এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সদর) আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের মনোনয়ন পেয়েছেন বাংলাদেশ জমিয়তে উলামা ইসলামের নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী। কিন্তু তিনি বিএনপি দলীয় মনোনয়ন পেলেও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তেমন কাছে টানতে পারছেন না। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তার কাছ থেকে দূরেই থেকে যাচ্ছেন।
আর তাই এবার মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী যেন ভিন্নমত বেছে নিয়েছেন। বিভিন্ন সভা সমাবেশে এমন সব বক্তব্য রাখছেন যাতে করে নেতাকর্মীদের কাছে আলোচনায় এসে যায়। বিভিন্ন সভা সমাবেশে শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের যত সব তৈলাক্ত বক্তব্য রেখে যাচ্ছেন। বিশেষ করে বিএনপির সাবেক চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে অতিরিক্ত তোষামোদীমূলক বক্তব্য রেখে যাচ্ছেন।
বিভিন্ন সভা সমাবেশে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীর বক্তব্যে চাটুকারিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। যা স্বয়ং বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যেই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিগত সময়ে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মনির হোসাইন কাসেমীর মতোই ধর্মীয় লেবাসধারী কিছু লোকজন অতিরিক্ত তেলবাজী করতেন শেখ হাসিনাকে। বর্তমানে মনির কাসেমী সেই কাজটিই করে যাচ্ছেন বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে।
জানা যায়, গত ১৮ জানুয়ারি বিকেলে ফতুল্লার বিলাসনগর এলাকার দারুসসুন্নাত ছালেহিয়া মোহেব্বীয়া দীনিয়া মাদরাসায় এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। আর এই মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী বলেন, ভবিষ্যতে যিনি দেশের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, তিনি তারেক রহমান সাহেব। উনি নির্বাসিত জীবন যাপনের সাথে সাথে তার আমূল পরিবর্তন হয়েছে। তিনি যেকোনো দাড়িওয়ালা-জুব্বাওয়ালা আলেমের চাইতে কোনো দিক থেকে কম নয়। তিনি খুবই বেশি আমলদার মানুষ, তার চেহারার দিকে তাকালেই বুঝা যায়।
কিন্তু মনির কাসেমীর এই তৈলাক্ত বক্তব্য তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা ভালোভাবে নেয়নি। তারা এই অতিরিক্ত তেলাবাজী পছন্দ করছেন না। সেই সাথে এই অতিরিক্ত তেলবাজীর ফলাফল ভালো হয় না। বরং এসকল বক্তব্য অতিভক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আলাপ আলোচনার শুরু থেকেই বিএনপির শরীক দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীও বিভিন্ন সভা সমাবেশের মধ্য সরব হতে থাকেন। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন এলাকায় একের পর এক সমাবেশ করে বেড়ান। আর প্রত্যেকটি সভা সমাবেশেই নিজেকে বিএনপি প্রেমিক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন।
কোনো কোনো বক্তব্যে নিজের দলের থেকে বিএনপিকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। যেন তিনি একজন বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা। কিন্তু তার এই অতিভক্তি বিএনপির নেতাকর্মীরা কখনই ভালোভাবে নেয়নি। একই সাথে আবার আওয়ামী লীগ নিয়েও মায়া দেখাতে থাকেন।
মনির কাসেমীর বিভিন্ন বেফাঁস মন্তব্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দলের যুগ্ম মহাসচিব মনির হোসাইন কাসেমীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) জারি করা হয়েছিলো। গত ৮ ডিসেম্বর সংগঠনটির মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী স্বাক্ষরিত এ নোটিশে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অমান্যের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে।
একই সাথে কেন মনির হোসাইন কাসেমীর বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না? এ ব্যাপারে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। নোটিশ প্রাপ্তির তারিখ হতে পরবর্তী ১০ দিনের মধ্যে দলের সভাপতি বরাবর জবাব দাখিল করতে হবে। আর এই সময়ের মধ্যে জবাব পাওয়া না গেলে কিংবা জবাবে দল সন্তুষ্ট না হলে পরবর্তীতে মনির হোসেন কাসেমীর বিরুদ্ধে যে কোন সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতে পারে। যদিও পরবর্তীতে এই নোটিশের কোনো পদক্ষেপ আলোচনায় আসেনি।
তার আগে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শুরু থেকে নারায়ণগঞ্জ-৪ সংসদীয় এলাকার বিএনপির নেতাকর্মীরাসহ প্রায় সকলেই নিশ্চিত ছিলেন এই আসনে ২০ দলীয় জোটের পক্ষে বিএনপির প্রার্থীকেই ধানের শীষের প্রতিক দেয়া হবে। কিন্তু চূড়ান্ত বাছাই পর্বে হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসেন জমিয়ত উলামার মনোনীত প্রার্থী মাওলানা মনির হোসাইন কাশেমী। সেই সাথে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে দিনভর নানা জল্পনার পর বিকেলে তার হাতে তুলে দেওয়া হয় ধানের শীষের মনোনয়ন পত্র।
অথচ তার বিরুদ্ধে ছিলো তৎকালিন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্যের সাথে আঁতাতের অভিযোগ। মূলত স্থানীয় ক্ষমতাসীনদের সমর্থনেই তার বেড়ে উঠা এবং একই সাথে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ারও ইচ্ছা পোষণ করেন। এমনকি বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরাসহ অনেকেই তাকে চিনতেনই না।
বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ ছিলো-বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোটের শরিক দল জমিয়তে উলামা হলেও জমিয়ত নেতা মনির হোসাইন কাসেমীকে কেউই চিনতো না। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শুরুতেও তার কোন আলাপ আলোচনাই ছিল না। সংসদীয় এলাকাতেও তার তেমন একটা পরিচিত নেই। অনেকের কাছেই তিনি অপরিচিত। তারপরেও তাকে ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়।
কিন্তু এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বিএনপি স্থানীয় পর্যায়ের দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে পরামর্শ না করেই মনির হোসাইন কাসেমীকেই ২০ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়। জোটের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতিক পাওয়ার পরেও জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীদের সাথে তিনি কোন যোগাযোগ করেনি। এর আগেও তিনি যোগাযোগ করেনি। ফলে ধানের শীষ প্রতিকের প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও মনির হোসাইন কাসের্মীকে প্রায় অনেকটাই বয়কট করেছিলেন নারায়ণগঞ্জ বিএনপির নেতাকর্মী।
এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও মনির হোসাইন কাসেমীকে বিএনপি দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিএনপি দলীয় মনোনয়ন পেলেও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা যেন সাড়া দিচ্ছেন না।

































আপনার মতামত লিখুন :