ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে শুরুতে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছিল। যখন তিনটি আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়। তখন জেলার রাজনৈতিক সমীকরণে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়। ভোটের মাঠে দলটির উপস্থিতি থাকলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে অনেকটাই যেনো ছিটকে পড়েছিল জামায়াত। তবে সেই চিত্র বদলে যায় হঠাৎ নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ইকবাল হোসেন ভূঁইয়ার পুনরাগমনে।
নির্বাচনী মাঠে তার ফেরার ঘোষণার পরপরই আসনটিতে নতুন করে আলোচনার ঝড় ওঠে। ভোটারদের মধ্যে যেমন কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তেমনি অস্বস্তিতে পড়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরাও। সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ উভয় এলাকাতেই ইকবাল হোসেন ভূঁইয়ার দীর্ঘদিনের পরিচিতি ও একটি সুসংগঠিত ভোটব্যাংক রয়েছে বলে স্থানীয় রাজনীতিতে তার উপস্থিতিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ফলে তার কামব্যাক নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে জামায়াতকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
এর আগে গত ২৫ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইকবাল হোসেন ভূঁইয়া জানিয়েছিলেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী মো. শাহাজান শিবলীকে সমর্থন দেবেন। সেই ঘোষণার পর ধারণা করা হচ্ছিল, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে জামায়াতের প্রভাবও ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাবে। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টে যায় তার হঠাৎ প্রত্যাবর্তনে।
নির্বাচনের শুরুতে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে ইকবাল হোসেন ভূঁইয়াকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছিল, রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজারে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীরা তেমন প্রভাব ফেলতে না পারায় তা একসময় স্তিমিত হয়ে পড়ে। ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছিল, দীর্ঘদিন পর প্রকাশ্যে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেয়েও জামায়াতে ইসলামী সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না। জোটগত সমীকরণের কারণে সম্ভাবনাময় আসনগুলো ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে দলটির গতি অনেকটাই থামিয়ে দেয়।
এর প্রভাব পড়ে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যেও। একদিকে হতাশা, অন্যদিকে প্রত্যাশা ভঙ্গ দুটোই স্পষ্ট হয়ে ওঠে মাঠের রাজনীতিতে। বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতিতে যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে, সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জামায়াত নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা শুরু করেছিল। নারায়ণগঞ্জেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। পাঁচটি আসনেই দলটির নেতাকর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ কিছুটা ইতিবাচক সাড়া ফেলেছিল।
নির্বাচনের প্রাক্কালে নারায়ণগঞ্জ-৪ ও ৫ আসনে দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আসেন, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। কিন্তু বৃহত্তর জোট গঠনের সিদ্ধান্ত সেই সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে দেয়। শক্ত অবস্থান থেকেও সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে দলটির ভেতরে ‘আত্মত্যাগ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও বাস্তবতায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে।
দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামায়াতের রাজনৈতিক কার্যক্রম ছিল সীমিত ও চাপের মুখে। গণঅভ্যুত্থানের পর তৈরি হওয়া নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা দলটিকে আবারও প্রকাশ্যে রাজনীতির সুযোগ এনে দেয়। তবে সেই সুযোগ কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিলই। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই ইকবাল হোসেন ভূঁইয়ার কামব্যাক নতুন করে হিসাব বদলে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, একজন পরিচিত ও সংগঠক প্রার্থী মাঠে থাকলে জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে চাঙ্গাভাব তৈরি হয়। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে ইকবাল হোসেন ভূঁইয়ার প্রত্যাবর্তন সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। ফলে একটি প্রার্থীর কামব্যাক শুধু একটি আসনের সমীকরণই নয়, পুরো জেলায় জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানকে আবারও আলোচনার টেবিলে তুলে দিয়েছে।
































আপনার মতামত লিখুন :