উপেক্ষা আর বঞ্চনা শব্দযুগলের সাথে নারায়ণগঞ্জের নাম যেন এক সুতোয় গাঁথা। সুদীর্ঘকাল যাবত জাতীয় অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ অবদান রেখে চলা জনপদটিতে বঞ্চনা আর উপেক্ষার শুরু স্বাধীনতাত্তোর কাল থেকে। দেশ যখন উন্নয়নের পথে যাত্রা শুরু করলো, অখ্যাত অঞ্চলসম‚হে তার ছোঁয়া লাগলেও নারায়ণগঞ্জের ক্ষেত্রে তার বিপরীত চিত্র দেখা গেল। শিল্প বাণিজ্যে ধারাবাহিক উন্নয়নের পাশাপাশি নাগরিক সুবিধার অবনমন বাড়তে বাড়তে আজ শূণ্যের কোঠায় দাঁড়িয়েছে। জাতীয় উন্নয়ন অবকাঠামোর অনেক স্থাপনা নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রিক বা ছুঁয়ে যাওয়া হলেও তাতে নারায়ণগঞ্জবাসীর আহামরি কোন সুবিধা হয়নি। দেশের সবচেয়ে জনবহুল,শিল্পঘন অঞ্চলটিতে বসবাসরত নাগরিকদের প্রয়োজনে তেমন কোন উন্নয়ন হয়নি বললেই চলে।
কোন এক অজ্ঞাত কারণে সব সরকারের আমলেই উন্নয়ন বঞ্চিত থেকে গেছে নারায়ণগঞ্জ। বি শ্রেণীভুক্ত জেলা হিসেবে কম বরাদ্দের কারণে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড আটকে থাকে। ভোগান্তি হয় সাধারণ মানুষের, অথচ কম রাজস্ব প্রদানকারী গাজীপুর বিশেষ শ্রেণীভুক্ত জেলা হিসেবে অধিক বরাদ্দ পেয়ে থাকে।
প্রাচীনকাল থেকে অদ্যাবধি জাতীয় পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জের যে অবদান তাতে কোন যুক্তিতে নারায়ণগঞ্জকে কম বরাদ্দ পাওয়া বি শ্রেণীভুক্ত করা হয়? শুধু বি শ্রেণীভুক্ত করেই নয় আরও অনেক ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জকে।
কেন এমন বৈষম্য? বৈষম্য নিরসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত মহল কেন কখনও কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি? এসব প্রশ্নের জবাব কে দিবে? অনেকেই আক্ষেপ করে বলেন নারায়ণগঞ্জ শুধু দিয়েই গেল প্রাপ্তির খাতায় শূন্য!
বাংলার প্রাচীন রাজধানী সোনারগাঁও নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত। বিশ্বখ্যাত মসলিন ও জামদানি শিল্পের উদ্ভব নারায়ণগঞ্জে। ব্রিটিশ আমল থেকে ৮০র দশক পর্যন্ত সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়ের উৎস পাট শিল্পের প্রধান কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জকে ফ্রি-পোর্ট ঘোষণা করা হয় ১৮৮০ সালে। নদীপথে নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর এবং কলকাতা পর্যন্ত পণ্য ও যাত্রীবাহী যান চলাচলের প্রধান বন্দর ছিল নারায়ণগঞ্জ। ৬৫ মাইল দীর্ঘ শীতলক্ষ্যা নদী ইংল্যান্ডের টেমস নদীর পর বিশ্বের দ্বিতীয় পোতাশ্রয় বেষ্টিত নদী।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে প্রথম ডাক ব্যবস্থা চালু হয় ১৮৬৬ সালে, ১৮৭৬ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার যাত্রা শুরু, বঙ্গ প্রদেশে যা একটি মডেল পৌরসভা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৮৭৭ সালে চালু হয় টেলিফোন এক্সচেঞ্জ। ১৮৮৫ সালে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-ময়মনসিংহ রেল সার্ভিস চালু হয় পরবর্তীতে যা সারা পূর্ববঙ্গে সম্প্রসারিত হয়। কলকাতা থেকে বাণিজ্যিক বা যাত্রীবাহী জাহাজ সম‚হ নারায়ণগঞ্জে ভিঁড়তো, এখান থেকে সড়ক, নৌ, রেলপথে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছে যেত যাত্রী এবং পণ্য সামগ্রী। চিটাগাং ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির সহায়তায় ১৯৩১ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা বিদ্যুতায়িত হয়। সেই নারায়ণগঞ্জ এখন দেশে সর্বোচ্চ পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে থাকে। রাজধানী হিসেবে ঢাকা প্রতিষ্ঠিত হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শিল্প বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে নারায়ণগঞ্জ ঢাকার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে থেকে যায়। এমন সমৃদ্ধ অতীত এবং বর্তমান আর কোন জেলার নেই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জবাসী সর্বোচ্চ নাগরিক সেবা প্রাপ্তির দাবিদার হলেও সর্বনিম্ন সেবাও পাচ্ছেনা, বরং পরিষেবামূলক বেশকিছু অবকাঠামো বিলুপ্ত, কিছু নিস্ক্রিয় হয়ে গেছে। অপরিকল্পিত শিল্পায়নের কারণে পরিবেশ দূষণ সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছেছে। বিভিন্ন কারণে বসবাসের প্রায় অযোগ্য হয়ে পড়া নারায়ণগঞ্জের অধিবাসীগণ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে, তাদের কাছে অর্থহীন মনে হচ্ছে এমন গৌরবময় ঐতিহ্য। জাতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিশেষ ভূমিকা পালন করলেও জেলা থেকে বের হওয়া বা জেলাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে জেলাটি। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। অপর্যাপ্ত সড়ক এবং ট্রাফিক অব্যাবস্থাপনার জন্য সার্বক্ষনিক যানজটের শহরে পা রাখাই দায়। ঢাকা অঞ্চল থেকে ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি ট্রেনের উৎস স্টেশন ছিল নারায়ণগঞ্জ। কমলাপুর স্টেশন চালু হওয়ার পরও দীর্ঘদিন এ ব্যবস্থা চালু ছিল, ফলে নারায়ণগঞ্জের যাত্রীগণ ভোগ করতো সহজ যোগাযোগ সুবিধা। কমলাপুরের যাত্রীরাও কোন অসুবিধার সম্মুখীন হতো না। নারায়ণগঞ্জ থেকে দ‚রপাল্লার সব ট্রেন বন্ধ করে দেয়া হলো যৌক্তিক কোন কারণ ছাড়াই। বিশাল আয়তনের স্টেশনটি জাতির কোন কাজে আসছে না, অথচ উৎস স্টেশন হিসেবে নারায়ণগঞ্জকে বহাল রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন করলে ঢাকার উপর চাপ কমতো, পাশাপাশি উপকৃত হতো নারায়ণগঞ্জবাসী। দীর্ঘদিন যাবত ঢাকা নারায়ণগঞ্জ রেলপথ ডাবল করার কথা কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ, দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি নেই। দেশের প্রধান নদী বন্দর হিসেবে নারায়ণগঞ্জ এখনও টিকে রয়েছে শুধুমাত্র পণ্য পরিবহনের জন্য। যাত্রীবাহী নৌযানের ঠিকানা হয়েছে সদরঘাট যার যৌক্তিক কারণ আজও খুঁজে পাওয়া যায় না।
সদরঘাট থেকে নৌযান সমূহ মুন্সিগঞ্জ মোহনায় পৌঁছুতে যে সময় নেয় তার সিকিভাগও লাগেনা নারায়ণগঞ্জ থেকে, তাহলে কোন যুক্তিতে, কাদের স্বার্থে নারায়ণগঞ্জ নৌবন্দরের বুক খালি করে সেই অবস্থান সদরঘাটে করা হলো? এখনও সময় আছে বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম পোতাশ্রয় বেষ্টিত শীতলক্ষ্যার সুবিধা কাজে লাগিয়ে যাত্রীবাহী নৌযান সমূহের উৎসস্থল নারায়ণগঞ্জে ফিরিয়ে আনার।
উল্লেখিত দুটি বিষয় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় নারায়ণগঞ্জ নতুন করে কিছু তো পায়ইনি উপরন্তু দীর্ঘ সময় চালু থাকা অবকাঠামোগুলো পর্যায়ক্রমে ধংস করা হয়েছে। ব্রিটিশ সরকার ঢাকার সাথে দেশের বিভিন্ন স্থানের যাতায়াত সহজ করার লক্ষ্যেই নারায়ণগঞ্জে এ দুটি স্থাপনা গড়ে তুলে ছিল, যা কখনো অকার্যকর প্রমানিত হয়নি। এমন সমৃদ্ধ অতীত, বর্তমান এবং সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ থাকা সত্তে¡ও জেলাটির প্রতি এমন বৈষম্যম‚লক আচরণ কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়।
নারায়ণগঞ্জের যেসব অবকাঠামো সম্ভাবনা থাকা সত্তেও অকেজো করে রাখা হয়েছে, প্রয়োজনীয় সংষ্কার সাধন করে সেগুলো কার্যকর করার পাশাপাশি অন্যান্য উন্নয়ন কাজ জরুরি ভিত্তিতে সম্পন্ন করা সময়ের দাবি। বিশেষ শ্রেণীভুক্ত জেলায় রূপান্তর সহ প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন হলে শুধু নারায়ণগঞ্জ নয় লাভবান হবে সমগ্র জাতি।
দলমত নির্বিশেষে নারায়ণগঞ্জবাসীর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা আর সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের দায়িত্বশীল ভ‚মিকা পালনের মাধ্যমে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জিত হোক এমনটিই প্রত্যাশা।
লেখক : বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানী ও পোশাক শিল্পের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।
আপনার মতামত লিখুন :