মাওলানা আবু তাদের জিহাদী নারায়ণগঞ্জ তো বটেই দেশের আলেম ওলামা সমাজের মধ্যে একজন বিজ্ঞ বুজুর্গ হিসেবেই পরিচিত। দেশের অনেক প্রসিদ্ধ আলেম ওলামা ছিলেন জিহাদী হুজুরের ছাত্র। এবার সেই হুজুরকে বিদায় নিতে হয়েছে।
১১ জুলাই নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জাকির খানের উপস্থিতিতে জিহাদী হুজুরকে বিদায় নিতে হয়।
অথচ এদিন বিকেলেও তিনি গণমাধ্যমে বলেছিলেন তাকে সরে যেতে একটি গোষ্ঠী ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে পেছন থেকে খেলছেন। শেষতক সেই খেলায় রেফারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন জাকির খানে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাকে ভুল বুঝিয়ে জিহাদী হুজুরকে সরিয়ে মাদ্রাসার কর্তৃত্ব নিতে চেষ্টা করছেন হেফাজত ও জমিয়তের বহুল বিতর্কিত নেতা ফেরদাউসুর রহমান ও হারুন অর রশিদ। এদের মধ্যে হারুনের বিরুদ্ধে ইয়াবা সেবনের অভিযোগ তুলেন হারুন। আর ফেরদাউসুরের বিরুদ্ধে চুরি ভোটে ছয় নয় সহ আলেমদের গ্রেপ্তারের কুশীলব হিসেবে অভিযোগ তুলেন।
শনিবার জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম দেওভোগ মাদরাসার শিক্ষক ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুফতি হারুন অর রশিদকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়াকে কেন্দ্র করে আবার নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। এবার শিক্ষার্থীদের দাবী মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আবু তাহের জিহাদীর পদত্যাগ। শেষ পর্যন্ত রাতে মাদ্রাসা কমিটির হেদায়েতউল্লাহ খোকন জানিয়েছেন যে আবু তাহের জিহাদী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বৃষ্টিতে ভিজে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বিভিন্ন স্লোগান দেন। এ সময় তারা দাবি তুলেন দফা এক দাবি এক জিহাদীর পদত্যাগ। বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন সহ মাদ্রাসার অভ্যন্তরে দেয়ালে জিহাদী হুজুর এর পদত্যাগ দাবি করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা গেছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, আন্দোলনরতদের দাবি ছিল, পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে আবু তাহের জিহাদীকে অপসারণের বিষয়ে লিখিত ও মৌখিকভাবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করতে হবে। অন্যথায় তারা অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে বলে জানায়। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে অবস্থান অব্যাহত রাখে। রাত ৮টায় জাকির খান মাদ্রাসায় উপস্থিত হয়ে পরিচালনা কমিটির সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনের লক্ষ্যে আবু তাহের জিহাদী স্বেচ্ছায় তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তক্রমে মাওলানা শফিকুর রহমানকে মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
জাকির খানের উপস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির ১৪নং ওয়ার্ডের সভাপতি দিদার খন্দকার বলেছেন, প্রিয় শিক্ষার্থী আপনাদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে ইতোপূর্বে প্রথম দিনে আন্দোলন করেছিলেন। সেদিন আমার নেতা জাকির খান আপনাদের মাঝে হাজির হয়ে তিন দিনের সময় নিয়েছিলেন। আর যেন মাদ্রাসায় আর কোন আন্দোলন সংগ্রামের সৃষ্টি না হয় সে লক্ষ্যে জাকির ভাই কাজ করছেন। জাকির ভাই উপর আপনার আস্থা রেখেছেন, সে কারণে জাকির ভাই আপনাদের আদর করেন ও স্নেহ করেন। আজ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা সাধুবাদ জানিয়ে আপনারা যার যার ক্লাসে ফিরে যাবেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা ঘোষণা করেছি যে মাদ্রাসার মোহতামিম আবু তাহের জিহাদী সাহেব নিজে থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই কারণে এই কমিটি ও জাকির ভাইয়ের পক্ষ থেকে তাকে স্বসম্মানে বিদায় দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আজ থেকে জিহাদী সাহেব এই মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল নন। তাই এই কমিটি ও জাকির ভাইয়ের পক্ষ থেকে মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মাওলানা শফিকুর রহমানকে।
এর আগে ৫ জুলাই দুপুর ১২টা হতে সন্ধ্যা ৬টা অবধি ওই আন্দোলনের সময়ে মাদ্রাসার ছাত্ররা মসজিদ কমিটির সভাপতি হেদায়েতুল্লাহসহ মোহাম্মদ মানিক, সাজ্জাদ দেওয়ান ও কমিটির অন্যান্য সদস্যকে মাদ্রাসার অভ্যন্তরে অবরুদ্ধ করে রাখে।
সংবাদ পেয়ে স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসী তাদের উদ্ধারের উদ্দেশ্যে মদ্রাসার প্রধান ফটক ভেঙে প্রবেশের চেষ্টা করে। এ সময় মাদ্রাসার অভ্যন্তরে অবস্থানরত আনুমানিক কয়েক হাজার ছাত্র এবং বাইরে অবস্থানরত প্রায় ৬ শতাধিক মুসল্লি “নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার” স্লোগান দিলে পরিস্থিতি আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সেই সাথে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির সমাধান না হওয়ার এক পর্যায়ে জাকির খানের গাড়িতে চড়ে আসতে দেখা যায় বহুল বিতর্কিত হেফাজত নেতা মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানকে।
ফেরদাউসুর রহমান পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য জাকির খানকে নিয়ে এলাকায় হাজির হন। সেই সাথে জাকির খান উপস্থিতির উদ্দেশ্য বক্তব্য রাখেন। সবশেষ আলোচনয় প্রাথমিকভাবে তিন দিনের মধ্যে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে ঐকমত্য হয়। সেই সাথে এ বিষেয়ে মহানগর বিএনপির নেতা জাকির খান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন মর্মে জানা যায়। সবমিলিয়ে জাকির খানের একজন সমালোচিত নেতার কাছে যেন তারা যেন মাথা নত করেছেন।
কে এই আবু তাহের জিহাদী
আবু তাহের দারুল উলুম দেওবন্দের উস্তাদ মাওলানা ফখরে বিহার আল্লামা বিহারি তাকে নিজের নামে “মুহাম্মদ হাসান” বলে ডাকতেন। দাদার কাছ থেকে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন শুরু করেন, অতপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল থানার অন্তর্গত ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম শাহবাজপুর মাদরাসার মক্তবে ভর্তি হন, এবং সেখানে তিনি নাহবেমীর জামাত পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। শাহবাজপুর মাদ্রাসার তার উস্তাদদের মধ্যে মাওলানা শামসুল হক, হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা আব্দুর রহমান চান্দিয়ারা প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
শাহবাজপুর মাদরাসায় নাহবেমীর জামাত শেষ করে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ইসলামী বিদ্যাপীঠ জামিয়া ইউনুসিয়া মাদরাসায় হেদায়াতুন্নাহু জামাতে ভর্তি হন, সেখানে তিনি হেদায়াতুন্নাহু থেকে জামাতে জালালাইন পর্যন্ত মোট পাঁচ বছর পড়াশোনা করেন। অত:পর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি দুনিয়াবিখ্যাত ইলম ও আমলের মারকায দারুল উলূম দেওবন্দের উদ্দেশ্যে ভারতে পাড়ি জমান। সেথায় তিনি মেশকাত ও দাওরা হাদিস (মার্স্টাস সমমান) সম্পন্ন করেন। দারুল উলূম দেওবন্দে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য লাভ করেন। যাদের মধ্যে মাওলানা আসআদ মাদানী, আব্দুল হক আযমী রহ. আরশাদ মাদানী, ফখরে বিহার আল্লামা মুহাম্মাদ হাসান বিহারী, দারুল উলূম দেওবন্দের প্রধান মুফতি হাবীবুর রহমান খায়রাবাদী, শাইখুল হাদিস আল্লামা নাসিরুদ্দিন খান, আল্লামা সাইদ আহমদ পালনপুরি, প্রখ্যাত আরবী ভাষাবিদ ওয়াহীদুজ্জামান, আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী, সাহেবজাদা আনজার শাহ কাশ্মীরী প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১৯৮৫ সালে ঢাকা মিরপুরস্থ দারুর রাশাদ মাদ্রাসায় খেদমতে আত্মনিয়োগের মাধ্যমে তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের সূচনা হয়। পরবর্তিতে তিনি কিছু ধর্মপ্রাণ মুসলমানের আন্তরিকতা ও সার্বিক সহযোগিতায় ঢাকা মুসলিমবাজারে ও কল্যানপুরে দুটি সুপ্রতিষ্ঠিত ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ হাতে গড়ে তুলেন। ২০১৮ সালে দেশের অন্যতম প্রাচীন ইসলামী বিদ্যাপিঠ নারায়ণগঞ্জ জেলায় অবস্থিত জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম দেওভোগ থেকে তার নিকট প্রিন্সিপালের দায়িত্বগ্রহণ করার আবেদন পেশ করা হলে তিনি তা সাদরে গ্রহণ করেন। অধ্যাবদি তিনি নিষ্ঠা ও দক্ষতার সহিত দারুল উলূম দেওভোগ, ঢাকা, বি-বাড়িয়া, মুন্সিগঞ্জ, শেরপুরের একাধিক প্রতিষ্ঠানের খেদমতে বিভিন্নভাবে নিয়োজিত রয়েছেন। তার ভক্তবৃন্দরা তার নামে গাজিপুরে জামিয়া তাহেরিয়া আশরাফুল উলূম নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তাছাড়াও তিনি বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার শুরা ও আমেলার একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
প্রাথমিক কর্মজীবনে তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহে খেদমত আঞ্জাম দিয়ে কিছু মুখলিছ, যুগ-সচেতন হক্কানী আলেম তৈরী করা। তাই তিনি প্রাথমিক কর্মজীবনের একটি অংশ মাাদ্রাসার চার দেয়ালের ভিতরে থেকে আপন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যপানে অভিরাম ছুটতে থাকেন। আল্লাহর মেহেরবানীতে মেহনতের ফসল ধীরে ধীরে পেতে থাকেন। এরই মধ্যে তারই হিতাকাংখী কিছু মুরুব্বী তার মধ্যে আলোচনা দক্ষতার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরে তাকে ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমেও দ্বীন প্রচারের পরামার্শ দেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন মসজিদে খতীব হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তারপর ধীরে ধীরে ওয়াজ মাহফিলের ময়দানে পদার্পন করেন। দাওয়াতী কাজে তিনি প্রায় ৪০ বছর যাবত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চষে বেড়িয়েছেন। পথহারা মানুষদেরকে দিয়েছেন পথের দিশা। তার আলোচনার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ খুঁজে পেয়েছে তাদের ঠিকানা। দেশের পাশাপাশি দাওয়াতী কাজের জন্য তিনি সৌদি আরব, হিন্দুস্থান, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ওমান, দুবাই প্রভৃতি রাষ্ট্র ভ্রমণ করেন।



































আপনার মতামত লিখুন :