নারায়ণগঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঘিরে উদ্বেগের মধ্যে হঠাৎ করেই কঠোর অবস্থানে দেখা যাচ্ছে পুলিশকে। গত কয়েকদিন ধরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে শতাধিক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই অভিযানের ফলে নগরবাসীর মধ্যে একধরনের স্বস্তি ফিরে আসতে শুরু করেছে, একই সঙ্গে পুলিশের প্রতি আস্থাও কিছুটা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত মিলছে।
পুলিশের দাবি, মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েই তারা মাঠে নেমেছে। শহরের পরিচিত মাদক স্পটগুলোতে একের পর এক অভিযান চালানো হচ্ছে। এসব অভিযানে কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না এমন বার্তা স্পষ্টভাবেই দিতে চাচ্ছে পুলিশ প্রশাসন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অভিযান যদি ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে, তাহলে চুরি, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধও কমে আসবে।
তবে এই কঠোর অবস্থানের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক কয়েকটি উদ্বেগজনক ঘটনা, যা পুলিশের নিরাপত্তা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। বিশেষ করে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় পুলিশের ওপর হামলা এবং সরকারি অস্ত্র ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাগুলো পুরো জেলাজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
গত ৯ মার্চ ভোরে শহরের নিতাইগঞ্জ এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা পরিস্থিতিকে নতুন করে নাড়া দেয়। ভোর পৌনে ছয়টার দিকে বঙ্গবন্ধু সড়কের নগর ভবনের সামনে দায়িত্ব পালন করছিলেন সদর মডেল থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) লুৎফর রহমান। এক পর্যায়ে তিনি সহকর্মীদের থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে মোটরসাইকেলে আসা তিন দুর্বৃত্ত তার পথরোধ করে। পরে তাকে কুপিয়ে আহত করে তার কোমরে থাকা সরকারি পিস্তল ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়।
এই ঘটনার পরপরই প্রশাসনের ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক টিম মাঠে নামে। কয়েক দফা অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে আটক করা হয় এবং ছিনতাই হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে জানায় পুলিশ। তবে এই ঘটনা পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এর রেশ কাটতে না কাটতেই ১৫ মার্চ শহরের রেললাইন সংলগ্ন থানকাপড় মার্কেট এলাকায় আরেকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। বিকেল পাঁচটার দিকে রেলওয়ে পুলিশের একটি দল এক মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে সিএনজিতে তোলার সময় তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে এক এসআই, এক কনস্টেবল এবং তাদের সঙ্গে থাকা সোর্স গুরুতরভাবে মারধরের শিকার হন।
পুলিশ জানায়, হামলাকারীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেয় তারা প্রচার করে পুলিশ নিরীহ শ্রমিকদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে এবং ঘুষ আদায়ের চেষ্টা করছে। এতে করে কিছু সাধারণ মানুষও উত্তেজিত হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ঘটনাস্থল থেকে দুইজনকে আটক করে।
এসব ঘটনার পর থেকেই পুলিশ প্রশাসন নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে শুরু করে। জেলার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, বাজার এলাকা ও মাদকপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তৎপরতাও জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
নগরবাসীর একাংশ মনে করছেন, পুলিশের এই কঠোরতা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ও ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ ছিল শহরবাসী। এখন যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিতভাবে এ ধরনের অভিযান চালায়, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধুমাত্র অভিযান চালালেই হবে না এর পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার এবং পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠনও জরুরি।
সব মিলিয়ে, নারায়ণগঞ্জে পুলিশের বর্তমান কঠোর অবস্থান একদিকে যেমন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, অন্যদিকে এটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে কতটা কার্যকর হয় তা নির্ভর করবে এই অভিযানের ধারাবাহিকতা ও জনসম্পৃক্ততার ওপর।

































আপনার মতামত লিখুন :