সাবেক কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের শ্যালক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শফিকুল ইসলাম শফিক। দুলাভাইয়ের মতো নিজেও কাউন্সিলর হবার স্বপ্নে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের উপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে আলোচনায় থাকলেও সময়ের ব্যবধানে আজ সে পলাতক রয়েছেন। নিজ অপকর্মে খোদ তিন সন্তানরাই ছিল তার বড় ধরনের হাতিয়ার। আওয়ামী রাজনীতিতে যুক্ত থেকে (নাসিক) ২নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের অতিষ্ঠ করে তুলেছিল এই সন্ত্রাসী। বর্তমানে দুই ডজনেরও বেশি মামলার আসামি হয়ে আত্মগোপনে আছেন। তবে খবর রয়েছে তার বর্তমান অবস্থান বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা সংলগ্নে।
শফিকুল ইসলামের পিতার নাম শহিদ চেয়ারম্যান হলেও তার বড় পরিচয় হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ন্যাক্কারজনক সাত খুনের শিকার প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম সম্পর্কে তার দুলাভাই হন। ২০১৪ সালে নরপিশাচ নূর হোসেনের নির্মম টার্গেটে নজরুলসহ সাতজন হত্যার শিকার হতেই শফিকের কপাল খুলে যায়। দুলাভাইয়ের হত্যাকে পুঁজির মাধ্যমে মানুষকে মামলায় জড়ানোর ভয়ভীতি প্রদর্শন করে দু'হাতে লুটপাট করে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। তবে কাউন্সিলর হবার স্বপ্ন পূরণ হয়নি শফিকের। এদিকে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ছেলে জ্যোতির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকায় সিদ্ধিরগঞ্জে ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের মাধ্যমে সন্ত্রাসী উপাধি পান তিনি ও তার তিন পুত্রসন্তানর।
বোন জামাইয়ের মৃত্যুর পর ২০১৬ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শফিকের বোন অথাৎ নজরুল ইসলামের স্ত্রী বিউটি আক্তার ২নম্বর ওয়ার্ডে ভোটের লড়াইয়ে নেমে বিএনপি নেতা ইকবাল হোসেনের সঙ্গে পরাজিত হয়। এরপরই শফিক নিজেই কাউন্সিলর হবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। টার্গেট নেন ইকবালকে পরাজিত করার। ২০১১ সালের সিটি নির্বাচন হতে শফিকের রাজনৈতিক আদর্শ ছিল সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী। যা ২০১৪ সালে সাত খুন হবার পর আরও পোক্ত বনে যান। কারণটা ছিল সাতখুনের জন্যে শফিকের পরিবার সাবেক সাংসদ একেএম শামীম ওসমানকে দায়ী করেছিল। তাদের ভাষ্য ছিল ওসমানই হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী। তবে যদিও আইভীর রাজনীতি করেও ২০২২ এর নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে কাউন্সিলর হতে ব্যর্থ হন তিনি। ওই নির্বাচনে ভোটের লড়াইয়ে ইকবাল ফের জয়ী হন এবং শফিকের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়তে। কাউন্সিলর নির্বাচনে পরাজিত হয়েই নেতা পরিবর্তনের সীদ্ধান্ত নেন শফিক। এরপর সবশেষ ২৩ সালের ১৫ আগস্ট শামীম ওসমানের বিশ্বস্ত মাহবুবের (ফটকা মাহবুব) মাধ্যমে ওসমানের দারস্থ হয়ে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান। এক্ষেত্রে শামীম ওসমানের শর্ত মোতাবেক প্রস্তাব ছিল ইকবালকে এলাকা ছাড়া করতে পারলেই আগামীর কাউন্সিলর বানাবেন শফিকে। এই অফারটা লুফে নিয়ে ওয়ার্ডবাসীকে অশান্ত করে তোলেন সন্ত্রাসী শফি বাহিনী। তার নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়েছেন ওই ওয়ার্ডের সাধারণ ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং সাবেক কাউন্সিলর বিএনপি নেতা ইকবাল হোসেন।
পটপরিবর্তনের আগে দেখা মিলেছে শামীম ওসমানের নির্দেশনায় ২নম্বর ওয়ার্ড হতে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর নাম মুছে ফেলার মিশনে নেমে বিরোধী নেতাদের বাড়িঘরে হামলা, মামলা, লুটপাটের মাধ্যমে তান্ডব চালাতেন শফিকের সন্ত্রাসী বাহিনী। তার সকল অপকর্মের হর্তাকর্তার দায়িত্ব পালন করতে শফিকের বড় ছেলে কিশোর গ্যাং টেনশন গ্রুপের লিডার রাইসুল ইসলাম সীমান্ত, মেঝো ছেলে তাওসিন ইসলাম সীমন এবং সাকিবুল ইসলাম শারিফ। তিন ছেলের মাধ্যমে আলাদা আলাদা তিনটা কিশোর গ্যাং গ্রুপ তৈরি করে রাজত্ব করে আলোচনায় এসেছেন। ওসমান ঘনিষ্ঠতা পেয়েই সিদ্ধিরগঞ্জ থানা সেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি পদপ্রার্থী হিসেবে মাঠে নামেন শফিক। যদিও কমিটি গঠনের আগেই স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের পতন ঘটে যায়।
২০২৪ এর জুলাই মাসে ছাত্র-জনতা যখন যৌক্তিক আন্দোলনে সড়ক নামে তখন শামীম ওসমানের নির্দেশনায় শফিক দফায় দফায় আন্দোলনকারীদের উপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণসহ অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঝাপিয়ে পড়েন। শেষে গণঅভ্যুত্থান ঘটলে আত্মগোপনে চলে যান। এরপর তার বিরুদ্ধে একের পর এক বৈষম্যবিরোধী মামলা রুজু হয়। বর্তমানে বিভিন্ন থানা মিলে অন্তত দুই ডজন মামলার আসামি হিসেবে ফেরারি তিনি। এদিকে শফিক এলাকা ছাড়া হলেও তার মেঝো এবং ছোট ছেলের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। চাওর আছে বড় ছেলে সীমান্তও প্রায় সময় পরিদর্শন করে যান।
সুত্রমতে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের পতনের পর গ্রেফতার আতঙ্ক পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজ এলাকা ছেড়ে বসুন্ধরা এলাকায় বসবাস শুরু করেন শফিক। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার অপর পাশে পানি ভবন নামক বিল্ডিং সংলগ্নে তিনি ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন। এর পাশাপাশি ৩০০ ফিট এলাকাতেও একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সুযোগ সুবিধা মতো দুইখানেই তার বসবাস।
আলোচিত শফিকুল ইসলাম শফিকের আমলনামা বহু পুরানো বলে জানা গেছে, ২০০৩ সালে এই সন্ত্রাসী যাত্রাবাড়ী থানায় অস্ত্র মামলা এবং ধানমন্ডি থানায় একটি হত্যা মামলার আসামি হন। এছাড়াও ২০০৩ এর হতে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্যে তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের হয়েছিল। যদিও আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসতেই মামলাগুলো স্টে অর্ডারে আটকে গিয়েছিল।








































আপনার মতামত লিখুন :