News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা শনিবার, ০৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

রাশিয়ায় পাচার ৩০ যুবকের আদনান না.গঞ্জে ফিরলেও বাকীদের হদিস নেই


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: অক্টোবর ২, ২০২৬, ০৮:১৬ পিএম রাশিয়ায় পাচার ৩০ যুবকের আদনান না.গঞ্জে ফিরলেও বাকীদের হদিস নেই

পরিবারের হাল ধরতে বৈধ পথেই রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের যুবক আদনানসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ৩০ জন যুবক। তবে অবৈধ সিন্ডিকেটের জাল নথির প্রতারণার ফাঁদ তাদেরকে ঠেলে দিয়েছিল যুদ্ধের ময়দানে। ড্রোন হামলায় আহত হয়ে বেঁচে ফেরা নারায়ণগঞ্জের আদনান ও ঝিনাইদহের রাজন দেশে ফিরতে পারলেও বাকী ২৮ জনের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা এখনো অজানা। সরকার অভিযুক্ত ৩ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করলেও ঋনের বোঝা মাথায় নিয়ে অনিশ্চয়তায় প্রতারণার শিকার পরিবারগুলো।

জানা গেছে, দেশে চাকরিপ্রত্যাশীদের তুলনায় বাজার অনেক ছোট। বিদেশে উচ্চমজুরি, নিরাপদ জীবন, নাগরিক সুবিধাসহ নানা প্রলোভনে শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ থেকেও প্রতি বছর বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন অনেক বেকার যুবক। তবে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রত্যাশী বাংলাদেশিরা প্রায়ই অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী ও অবৈধ সিন্ডিকেটের প্রতারণার শিকার হন। দেশে ও বিদেশে অবৈধ সিন্ডিকেট জাল নথি ব্যবহার করে প্রতারণার ফাঁদ পাতছে। এই চক্রগুলোর প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে সমুদ্রপথে অবৈধ অভিবাসনে গিয়ে প্রায়শই প্রাণ হারাতে হচ্ছে যুবকদের।

বৈধ পথে বিএমইটির রেজিষ্ট্রেশনসহ সংশ্লিষ্ট কোম্পানীর কাগজপত্র যাচাই বাছাই করেও প্রতারণার ফাঁদ থেকে বাঁচতে পারেনি নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী এলাকার ৩ যুবক আদনান হোসেন, রবিন মিয়া, কাজী রেজাউল করিমসহ দেশের ৩০ জন যুবক। তাদের মধ্যে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় আহত নারায়ণগঞ্জের যুবক আদনান ও ঝিনাইদহের রাজন পালিয়ে দেশে ফিরলেও বাকীদের হদিস এখনো মেলেনি। সরকার ৩ রিক্রুটিং এজেন্সি আর এস ইন্টারন্যাশনাল, জাবাল-ই-নূর ও টিএস ওভারসিস লিমিটেড এর লাইসেন্স প্রত্যাহার এবং জামানত বাজেয়াপ্ত করলেও প্রতারণার শিকার ৩০ যুবকের পরিবারের মাথায় ঋণের বোঝা।

বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রত্যাশীরা বলছেন, তারা বৈধপথে বিদেশে যাওয়ার জন্য বিএমইটির রেজিষ্ট্রেশনসহ নানা বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়েছেন। রিক্রুটিং এজেন্সীকে অর্থ লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করেছেন। কেউ যাতে দালালদের খপ্পড়ে পড়ে অবৈধপথে সাগরপথে পাড়ি না দেন। এতে তাদের যেমন জীবনের ঝুঁকি রয়েছে তেমনি পরিবারও বিপদগ্রস্ত হয়।

এদিকে গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার মস্কোর একটি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে দেশে ফিরলেও মাথায় ঋনের বোঝার একরাশ দু:শ্চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী এলাকার বাসিন্দা যুবক আদনান হোসেনের। তিনি বলেন, সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় আদনান বেঁচে মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়। সেখানে তার একাধিক অপারেশনও হয়। সেখানে থাকতে শুনেছেন তার সঙ্গে যাওয়ায় ১৯ জন মারা গেছেন। কিছুটা সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে দূতাবাসের সহযোগিতায় নিজ অর্থে টিকেট কেটে দেশে ফিরে আসেন আদনান।

আদনান আরো বলেন, আমরা বিএমইটির প্রশিক্ষণ ও সনদ (বিএমআইটি নাম্বার এনওয়াইএম২০২৬৬০১২৯০৯জি) নিয়ে সরকারের বিধিবিধান মেনে সবকিছু খোঁজ খবর নিয়েই রাশিয়ায় কাজের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলাম। আমরা তো যুদ্ধ করতে যাইনি। সরকার রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্ত করলেও আমরা ৩০টি পরিবারই ক্ষতিগ্রস্ত। আমার ও পরিবারের মাথার উপর ঋনের বোঝা। আমাকে দেশে ফেরত আনতে গিয়েও পরিবার আরো ঋণগ্রস্ত হয়েছে। অথচ সরকারের তরফ থেকে আমরা এখনো কোন সহযোগিতা কিংবা ক্ষতিপূরণ কিছু পাইনি। অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকপক্ষকে গ্রেফতার ও ক্ষতিপূরণ প্রদানে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন আদনান।

আদনানের মা পাপিয়া আক্তার বলেন, ছেলেকে রাশিয়ায় পাঠাতে গিয়ে আমরা যেমন অনেক ঋণগ্রস্ত মনি দেশে ফিরিয়ে আনতে গিয়েও আরো অনেক অর্থ ঋণ করতে হয়েছে। অথচ সরকারিভাবে আমরা কোন ধরনের ক্ষতিপূরণ পাইনি। এ বিষয়ে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।

আদনানের মতো নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী এলাকার যুবক রবিন মিয়া (বিএমআইটি নাম্বার কেএসএম২০২৬৬০১৯৯১৬জি) ও কাজী রেজাউল করিম (বিএমআইটি নাম্বার বিএলএম২০২৬৬০০৩৩২৫জি) বৈধপথে বিএমইটির প্রশিক্ষণ ও সনদ নিয়ে রাশিয়া গিয়েছিলেন।

রবিন মিয়ার স্ত্রী পেয়ারা বেগম বলেন,  আমার স্বামী বেঁচে আছে কিনা এখনো জানিনা। ১০ লাখ টাকা ঋনের বোঝা ও দুই সন্তানকে নিয়ে আমি দিশেহারা। সরকারের কাছে আমাদের আবেদন আমাদের পরিবারের বেচে থাকার একমাত্র অবলম্বনকে ফিরিয়ে দিন।

কাজী রেজাউল করিম বেঁচে আছে কি নেই সেটা জানে না স্ত্রী মুন্নি বেগম। তিনি বলেন, ছেলের দুশ্চিন্তায় বৃদ্ধ পিতা-মাতা ক্রমশই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তাদের মাথাতেও ঋনের বোঝা। কিভাবে কি করবেন কোন কুলকিনারা পাচ্ছেন না।

এছাড়াও পাচারের শিকার ৩০ যুবকদের মধ্যে ময়মনসিংহের নান্দাইলের খারুয়া এলাকার মো. আল মামুন, যশোরের মনিরামপুরের লাউরি এলাকার আব্দুল গফুর হাবিয়া খাতুন দম্পতির পুত্র তরিকুল ইসলাম মিন্টু, ঢাকা নবাবগঞ্জ হাসনাবাদ এলাকার মো. আনসার মোল্লা ও মিনি বেগম দম্পতির পুত্র মো. সাঈদ মোল্লা, নবাবগঞ্জ খালপাড় এলাকার মোবারক আলী ও লালবানু দম্পতির পুত্র মো. সোহেল, টাঙ্গাইলের গোপালপুর থানাধীন বিরনলহারা এলাকার মো. ইসমাইল ও ফাতেমা বেগম দম্পতির পুত্র মো. নজরুল ইসলাম, গোপালপুর থানাধীন দক্ষিণ পাঠালিয়া এলাকার কসুরউদ্দিন ও মাজেদা দম্পতির পুত্র মো. আমিনুর ইসলাম, গোপালপুর থানাধীন মজিদপুর এলাকার শ্রী পরেশ চন্দ্র সূত্রধর ও শ্রীমতি জবা রানী দম্পতির পুত্র শ্রী পবিত্র চন্দ্র, কিশোরগঞ্জ সদরের সুরত আলী ও সফুরা খাতুন দম্পতির পুত্র মো. আবু হানিফ, গোপালগঞ্জ সদরের ফকিরবাড়ি এলাকার নুর ইসলাম ও মাজেদা বেগম দম্পতির পুত্র মো. রনি, গোপালগঞ্জ বালাকৈর এলাকার কবির মোল্লা ও বিউটি বেগম দম্পতির পুত্র মো. সৌরভ মোল্লা, গোপালগঞ্জ উদয়পাড়া থানাধীন ঘোষেরচর এলাকার জামিল শেখ ও রুবি বেগম দম্পতির পুত্র পলাশ শেখ, চাঁদপুর ফরিদগঞ্জের মাঈনউদ্দিন, চাঁদপুর সদরের স্বপন পাটোয়ারী ও তাসলিমা বেগম দম্পতির পুত্র আরিফ হোসেন পাটোয়ারী, জামালপুর মাদারগঞ্জের বনু মিয়া ও মাফুজা দম্পতির পুত্র মো. মফিজ, একই এলাকার তারা মিয়া ও আকলিমা দম্পতির পুত্র মো. আরিফ হোসেন, জামালপুর সদরের রফিকুল ইসলাম ও রেখা বেগম দম্পতির পুত্র মো. আরমান আলী, সাতক্ষীরা সদরের বইমারী এলাকার রবিউল ইসলাম ও মাহফুজা খাতুন দম্পতির পুত্র মো. সাব্বির হোসেন, চাপাইনবাবগঞ্জ শিবগঞ্জ থানার লস্করপুর এলাকার মো. আনারুল ও ইফফাতআরা দম্পতির পুত্র মো. ওয়াসিম আকরাম, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম প্রাণকৃষ্ণ এলাকার আফজাল হোসেন ও আলেয়া খাতুন দম্পতির পুত্র মো. আল আমিন ইসলাম, পাটগ্রাম প্রাণকৃষ্ণ কুয়ামারী এলাকার আব্দুল মজিদ ও রাশিদা খাতুন দম্পতির পুত্র আব্দুল্লাহ আল মামুন,  ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানাধীন আত্রাভামরা এলাকার জাহেদ আলী শেখ ও সানু বেগম দম্পতির পুত্র হেলাল শেখ, মাদারীপুর সদরের নুরু বেপারী ও শিরিন আক্তার দম্পতির পুত্র মো. কামাল হোসেন, গাজীপুর সদরের কুদাবর এলাকার মনির হোসেন ও রিনা আক্তার দম্পতির পুত্র রিপন হোসেন, রাজবাড়ি গোয়ালন্দ এলাকার আব্দুল হক ও আনিলা বেগম দম্পতির পুত্র আলী হোসেন এর খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি। প্রতারণার শিকার ৩০ যুবকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ পেতে সরকার উদ্যোগ নিবে এমনটিই প্রত্যাশা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর।

নারায়ণগঞ্জ জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারি পরিচালক কার্তিক চন্দ্র দেবনাথ জানান, কেউ যদি প্রতারণার শিকার হয় তাহলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ আমাদের দপ্তরে অভিযোগ দিলে আমরা সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেই। আমরা সবসময়ই বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করে। যারা ম্যান পাওয়ার ক্লিয়ারেন্স নিয়ে যায় তারাই বৈধপথে যেতে পারে। সেখানে তারা কাজ পায় মাস শেষে বেতন পায় বৈধপথে দেশে রেমিটেন্স পাঠাতে পারে। এছাড়াও যারা বৈধভাবে বিদেশে যায় তাদেরকে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়া হয়ে তাকে। কিন্তু অবৈধভাবে বিদেশে গেলে তাকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়। রাশিয়ায় নারায়ণগঞ্জের ৩ যুবকসহ ৩০ জনের প্রতারণার শিকার হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে ৩টি রিক্রুটিং এজেন্সীর লাইসেন্স সরকার বাতিল করেছে। আশা করছি তারা প্রতিকার পাবে।