News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩

নারায়ণগঞ্জ শহরের বুকে ডেঙ্গু চাষ


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | বিশেষ প্রতিনিধি প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২৬, ১০:১৪ পিএম নারায়ণগঞ্জ শহরের বুকে ডেঙ্গু চাষ

ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া বাগে জান্নাত মহল্লায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়ের মালিকানাধীন জায়গায় শ্রমিকদের জন্য একটি হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা নিলেও সেটা বাস্তবায়ন করেনি। বরং শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের পরিত্যক্ত ভবনগুলো ঘন জঙ্গলে আর জলাবদ্ধতায় চাষ হচ্ছিল ডেঙ্গু মশার। বিগত দিনে এই স্থানটি পরিস্কার করাতে স্থানীয় এলাকাবাসী নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনকে বার বার তাগিদ দিলেও কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তবে নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হচ্ছেন খানকে অবগত করার পরপরই অ্যাকশন নেন। 

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া বাগে জান্নাত জামে মসজিদ সংলগ্ন শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রটির ভবনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ২০১৪ সালে বিকেএমইএ’র উদ্যোগে শ্রমিকদের চেক হস্তান্তরের একটি অনুষ্ঠানে তৎকালীন শ্রম প্রতিমন্ত্রীর কাছে চাষাঢ়া শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রে শ্রমিকদের জন্য একটি হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন সংসদ সদস্য ও বিকেএমইএ’র সভাপতি সেলিম ওসমান। পরে ২০১৫ সালে মে দিবসের অনুষ্ঠানে শ্রমিকদের জন্য হাসপাতাল নির্মাণের জন্য সরকারকে ৩ কোটি টাকা দেয়ার প্রস্তাব দেন এমপি সেলিম ওসমান। ২০১৭ সালের ৩০ জুলাই ওই স্থানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়ের অধীনস্থ কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ মহাপরিদর্শকের নতুন কার্যালয় উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির তৎকালীন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মজিবুল হক চুন্নু এমপি বলেছিলেন, নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া বাগে জান্নাত মহল্লায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়ের মালিকানাধীন জায়গায় দিল্লীর ফরটিস হাসপাতাল ও সরকারের পিপিপি চুক্তির আওতায় সাড়ে ৩শ’ কোটি টাকা ব্যায়ে ৩০০ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ করতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে যার টেন্ডার সম্পন্ন হয়ে গেছে। আগামী সেপ্টেম্বরেই নির্মাণ কাজ চালু হবে বলে আশা করছি। ওই ৩০০ শয্যা হাসপাতালের মধ্যে ১০০ শয্যা শ্রমিকদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। যাতে শ্রমিকরা কম খরচে উন্নত চিকিৎসা নিতে পারে।

এদিকে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রীর ওই ঘোষণার ৯ বছর বেরিয়ে গেলেও অদ্যাবধি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের কোন উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অর্থের অভাবে প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় চাষাঢ়া শ্রম কল্যাণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ওই জায়গাটি বর্তমানে পরিণত হয়েছিল ডেঙ্গু মশার প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে। সরেজমিনে দেখা গেছে, শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের অভ্যন্তরে এক তলা ভবনটির ভেতরে ও সম্মুখে পানি জমে রয়েছে। ভেতরে চিকিৎসক ও কম্পাউন্ডের কোয়ার্টার দু’টি এক তলা ভবন অনেক আগেই পরিত্যক্ত হয়ে রয়েছে। পরিত্যক্ত ভবন ৩টির আশেপাশের এলাকা গাছ গাছালিতে জঙ্গলের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের অভ্যন্তরের এলাকা নিচু হওয়ায় সেখানে সারাবছরই বৃষ্টির পানি জমে থাকতো। যে কারণে ওই এলাকাটি পরিণত হয়েছিল ডেঙ্গু মশার প্রজনন কেন্দ্র।

স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, দীর্ঘদিন ধরেই চাষাঢ়ায় প্রস্তাবিত শ্রমিক হাসপাতালের এই শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রটি পরিণত হয়েছিল জঙ্গল ও বর্জ্যরে ভাগাড়ে। জলাবদ্ধতার পানি জমে এখানে ডেঙ্গুর চাষ হচ্ছিল। গত কয়েক বছর ধরেই এই জলাবদ্ধতার পানিতে সৃষ্ট ডেঙ্গু মশার আক্রমনে ঘরে ঘরে ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত রোগী ছিল। শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের এই ডেঙ্গু মশার প্রজনন কেন্দ্রটি পরিস্কার করার জন্য নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাছে একাধিকবার আবেদন জানিয়েছিল এলাকাবাসী। তবে বারবার আবেদন জানানো হলেও দীর্ঘদিনেও কোন ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি।

নাসিকের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা জানান, এখানে দীর্ঘ ১৫-২০ বছর ধরে জঙ্গল ও জলাবদ্ধতায় ডেঙ্গু মশার প্রজনন কেন্দ্র হলেও এটি পরিস্কারে তাদেরকে কেউ অবগত করেনি। নাসিকের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান স্যারের নির্দেশে নাসিকের মশক নিধনের ১০-১২ জনের একটি টিম ২ দিন ভালমতো মশার ওষুধ ছিটিয়ে এরপর নাসিকের মালি বিভাগের ৭ জনের একটি টিম এই জঙ্গলটি পরিস্কার শুরু করেছেন।

চাষাঢ়া বাগে জান্নাত পঞ্চায়েত পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরীফ সুমন জানান, বিগত সরকারের আমলে নাসিকের প্রধান নির্বাহী পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তাদের শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের ডেঙ্গু মশার প্রজনন কেন্দ্র সম্পর্কে অবগত করা হলেও তারা এটি পরিস্কার করার বিষয়ে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেননি। শুধুমাত্র মশার ওষুধ ছিটিয়ে দায় সারেন। তবে নাসিকের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে অবগত করা মাত্রই তিনি দ্রুত এটিকে স্থায়ীভাবে মশার প্রজনন কেন্দ্র নির্মূলে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। তিনি সিটি করপোরেশনের ১২নং ওয়ার্ডের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. গোলাম মোস্তফা ও পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা আলমগীর হিরনকে এ বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেন। তার নির্দেশের পরদিন থেকেই শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের অভ্যন্তরে জমে থাকা পানিতে ভালমতো মশার ওষুধ ছিটিয়ে জঙ্গল পরিস্কার করতে শুরু করে। গত এক সপ্তাহ ধরে নাসিকের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা এখানে কাজ করছে। এজন্য নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানসহ সংশ্লিষ্টদের বাগে জান্নাত মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। পাশাপাশি শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের ৩টি  পরিত্যাক্ত ভবন ও আশেপাশের খালি জায়গায় যাতে ভবিষ্যতে ঘন জঙ্গল না হয় সেজন্য শ্রম কল্যাণ কেন্দ্র ও কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শকের কার্যালয়ের কর্তৃপক্ষের কাছেও দাবি জানিয়েছি।

এ বিষয়ে শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের চিকিৎসক ডা. রিফাত মেহজাবিন জানান, পিপিপি চুক্তির আওতায় শ্রমিক হাসপাতাল নির্মাণ হওয়ার কথা থাকলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। এখানে হাসপাতাল হওয়ার আগে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের বাজেট দেয়া হতো। কিন্তু হাসপাতাল নির্মাণের জন্য স্থানটি নির্ধারিত হওয়ায় সেই বরাদ্দও দেয়া হচ্ছিলনা। ভবনগুলো পরিত্যক্ত হওয়ার কারণে এখানে ঘন জঙ্গল ও জলাবদ্ধতায় ডেঙ্গু মশার বিস্তার লাভ করে। গত মে দিবসের অনুষ্ঠানের আগে নাসিকের প্রশাসক মহোদয়কে আমন্ত্রন জানাতে গিয়েও আমরা শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের ভিতরের চিত্র জানিয়েছিলাম। তিনি আমাদের আশ^াস দিয়েছিলেন দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন। এ কারণে নাসিকের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানসহ সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। জঙ্গল পরিস্কারের পরে ভেতরে জমে থাকা বর্জ্যগুলো অপসারণ করা হলে আমরা সেখানে বাগান করার উদ্যোগ নিব।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শক কার্যালয়ের উপ মহা পরিদর্শক রাজীব ঘোষ জানান, আমাদের কার্যালয়ের পিছনে শ্রমিকদের হাসপাতালের জন্য প্রস্তাবিত স্থানটি দীর্ঘদিন ধরেই পরিত্যক্ত হয়ে ঘন জঙ্গলে পরিণত হয়েছিল। আমরা কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও দক্ষ কর্মী না পাওয়ায় জঙ্গল পরিস্কার করতে পারিনি। গত মে দিবসের অনুষ্ঠানের আগে আমন্ত্রন জানাতে গিয়ে নাসিকের প্রশাসক মহোদয়কে আমরা শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের ভিতরের চিত্র জানিয়েছিলাম। তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন বলে জানিয়েছিলেন। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নাসিকের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের এই উদ্যোগ অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করছেন। জঙ্গল পরিস্কার হয়ে গেলে সেখানে তারা বাগান করার উদ্যোগ নিবেন।