নারায়ণগঞ্জের বক্তাবলী সদর উপজেলার মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন। দ্বীপ অঞ্চল হিসেবে এই অঞ্চলের যাতায়াত ব্যবস্থা বেশ দুর্গম। এই ইউনিয়নের প্রধান অর্থনীতি কৃষি ও ইটভাটা। বিগত সময় দেশের দক্ষিন অঞ্চল থেকে মাটি আমদানি করে ইটভাটায় ইট প্রস্তুত করা হলেও এখন খোদ বক্তাবলীর মাটি কেটেই পোড়ানো হচ্ছে ইটভাটায়। যার ফলে ধ্বসে পড়ছে তীরবর্তী জমি।
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ও প্রভাবশালীদের লোভের সামনে অসহায় ভূমিকার মালিকেরা প্রতিনিয়ত নিজেদের পৈত্রিক সম্পদ হারাচ্ছেন একটু একটু করে। এই অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে বাসিন্দারা বার বার দ্বারস্থ হয়েছেন পুলিশ, প্রশাসন এবং এমপির কাছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বেপরোয়া লোভের শিকার হয়ে সব হারাচ্ছেন বাসিন্দারা।
চলতি বছরের ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ধলেশ্বরী নদীর দুই পাশে অবৈধ ইটভাটা এবং অবৈধ মাটিকাটা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রী বরাবর নোটিশ প্রদান করেন সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন। এরপর জেলা প্রশাসনের মাসিক বৈঠকেও এই বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। কিন্তু কোনভাবেই থামানো যায়নি এই অঞ্চলের মাটিকাঁটা। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় বিএনপি নেতাদের শেল্টারেই চলছে অবৈধ এই কার্যক্রম।
বুধবার সরেজমিনে বক্তাবলী ঘুরে পাওয়া যায় মাটি উত্তোলনের সত্যতা। সেই সাথে মাটি উত্তোলন নিয়ে এলাকার মানুষের ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। নিজেদের ভিটেমাটি রক্ষায় যেকোন মুহূর্তে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরী হতে পারে বক্তাবলী এলাকায়। তবে গত মঙ্গলবার স্থানীয় সংসদ সদস্যের আগমন, প্রতিবাদ মিছিল এবং নৌ পুলিশের কর্মকর্তাদের ধমক দিয়ে এই মাটিকাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। যেই কারণে বুধবার মাটি কাটার গ্রাব মেশিন ধলেশ্বরী নদীতে চলতে দেখা যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সন্ধার পর থেকে শুরু হয় মাটি কাটা। যা চলে ভোর পর্যন্ত। এরপর সেই গ্রাব মেশিন রাখা হয় সিপাইপাড়া খালে। ঘটনাস্থলে গিয়েও এর সত্যতা মিলেছে। খালে নোঙর করে রাখা হয়েছে মেশিনগুলো। যা মূল নদী থেকে বোঝার উপায় থাকে না।
বাসিন্দারা বলছেন, ব্যবসায়ীরা এই মেশিনগুলো পরিচালনা করে। আর বক্তাবলী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নজরুল প্রধান, সাংগঠনিক সম্পাদক হালিম আজাদ সহ আরও কয়েকজন সরাসরি এসবের শেল্টার দেয়। বিনিময়ে মোটা অংকের কমিশন পেয়ে থাকেন তারা। ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহীদুল ইসলাম টিটুর অনুসারী হওয়ায় কেউ তাদের কিছু বলতে পারে না। থানা পুলিশও নীরব এদের সামনে।
মাটি ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মাটি কেটে তা সরবরাহ করা হয় ইটভাটায়। মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হয় ট্রলার। প্রতি ট্রলার মাটি ৩ হাজার টাকা। দৈনিক দেড়শ থেকে দুইশ ট্রলার মাটি বিক্রি হয়। অর্থ্যাৎ দৈনিক সাড়ে ৪ লাখ টাকার মাটি বিক্রি হচ্ছে। মাসে এর পরিমান দাঁড়ায় ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা কিংবা আরও বেশী। অভিযোগ আছে অবৈধ মাটি উত্তোলনের এই ব্যবসায় মাসোয়ারা পেয়ে থাকেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ এমনকি পরিবেশ অধিদপ্তরের কেউ কেউ। যেই কারনে ভুক্তভোগীরা নানান স্থানে দৌড়েও সমাধান পান না।
কেবল মাটি কাটা সিন্ডিকেটের সাথে যুক্ত হয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হতে চলেছেন বক্তাবলী ইউনিয়ন বিএনপির কয়েকজন নেতা। এদের মধ্যে আলোচিত হয়েছেন হালিম আজাদ। ৫ আগস্টের পর বক্তাবলীর মধ্যপাড়ায় নিজের বাড়ি সংস্কার করে আলিশান বানিয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি ক্ষমতায় এলে শুরু করেছেন দোতালা ভবন নির্মানের কাজ। পুরো মধ্যপাড়া এলাকায় তার বিষয়ে কেউ কিছু বলার সাহস পান না। স্থানীয় বাসিন্দারা ভয়ে ভয়ে তার বাড়ি চিনিয়ে দিলেও অনুরোধ করেন, তাদের নাম যেন প্রকাশ না করা হয়।
মাটি কাটার প্রতিবাদ জানানো এনসিপি নেতা তাওহীদুল ইসলামকে মারধর ও রক্তাক্ত করার প্রধান অভিযুক্ত হালিম আজাদের বিরুদ্ধে আরও অনেক অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে, এলাকায় কেউ জমি ক্রয় বিক্রয় করতে এলেই সেখানে চাঁদা দাবী করেন। কোন জমিতে ত্রুটি থাকলেই সেই জমির মালিককে চাপ দিয়ে কমমূল্যে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করেন।
এছাড়া অবৈধভাবে ইটভাটা দখল করে ভাটা মালিক হওয়া, জমি দখলের জন্য গুলি করার হুমকি প্রদান, এলাকায় কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, মধ্যনগরে জমি দখলের জন্য প্রতিপক্ষের উপর গুলিবর্ষণ, বক্তাবলীতে একটি ফার্মেসির উপর হামলা ও ভাঙচুর, ইটভাটা সহ নানান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদা দাবী এবং না দিলে গুলি করার হুমকি দেন বলে অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
এতসব অভিযোগ থাকলেও কেবল ক্ষমতাসীন দলের নেতা হওয়ায় কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি তার বিরুদ্ধে। এমনকি জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা তার বিষয়ে অবগত থাকলেও এসব কর্মকা-ের পরেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। হালিমের কারনে বক্তাবলীতে বিএনপির দলীয় ইমেজ ক্ষুণ হলেও তাকে থামানোর যেন কেউ নেই।



































আপনার মতামত লিখুন :