করোনাকালীন সেই ভয়াল স্মৃতি আজও মানুষের মনে গভীর দাগ কেটে আছে। চারদিকে ছড়িয়ে ছিল আতঙ্ক, প্রতিদিন ভেসে আসত মৃত্যুরু সংবাদ। মানুষের চোখে-মুখে ছিল অসহায়তার ছাপ। সব মিলিয়ে সময়টা ছিল এক ভয়ংকর দুঃসময়ের প্রতিচ্ছবি।
আর এই দিনগুলোর সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক ছিল করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া মানুষের শেষকৃত্য। সংক্রমণের ভয়ে অনেকেই প্রিয়জনের কাছে যেতেও সাহস পেতেন না। অনেক মরদেহ পড়ে থাকত অবহেলায় নিঃসঙ্গতায়।
ঠিক সেই সময়েই নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ অসহায় মানুষের ভরসা হয়ে পাশে দাঁড়ান। একদল অকুতোভয় স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে গড়ে তোলেন ‘টিম খোরশেদ’।
নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, গাজীপুর ও মুন্সিগঞ্জ মিলিয়ে ৪৬০টিরও বেশি মরদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছেন বলে জানান তিনি।
শুধু তাই নয় করোনাকালে শ্বাসকষ্টে ভোগা অসহায় রোগীদের জন্য বিনামূল্যে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থাও করেছিলেন তিনি। সেই মানবিক উদ্যোগ এখনো থেমে নেই কোনো রোগীর অক্সিজেনের প্রয়োজন হলে আজও তিনি তা বিনামূল্যে সরবরাহ করেন বলে জানান।
পাশাপাশি রাস্তায় পড়ে থাকা অসুস্থ ও অসহায় বৃদ্ধ মানুষদের উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন বৃদ্ধাশ্রমে থাকার ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন যা তার মানবিকতার আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মানবসেবার এই ধারা তিনি শুধু করোনাকালেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। ২০১৮ সাল থেকে প্রতি ঈদে নামমাত্র ৫ টাকায় নতুন পোশাকের ব্যবস্থা করে অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাচ্ছেন। ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে তিনি হাসপাতালে থাকা রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটান। এমনকি নগরীর ব্যস্ত সড়কে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পুলিশদের কাছেও পৌঁছে দেন রান্না করা ঈদের সেমাই।
সম্প্রতি তিনি ২৪ ঘণ্টা ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু করার উদ্যোগ নিয়েছেন যা সাধারণ মানুষের জন্য বড় সহায়তা হয়ে উঠবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
টানা চারবার নির্বাচিত এই সাবেক কাউন্সিলরকে জনপ্রতিনিধি হওয়ার আসল অর্থ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “মানুষের সেবা করাই জনপ্রতিনিধি হওয়ার মূল উদ্দেশ্য। এমন অনেক কাজ আছে যা সাধারণ মানুষের পক্ষে করা সম্ভব হয় না। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও দায়িত্ব সেই কাজগুলো সহজ করে দেয়।”
তার কাজের প্রেরণা প্রসঙ্গে তিনি জানান, অসহায় মানুষের কষ্ট খুব কাছ থেকে দেখাই তাকে নাড়া দেয়। মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়িয়ে তাদের মুখে স্বস্তির হাসি ফিরিয়ে আনতে পারা, বিপদের মুহূর্তে ভরসা হয়ে ওঠা এই অনুভূতিই তাকে ভেতর থেকে তৃপ্তি দেয় এবং বারবার মানুষের জন্য কাজ করার শক্তি জোগায়।
অনেকে তার এসব কাজকে জনপ্রিয়তা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “প্রশংসা পেতে সবাই ভালোবাসে আমিও তার ব্যতিক্রম নই। তবে প্রশংসা পেতে হলে ভালো কাজ করতে হয়। যদি প্রশংসা পাওয়ার ইচ্ছায় একজন অসহায় মানুষও সেবা পায় তাহলে সেটাও খারাপ নয়।”
এই অসামান্য মানবসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ ‘টিম খোরশেদ’ এশিয়া বুক অব রেকর্ডসে স্থান করে নিয়েছে। এছাড়া করোনাকালীন মানবসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য মানবাধিকার পদকসহ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন তিনি ও তার টিম। দুর্যোগের সময় মনুষ্যত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হয় যা খোরশেদ কাজে প্রমাণ করেছেন।
করোনার সেই দুর্বিষহ দিনগুলোতে যে মানুষটি মৃত্যুর ভয়কে উপেক্ষা করে অপরিচিত মানুষের শেষযাত্রায় কাঁধ দিয়েছিলেন আজও তিনি একই নিষ্ঠায় মানুষের পাশে আছেন। পদ বা দায়িত্ব যাই থাকুক মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ অনেকের কাছে একজন ভরসার নাম হিসেবেই রয়ে গেছেন।



































আপনার মতামত লিখুন :