দীর্ঘ ১২ বছর পর প্রবাস জীবন ছেড়ে নারায়ণগঞ্জ ফিরেন সাইপ্রাসে থাকা সালাউদ্দিন। থাকেন শহরের টানবাজারে। রাজধানীর যানজট পেরিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে ঢুকেই যেন তিনি অবাক। এত বড় সড়ক কল্পনা করতে পারেনি। এয়ারপোর্ট থেকে লিংক রোড আসতে সময় লেগে যায় প্রায় ৪ ঘণ্টা। বেলা ১২টায় লিংক রোডের সাইনবোর্ড হতে মাত্র ৭ মিনিটে গাড়িতে চলে আসেন চাষাঢ়ায়। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন ছদ্মপতন। নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের সামনে এসে গাড়ি আর চলে না। প্রায় ২০ মিনিট সেখানে আটকে। একটু ঠেলে ঠেলে চাষাঢ়ায় আসতে লেগে যায় আরো ১৫ মিনিট। এক কিলোমিটারেরও কম সড়ক পাড়ি দিতে ৩৫ মিনিট। চাষাঢ়ায় এসে বির্ধস্ত রাইফেল ক্লাব দেখে স্মরণ করছিলেন সালাউদ্দিন। জানলেন এটা ৫ আগস্টে আক্রান্ত। জ্যাম ঠেলে গাড়ি খানপুর হয়ে কালীরবাজারের সড়ক দিয়ে যাবে টানবাজারে। চাষাঢ়ায় ৩৫ মিনিটের জ্যাম ঠেলে গাড়ি যখন কালীরবাজার তখন সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় আরো ২৫ মিনিট। একটু একটু করে গাড়ি যায়। আরো ৩০ মিনিট পর পর পৌছান টানবাজারে। দুপুরের খাবার খেয়ে ফ্রেশ হয়ে সন্ধ্যায় একটু শহরে বের হন তিনি। উদ্দেশ্য সেই বোস কেবিনে চা পান আর বন্ধুদের আড্ডা দিবে। এক বন্ধুর ডাকে তিনি চাষাঢ়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। চেষ্টা করে পায়ে হেঁটে আসার। কিন্তু ফুটপাত তো হাঁটার জায়গা নাই। হকারে টুইটুম্বর। বাধ্য হয়ে চড়েন রিকশায়। বোস কেবিন হতে চাষাঢ়ায় আসতেই লেগে যায় ৪৫ মিনিট। পথিমধ্যে ধুলাবালুর যন্ত্রনায় নাভিশ্বাস। ওই সময়ে একটি ব্যানার চোখে পড়ে। জানতে পারেন সাখাওয়াত হোসেন খান সিটি করপোরেশনের প্রশাসক। চাষাঢ়ায় এসে বন্ধুর সঙ্গে আলাপকালে সালাউদ্দিন কিছুটা আশান্বিত হন। তিনি মনে করছেন প্রশাসক থাকতে চমক দিতে পারলেই নগরবাসী মেয়র হিসেবেও গ্রহণ করবে।
নগরবাসীর কাছে এখন যানজট সবচেয়ে বড় সমস্যা। তার চেয়ে বড় সমস্যা ফুটপাত। শহরের ফুটপাতে এক ফুট জায়গাও খালি নাই। চাষাঢ়া থেকে ডিআইটি, আর পুরাতন কোর্টের সামনে শায়েস্তা খান সড়ক, কালীরবাজারের সিরাজউদৌল্লাহ সড়ক সব জায়াগাতে শুধু হকার আর হকার।
এ হকার উচ্ছেদ করতে গিয়ে সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী রক্ত ঝরিয়েছিলেন। তখন হকারদের নিয়ন্ত্রন করতেন শামীম ওসমান। এখন পালাবদল হয়ে বিএনপির ঘাড়ে। কিন্তু কেউ দায়িত্ব নেয় না। আবার কেউ কথাও বলে না। হকারদের চাঁদা বন্ধ হয়নি। হাতবদল হয়েছে। সে কারণেই হকারদের এত দাপট। অসহায় প্রশাসন কারণ পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব। অথচ এসব প্রভাবকে পেছনে ফেলেই ফুটপাত হকারমুক্ত করতে চেয়েছিলেন আইভী। কিছুদিন সফলও হন। তখন নগরবাসী এক ভিন্ন আবহ পেয়েছিল। মনে হয়েছিল বিদেশী উন্নত কোন রাষ্ট্রে আছেন। ব্যাংকক, মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরের মত দেশে আছেন নারায়ণগঞ্জবাসী। ফুটপাত দিয়ে হাঁটার মজাই আলাদা। চাষাঢ়া থেকে দুই নং গেট যেন মামুলি বিষয়। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি একেবারে ভিন্ন। সড়কের সংস্কার কাজে ধীরগতির কারণে শহর এখন ধুলাময়। চাষাঢ়া হতে শহরের যে প্রান্তে যাবেন কালো চুল সাদা হয়ে যাবে ধুলার আস্তরণে।
রয়েছে অটো রিকশার দাপট। কোন শৃঙ্খলা নাই। যত্রতত্র পার্কিং করে রাখে অটো রিকশাগুলো। রঙ সাইডে চলাচল করে। ফলে শহরে যানজট নিয়ন্ত্রনহীন। ট্রাফিক পুলিশের ঘাম ঝরে। চেম্বার ও বিকেএমইএ টাকা দিয়ে ভলেন্টিয়ার রাখে সড়কে। সকাল হতে রাত অবধি যুবক তরুণেরা কাজ করে। তবুও শহর যেন এক মৃত নগরীর মত।
সালাউদ্দিনের মতে, সাখাওয়াত সাহেব যদি নগরবাসীর এসব কথা অনুধাবন করতে পারেন তিনি হবেন হিরো। কারণ তিনি এখন প্রশাসক। সামনে ভোট দেওয়ার সময় আসছে। তিনি মেয়র পদে দাঁড়ালে হবেন জনতার। সেজন্য আগে জনতার হতে হবে। জনতার জন্য ফুটপাত হকারমুক্ত রাখতে হবে। নগরবাসীকে হাঁটার সুযোগ দিতে হবে। ধুলাবালির প্রকোপ কমানো জরুরী। নগরবাসী অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। সাখাওয়াত আগে চড়তেন নিজের গাড়িতে এখন সরকারী গাড়িতে। তিনি চাষাঢ়া হতে হাঁটলে বুঝবেন ধুলার যন্ত্রনা। অটো রিকশার নিয়ন্ত্রন আনা জরুরী।
হকারদের জন্য হকার্স মার্কেট আছে। তারা সংখ্যায় হয়তো কয়েক হাজার। কিন্তু নগরবাসী কয়েক লাখ। নগরবাসীর কাছে হকাররা নস্যি। জনমত ফুটপাত হকারমুক্তের পক্ষে। সুবিধাভোগীর হকারদের পক্ষে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় এখন সাখাওয়াতের। অটো রিকশা নিয়ন্ত্রন জরুরী। যানজটে স্থবির থাকেন শহর। নগরবাসী এসব চায় না। তারা চায় সুষ্ঠু একটি নগরী। ক্লিন শহর। সড়কের মাঝে কিংবা পাশে থাকবে না ব্যানার ফেস্টুনের ছড়াছড়ি। আইল্যান্ডের মাঝের গাছগুলো হয়ে উঠবে সবুজে ঘেরা। পরিচ্ছন্ন নগরীতে উড়বে না ধূলার কনা।
বন্ধুর সঙ্গে আলাপ শেষে সালাউদ্দিন বলে উঠেন, আগে আইভী বলতেন ফুটপাতের চাঁদার ভাগ শামীম ওসমান ও তার লোকজন নেয়। এখন হয়তো চাঁদা উঠে। বহুজনের পকেটে যায়। মিস্টার সাখাওয়াত নগরবাসীর এসব আবদার যদি শুনেন তাহলে বদলে যাবে এ নগরের চিত্র। দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী লীগ শাসনামলের পরিবর্তনের সুফলও নগরবাসী দেখতে চায়। সাখাওয়াতের জীবন নাকি চ্যালেঞ্জের। তিনি নিশ্চয় এসব চাঁদাবাজীর কাছে মাথা নত করবে না। অনুসারীদেরও ধারে কাছে ভিড়তে দিবে না। একজন পরীক্ষিত আইনজীবী যিনি সাত খুনের মামলার মত ঘটনায় আপস করেনি তিনি গুটিকয়েক হকার আর অটো রিকশা সহ জঞ্জাল সৃষ্টিকারীদের সঙ্গে সুর মিলাবেন না এমনটাই প্রত্যাশা করেন শীতলক্ষ্যার তীরের এ জনপদের লাখ লাখ মানুষ।



































আপনার মতামত লিখুন :