আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেমাই উৎপাদনের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। উন্মোচিত হওয়া ভয়াবহ এই চিত্রের পেছনে রয়েছে
দীর্ঘদিন ধরে চলা প্রতারণা, জালিয়াতি, ভেজাল কারবার, শুল্ক ফাঁকি, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা ও অপরাধের এক বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। যার মূলে রয়েছে কবির হোসেন ওরফে মুহুরি কবীর এবং যুবলীগ ক্যাডার রিপন ওরফে সেমাই রিপন নামে দুই ব্যক্তি।
সমালোচিত এই দুই ব্যক্তি সেমাই কারখানার আড়ালে প্রতারণা, জালিয়াতি, ভেজাল কারবার ও সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছিলো।
বৃহস্পতিবার ২৬ ফেব্রুয়ারি সদর উপজেলার শহীদ নগর এলাকায় র্যাব, জেলা প্রশাসন ও নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে গ্রামীণ ও আনন্দ সেমাই নামক দুই কারখানায় অভিযান পরিচালনা করা হলে এই দুই ব্যক্তি কৃতকর্মের ফিরিস্তি বেরিয়ে আসে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহরিয়ার পারভেজের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
অভিযানে দেখা যায়, ‘গ্রামীণ সেমাই’ কারখানাটি বিএসটিআইয়ের সিল ব্যবহার করলেও তাদের কাছে কোনো বৈধ অনুমোদনের কাগজপত্র নেই।
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদনের দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা এবং উৎপাদিত সেমাই জব্দ করা হয়।
অন্যদিকে, ‘আনন্দ সেমাই’ কারখানায় অনুমোদন থাকলেও ভেজাল কারবার ও অস্বাস্থ্যকর সেমাই তৈরি এবং ক্ষতিকর উপায়ে তা সংরক্ষণ করাসহ রাজস্ব ফাকির মত আরও নানা অনিয়মের পসরা সাজিয়ে বসেছিল কারখানার মালিক বিতর্কিত সেমাই রিপন। এসকল কৃতকর্মের দায়ে ওই কারখানাতেও ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, আনন্দ সেমাই কারখানার মালিক রিপন নিজেকে কখনো সাংবাদিক, কখনো যুবলীগের কর্মী, বর্তমানে জাকির খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার উপর হামলা ও গুলি চালিয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ করা এই রিপনের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক হত্যা মামলা। এছাড়াও, প্রতারণা ও জালজালিয়াতি সহ ভূমিদস্যুতার ঘটনায় আরও একাধিক মামলা রয়েছে রিপনের নামে। একাধিকবার করেছে কারাবরণও।
অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে বিএনপি নেতা জাকির খানের নাম ভাঙ্গিয়ে এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই সেমাই রিপন। তার বিরুদ্ধে শহীদ নগরের লুইয়ার মাঠের জমি জোরপূর্বক দখল ও নিয়ন্ত্রণে নেয়ার মত অভিযোগ রয়েছে। এলাকায় ভয়ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে নিজের অপরাধ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রেখেছে যুবলীগ কর্মী থেকে জাকির খানের লোক বনে যাওয়া এই সেমাই রিপন।
এদিকে, স্থানীয়দের দাবি প্রায় দেড় দশক ধরে অবৈধ সেমাই কারখানার মাধ্যমে নিম্নমানের ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য বাজারজাত করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে রিপন। তার কারখানায় নিম্নমানের পোড়া তেল এবং ক্ষতিকর উপাদানের মিশ্রণে সেমাই তৈরি হতো বলে জানিয়েছে আভিযানিক দলের একটি সূত্র।
অন্যদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গ্রামীণ সেমাই কারখানার পেছনে রয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর নাজমুল আলম সজলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুহুরী কবির।
তিনি কয়েক যুগ যাবৎ অবৈধ কারখানা পরিচালনার পাশাপাশি ভূমিদস্যুতা, চাঁদাবাজি ও ঝুট সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণসহ নানা অপকর্মে জড়িত।
একসময় আদালতের মুহুরী হিসেবে কাজ করলেও বর্তমানে তিনি অবৈধ উপায়ে টাকার কুমির বনে গেছেন। বিগত সময়ে শামীম ওসমান ও নাজমুল আলম সজলের নাম ব্যবহার করলেও বর্তমানে জাকির খানের বড় ভাই কবির খানের নাম ব্যবহার করে সকল ধরনের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে এই মুহুরী কবির।
অভিযানে অংশ নেওয়া র্যাব-১১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল মাসুদ খান ও নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরের জেলা কর্মকর্তা সুরাইয়া শামসুন নাহার জানান, ‘জনস্বাস্থ্যবিরোধী যেকোনো কার্যক্রমের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
উল্লেখ্য, বিগত কয়েক বছর পূর্বেও সেমাই রিপনের কারখানায় অভিযান চালায় জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। ওই সময়ও তারা কারখানায় ভেজাল সেমাই তৈরীর প্রমাণ এবং রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার অভিযোগে তাকে কারাদণ্ড এবং জরিমানা করা হয়েছিল। সেই থেকে রিপনকে সেমাই রিপন ও ভেজাল রিপন হিসেবে চেনেন স্থানীয়রা।


































আপনার মতামত লিখুন :