আড়াইহাজার উপজেলায় মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে শুরু হয়েছে এক নতুন অধ্যায়। দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার বিভিন্ন স্কুলে “প্রশ্নপত্র সিন্ডিকেট” চালু ছিল। ওই সিন্ডিকেট থেকে প্রশ্ন কিনে এনে পরীক্ষা নেওয়া হতো। এতে শিক্ষার মান প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অনীহা তৈরি হয়। কিন্তু এবার সেই প্রথা ভেঙে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শুরু হয়েছে এক ও অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার প্রক্রিয়া।
মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, মাধ্যমিক বিভাগে উপজেলা পর্যায়ে ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষা এবং ১০ম শ্রেণির প্রাক-নির্বাচনী ও নির্বাচনী পরীক্ষায় এক ও অভিন্ন প্রশ্নপত্রে আড়াইহাজারে পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এর আওতায় উপজেলায় ৩৪টি জেনারেল স্কুল ও ৪টি ভোকেশনাল (কারিগরি) স্কুল অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এই প্রক্রিয়া শুরু করার কারণ হিসেবে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপরভাইজার মো: শাহজাহান বলেন, দীর্ঘদিন গাইড বইমুখীতা থাকার কারণে সব স্কুলে পাঠ্যবই মুখী পড়াশোনার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট গাইড বই পাঠ্য করে উক্ত বই নির্ভর পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছিল, যা শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিক্ষা অর্জনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। অনেক স্কুলে নবম-দশম শ্রেণির মানসম্মত প্রশ্ন প্রণয়ন করার মতো যোগ্য শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন স্কুল প্রশ্ন কিনে এনে পরীক্ষা নিচ্ছিল যা মূলত কোনো না কোনো গাইড বইকে ভিত্তি করে করা হতো। এ ছাড়া কোচিং নির্ভর হয়ে যাচ্ছিল শিক্ষা কার্যক্রম, কারণ ওই স্কুলের বিষয়ভিত্তিক নির্দিষ্ট শিক্ষকের একচ্ছত্র ক্ষমতা ছিল প্রশ্ন করার। এ অবস্থায় একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সদস্য সচিব উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং উপজেলায় সব প্রধান শিক্ষককে সদস্য করা হয়েছে। প্রতিটি স্কুল থেকে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকরা প্রশ্ন প্রণয়ন করে জমা দেবেন কমিটির কাছে। পরে কমিটির সভাপতি ইউএনও সব প্রশ্ন যাচাই-বাছাই করে মানসম্মত ও গ্রহণযোগ্য প্রশ্ন নির্বাচন করবেন। এতে এককভাবে কোনো শিক্ষক বা কোনো স্কুল প্রশ্নপত্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।
এই নতুন পরীক্ষাপদ্ধতি চালু হলে প্রতিটি পরীক্ষা ইউএনওর নেতৃত্বে বিভিন্ন স্কুলের দক্ষ সিনিয়র শিক্ষকদের মাধ্যমে একটি কমিটি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। সকল স্কুলেই অভিন্ন সিলেবাস ও পাঠ্যক্রম থাকবে। পাঠদান থেকে শুরু করে শ্রেণি কার্যক্রম একটি মানসম্মত রুটিনে পরিচালিত হবে, যা শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। কোনো একটি গাইড বইকে একেক স্কুলে পাঠ্য করার প্রবণতা বন্ধ হবে। শ্রেণীতে পাঠদান মনিটরিং বাড়লে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের মানোন্নয়ন ঘটবে। ব্যক্তিগত কোচিং না করলে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের শিক্ষক এর বিরাগভাজন হয়ে পরীক্ষায় ফেল করানোর মতো অনিয়মও
বন্ধ হবে। সব শিক্ষক নিজেরা প্রশ্ন প্রণয়ন কার্যক্রমে অংশী হলে তাদের নিজস্ব দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষার্থীরা মূল বইমুখী এবং ক্লাসমুখী হবে। দক্ষ শিক্ষকদের সমন্বয়ে একটি মানসম্মত পরীক্ষা পদ্ধতির সাথে শিক্ষার্থীরা অভ্যস্ত হবে। উপজেলায় প্রতি পরীক্ষা শেষে প্রতি স্কুল ভিত্তিক সেরা শিক্ষার্থী ও সেরা শিক্ষক নির্বাচন করে তাদের পুরস্কৃত করা হবে। শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানোন্নয়ন অব্যাহত রাখা হবে।
আড়াইহাজারের অভিভাবকেরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। স্থানীয় এক অভিভাবক বলেন, “এখন থেকে সন্তানদের গাইড বই কিনে দিলেই হবে না। তাদের আসল বই পড়তে হবে। এতে প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে।”
আরেকজন বলেন, “আগে বিভিন্ন স্কুলে আলাদা প্রশ্ন হতো। কোথাও সহজ, কোথাও কঠিন। ফলে ভালো-মন্দ স্কুলের পার্থক্য থাকত। কিন্তু অভিন্ন প্রশ্ন হলে সবাই সমানভাবে পরীক্ষা দেবে। এতে প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাজ্জাত হোসেন বলেন, “শিক্ষাকে কোনো সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি রাখা যাবে না। শিক্ষার্থীরা মুখস্থ নির্ভর না হয়ে পড়াশোনায় মনোযোগী হোক, আমরা সেটা চাই। এ কারণে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট কোনো গাইড বা কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে পারবে না। তারা মূল পাঠ্যবই পড়তে বাধ্য হবে। আমরা বিশ্বাস করি, এ উদ্যোগে শিক্ষার মান অনেক উন্নত হবে।”
অনেক শিক্ষার্থীও এ পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। তারা বলছে, আগে যেখানে গাইড পড়লেই পাস করা যেত, এখন সঠিকভাবে পাঠ্যবই না পড়লে পরীক্ষায় ভালো করা সম্ভব হবে না। এতে করে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ বাড়বে।
আপনার মতামত লিখুন :