বস্তরে প্রকৃত জনপ্রতিনিধি থাকবে। এই সমস্ত স্বপ্ন নিয়েই তো আমরা এই দেশকে স্বাধীন করেছিলাম। তাদের (পাকিস্তানিদের) তাড়িয়েছিলাম। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। বাস্তবায়িত যে হয়নি, তারই প্রতীক হচ্ছে ত্বকীর চলে যাওয়া।

ত্বকী সংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিল। আজকে সেই সংস্কৃতি চর্চাটাকে আমাদের আবার পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। কারা করবেন? তারাই করবেন যারা বিবেকবান ও বুদ্ধিমান। বিবেক ও বুদ্ধিকে এখানে একত্রিত করতে হবে। বিবেক বলবে, এই সমাজ অন্যায়, এই ত্বকীদের চলে যাওয়াটা অন্যায়, ত্বকীকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারাটা আমাদের অপরাধ। সেটা একটা বিবেকের প্রশ্ন। এবং বুদ্ধি বলবে, বুদ্ধিমান মানুষ বলবে যে, এই সমাজকে বদলাতে হবে। এই সমাজ মানবিক নয়, এখানকার সম্পর্কগুলো অমানবিক, এখানে শোষণ চলে, এখানকার সম্পদ পাচার হয়ে যায়। সে সম্পদ ব্রিটিশদের সময়ে লন্ডনে চলে গেছে, পাকিস্তান আমলে করাচিতে গেছে, আজ পৃথিবীর নানা শহরে, নানান রাজধানীতে সে সম্পদ চলে যাচ্ছে। আমাদের মেধা, সেও পাচার হয়ে যাচ্ছে। সম্পদ পাচার হচ্ছে, মেধা পাচার হচ্ছে। মেহনতি মানুষের শ্রমের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র ও সমাজ টিকে আছি কোনভাবে। কাজেই এই ব্যবস্থাটা বদল করবার জন্য যে রাজনীতি প্রয়োজন, সেই রাজনীতির জন্য সংস্কৃতির চর্চা দরকার। আমরা যারা বিবেকবান, বুদ্ধিমান— আমাদের বুদ্ধি বলছে যে এটা বদলানো দরকার, হৃদয় বলছে, বিবেক বলছে যে এটা সহ্য করা যায় না।

ত্বকী হত্যার বিচার আমরা চাই। গত তের বছর ধরে চেয়ে এসেছি। এখনও চাই। অবশ্যই সে বিচার হবে। কিন্তু এই বিচার শুধু নয়। ত্বকীরা যাতে নিরাপদে এখানে থাকতে পারে; ত্বকীরা যাতে তাদের মেধা, তাদের প্রতিভা, সম্ভাবনা, আকাঙ্ক্ষাকে চরিতার্থ করতে পারে সেটাও আমরা চাই। এই সমাজ যাতে মানবিক সমাজ হয়, সেটা দেখাও আমাদের কর্তব্য। সংস্কৃতি চর্চার আরেকটি উপাদান হচ্ছে জ্ঞানানুশীলন। যেটা ত্বকী করত। সে পাঠাগারের লোক ছিল। সেই জ্ঞানানুশীলনও বাংলাদেশে অনেক নিচের দিকে চলে গেছে। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার যে, পরিমাণগতভাবে আমাদের শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু গুণগতভাবে শিক্ষাকে আমরা উন্নত করতে পারলাম না। ত্বকীর বিচারের জন্য আন্দোলন তাই, সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনও বটে। এই কথাটাও আমাদের মনে রাখতে হবে, এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

 

ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়