News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩

বর্ষা মানেই ফতুল্লাবাসীর দুর্ভোগ


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম বর্ষা মানেই ফতুল্লাবাসীর দুর্ভোগ

বৃষ্টির অনেকের কাছে যেমন স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি ফতুল্লার লালপুর, পৌষপুকুরপাড়, দাপা, মাসদাইর, পাগলা, কুতুবপুর ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের কাছে তা নতুন দুর্ভোগের পূর্বাভাস হয়ে দাঁড়ায়। টানা বা মাঝারি বৃষ্টিতেই সড়ক, অলিগলি ও বসতবাড়িতে পানি জমে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের কাছে নতুন নয়। বরং বছরের পর বছর ধরে একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হতে হতে জলাবদ্ধতা যেন এ জনপদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।

এবারও বন্যা হওয়ার আগেই স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে শুরু করেছে। গত কয়েক দিনের থেমে থেমে বৃষ্টির পর অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সামনে যদি টানা বর্ষণ হয় তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বাসিন্দাদের ভাষ্য, সামান্য বৃষ্টিতেই যখন ড্রেন উপচে পানি রাস্তায় চলে আসে, তখন ভারী বর্ষণে কী হবে সেই প্রশ্নই এখন তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।

দীর্ঘদিন ধরেই ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকায় অপরিকল্পিত নগরায়ন, সংকীর্ণ ও অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল-নালা ভরাট এবং পানি নিষ্কাশনের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কোথাও কোথাও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে সড়ক আর ড্রেনের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। হাঁটুপানি মাড়িয়ে মানুষকে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বাজারে যেতে হয়। অনেক এলাকায় ঘরের ভেতর পর্যন্ত পানি ঢুকে পড়ে। ফলে আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে যায়।

ফতুল্লার লালপুর ও পৌষপুকুরপাড় এলাকায় ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষা এলেই তাদের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বদলে যায়। শিশুদের স্কুলে যাওয়া অনিয়মিত হয়ে পড়ে। অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ঘর থেকেই বের হতে দেন না। বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। জরুরি প্রয়োজনে রিকশা বা অন্য যানবাহন পাওয়া যায় না। ফলে সামান্য বৃষ্টি অনেক পরিবারের জন্য বড় ধরনের দুর্ভোগ ডেকে আনে।

শুধু চলাচল নয়, জলাবদ্ধতার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে নোংরা পানি জমে থাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। মশার উপদ্রব বৃদ্ধি পায়, যা ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত নানা রোগের আশঙ্কাও তৈরি হয়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও জলাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত ক্ষতির মুখে পড়েন। নিচু এলাকায় অবস্থিত দোকানগুলোতে পানি ঢুকে মালামাল নষ্ট হয়। ক্রেতা কমে যাওয়ায় ব্যবসায় মন্দা দেখা দেয়। অনেক দোকানদারকে বৃষ্টির দিনে দোকানই বন্ধ রাখতে হয়। শ্রমজীবী মানুষ, দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয় কমে যায়। ফলে জলাবদ্ধতা শুধু একটি অবকাঠামোগত সমস্যা নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানো হলেও স্থায়ী সমাধান মেলেনি। বর্ষা মৌসুম এলেই কোথাও কোথাও ড্রেন পরিষ্কার, ময়লা অপসারণ কিংবা অস্থায়ীভাবে পানি সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এসব উদ্যোগ কয়েক দিনের বেশি কার্যকর থাকে না। মূল সমস্যাগুলো রয়ে যাওয়ায় প্রতি বছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটে।

বিশ্লেষকদের মতে, ফতুল্লার জলাবদ্ধতার পেছনে শুধু অতিবৃষ্টি দায়ী নয়। বরং অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাধার ও খাল দখল, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ পরিকল্পনার অভাব, অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। অনেক স্থানে ড্রেন নির্মাণ করা হলেও তা যথাযথভাবে মূল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত নয়। আবার কোথাও ড্রেন থাকলেও আবর্জনায় ভরে থাকায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়।

এছাড়া দ্রুত নগরায়নের ফলে নতুন নতুন আবাসিক ভবন ও স্থাপনা গড়ে উঠলেও সেই অনুপাতে ড্রেনেজ অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরতে পারে না। একসময় যে খাল ও নিচু জায়গাগুলো প্রাকৃতিকভাবে পানি ধারণ করত, সেগুলোর অনেকই এখন দখল বা ভরাট হয়ে গেছে। এতে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়েছে।

পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এ সমস্যার সমাধানে খ-িত উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। প্রথমেই এলাকার খাল, নালা ও পানি প্রবাহের প্রাকৃতিক পথ পুনরুদ্ধার করতে হবে। এরপর আধুনিক ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে তা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমের আগে ড্রেন ও কালভার্ট পরিষ্কার করা, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় স্থানে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্পিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, শুধু সরকারি সংস্থার ওপর নির্ভর করলেই হবে না। সাধারণ মানুষের সচেতনতাও জরুরি। অনেক সময় অসচেতনভাবে ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। তাই স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগÍদুই ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

এদিকে এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিনকে ঘিরেও স্থানীয়দের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন অনেকেই। তাদের আশা, অতীতের মতো শুধু আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ ও দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ জনদুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা হবে।

ফতুল্লাবাসীর দাবি, প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগ আর দেখতে চান না তারা। নিরাপদ সড়ক, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং জলাবদ্ধতামুক্ত একটি জনপদই এখন তাদের প্রধান প্রত্যাশা। কারণ বর্ষা প্রকৃতির আশীর্বাদ হলেও, অব্যবস্থাপনার কারণে তা যেন তাদের জীবনে অভিশাপে পরিণত না হয়। এখন সময় বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগের। অন্যথায় প্রতি বছরের মতো এবারও সামান্য বৃষ্টিতেই ফতুল্লার জনজীবন স্থবির হয়ে পড়বে, আর মানুষের দীর্ঘশ্বাস আরও দীর্ঘ হবে।