প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত শিল্প ও বাণিজ্যনগরী নারায়ণগঞ্জে মাদক সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি ইস্যুতে বিতর্কে বিধছে বিএনপি। বিএনপির হাইকমান্ড এসব ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে থাকলেও স্থানীয় নেতাদের লোভের কারণে কর্মীরা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে। বিভিন্ন এলাকায় মাদক সন্ত্রাস ও চা^দাবাজিসহ আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ঝরছে রক্ত। এরই মধ্যে একের পর এক সংঘাতের ঘটনায় সর্বত্র বিরাজ করছে উত্তেজনা আতঙ্ক। এসব ঘটনায় বিএনপির অনেক নেতার নামও জড়িয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বিএনপি। ইতোমধ্যে প্রশাসনের যে চাঁদাবাজদের তালিকা করা হয়েছে তাতেও বিএনপির অনেক নেতার নাম রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়াও শহরের অনেক মাদক স্পটের ব্যবসায়ীদেরকে বিএনপির গুটিকয়েক নেতারা শেল্টার দিচ্ছেন এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি ও কর্মসংস্থান খাতে আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত ২৬ জানুয়ারি রাতে সোনারগাঁর কাঁচপুর বালুর মাঠে আয়োজিত বিএনপির নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব প্রতিশ্রুতি দেন।
তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘গত কয়েক বছরে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা হুমকির মুখে। বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রতিটি অপরাধের বিচার দেশের প্রচলিত আইনে নিশ্চিত করা হবে। দখলবাজি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে। ‘দুর্নীতি ও মাদক’ সমাজের প্রধান শত্রু মন্তব্য করে তারেক রহমান বলেছিলেন, নারায়ণগঞ্জ শহর ও এর আশপাশে মাদকের ২০টি স্পট রয়েছে। এখানে মাদক ব্যবসার যে বিস্তার ঘটেছে, তা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।
তার এই বক্তব্যে নারায়ণগঞ্জে বেশ সাড়া ফেলেছিলো। সে সময় থেকেই এসকল মাদক স্পটে অভিযান পরিচালনার দাবী উঠে। এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর এই নিবাচনের পরপরই এসকর স্পটে অভিযান পরিচালনার দাবী দিন দিন জোড়ালো হয়ে উঠে।
গত ২ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সি জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জে এসে কিছু মাদক স্পটের কথা বলেছিলেন। সে সকল স্পট নিয়ে আমরা করছি। আমরা মাদক ব্যবসায়ী এবং ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা করছি। আমরা এদেরকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছি। আশা করছি আমরা শীঘ্রই জিরো অবস্থানে নিয়ে আসতে পারবো। আমাদের পুলিশ সদস্যরা সারারাত অভিযান পরিচালনা করছেন।
জানা গেছে, মাদক ব্যবসা নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে ফতুল্লার ইসদাইরে শুভ নামের যুবককে ডেকে এনে গুমের অভিযোগে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক সাখাওয়াত ইসলাম রানার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। গত ২৫ মার্চ শুভর নেতৃত্বে তার বাহিনীর সদস্যরা চাষাঢ়া রেললাইনের পাশে অবস্থিত মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক সাখাওয়াত হোসেন রানার গ্যারেজে অতর্কিতভাবে চাপাতিসহ হামলা চালায়। এ সময় জীবন বাচাতে রানা ও কাশেমসহ তার বাহিনীর সদস্যরা পালিয়ে যায়। ওই ঘটনার পর শুভর পরিবারের অভিযোগ তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ওই ঘটনার পর স্ত্রী পিংকি বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় শাকিল ও রানাগংদের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পরবর্তীতে শুভ’র মা মাকসুদা বেগম বাদী হয়ে ২ এপ্রিল ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেছেন। মামলার আসামিরা হলেন মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক সাখাওয়াত ইসলাম রানা (৫১), কাশেম (ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী) (৪৫), সাব্বির (২১), শাকিল (২৮), পাপ্পু (৪০), মো. আলী মিয়া (৩৮), জাহিদ (৩৫), রাজ্জাক (৫০), ওয়াসিম (২৩), লাল শুভ (২০)। মামলায় আরও ৪/৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে রানা প্রয়াত যুবদল নেতা মমিনউল্লাহ ডেভিডের ভাগ্নে। তিনি ভাগ্নে রানা হিসেবেই পরিচিত। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত আসামি সাব্বির, মাদক সম্রাট রাজ্জাক ও তার পুত্র ওয়াসিম নামে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
জানা গেছে, কয়েকদিন আগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় স্পিনিং মিল এলাকায় যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানের মাত্র তিন ঘণ্টা পার হতে না হতেই পুনরায় সচল হয়েছে মাদক ব্যবসায়ী সানির মাদকের স্পট। যৌথ বাহিনীর অভিযানে ওই এলাকা থেকে ১০ জনকে আটক করা হলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় মাদক কেনাবেচা ও সেবীদের আনাগোনা থামানো যাচ্ছে না। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী এক বিএনপি নেতার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতে সানি এই মাদক সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন। এই নেতার আশ্রয়ে থেকে প্রতিদিন অন্তত এক মণ গাঁজা এবং বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বিক্রি করা হয় এই স্পটে।
২৭মার্চ ফতুল্লা থানাধীন দেওভোগ, বাঁশমুলি, কাশীপুর খিলগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১০জন মাদক কারবারি গ্রেপ্তার করে র্যাব-১১ এর একটি অভিযানিক দল। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১২০ পুরিয়া গাঁজা ও ৩৭ পিছ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। র্যাবের এমন অভিযানে স্থানীয়রা খুশিরা হলেও তাদের দাবি অভিযানে যারা ধরা পড়েছে তারা সকলেই ছিচকে মাদক কারবারি আর তারা প্রত্যেকে শহীদ ও রিপনের মাদক সিন্ডিকেটের হয়ে খুচরা বিক্রেতা হিসেবে কাজ করে থাকেন। এসব এলাকার মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে হলে র্যাবে উচিত মূল হোতা সাব্বির আহম্মেদ শহীদ ও সবুজকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য মতে, শহরের ডিআইটি থেকে শুরু করে নিতাইগঞ্জ, বাবুরাইল কাশীপুরের খিলমার্কেট, বাংলাবাজার হোসাইনি নগর, হাটখোলা, আম বাগান, চৌধুরীবাড়ি, শহীদনগর, গোগনগর, পাইকপাড়া, নামাপাড়া, শাসনগাঁও, ভোলাইল হয়ে পঞ্চবটি পর্যন্ত বিশাল এই এরিয়া জুড়ে মাদকের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক সাব্বির হোসেন শহিদ। তার নিয়ন্ত্রিত বিশাল এই মাদকের সামাজ্যে হাত বাড়ালেই মিলে গাঁজা থেকে শুরু করে হেরোইন, ইয়াবা, ফ্যান্সিডিল ও মদ। এসব মাদক দ্রব্যের পাইকারী বিক্রেতা সাব্বির হোসেন শহিদ। আর শহিদের অন্যতম সহযোগি হলেন এই সবুজ। এই শহীদকে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে বিএনপি মনোনীত জোট প্রার্থী মনির হোসেন কাশেমীর সাথে নির্বাচনী প্রচারণা করতে দেখা গিয়েছিলো। এরপর তাকে সিটি কর্পোরেশনের নবনিযুক্ত প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানকেও ফুল দিয়ে বরণ করতে দেখা গেছে। শুধু মাদকের ডিলারশীপই নয় শহিদের মাধ্যমেই উল্লেখিত এলাকা গুলো জমি দখল, অপহরণ করে মুক্তিপন আদায় সহ ছিনতাই ডাকাতি সকল কিছুর নিয়ন্ত্রক এই শহিদ। উল্লেখিত এলাকাগুলোকে যদি অপরাধের স্বর্গরাজ্য বিবেচনা করা হয় তবে সেই রাজ্যের স্বঘোষিত সম্রাট হয়ে উঠেছে এই সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী শহিদ।
১০ মার্চ রাতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কুতুবপুর ইউনিয়নের মাহমুদপুরে মাদক ব্যবসা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করায় কুতুবপুর ইউনিয়ন ওয়ার্ড বিএনপির যুব ও ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক আল আমিনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মাদক ব্যবসায়ীরা হামলা ও ভাংচুর করেছে। স্থানীয় যুবদল নেতা ইসমাইল, ওসমান গনি ও তাদের অনুসারীরা এই হামলা করে। ১১ মার্চ দুপুরে মাহমুদপুর এলাকায় সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী বলেন, দীর্ঘদিন যাবত এলাকায় যুবদল নেতা ইসমাইল ও ওসমান মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। মাদক ব্যবসা বন্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট করায় তাদের নেতৃত্বে ইট-বালু-সিমেন্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করে ভাঙচুর, লুটপাট করে নগদ অর্থ সহ একজনকে কুপিয়ে জখম করে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচার ও শাস্তির দাবি জানান তারা।
১০ মার্চ রাতে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলে কৃষকদল মহানগরের সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন মাহমুদ ফয়সালের বসতবাড়িতে প্রতিপক্ষের লোকজন দলবদ্ধভাবে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট করেছে করেছে বলে অভিযোগ উঠে। এসময় কৃষকদল নেতার ছোট ভাই ও এক সহযোগীকে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন কৃষকদল নেতার ছোট ভাই রায়হাতুল মাহমুদ রাতুল।
৮ মার্চ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় চাঁদাবাজিতে বাধা দেওয়ায় মোহাম্মদ আরিফ নামে এক স্থানীয় ব্যবসায়ীকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে জখম করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি নেতা মাসুম প্রধান ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। আহত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আরিফের দাবি, মাসুম প্রধান দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ব্যবসা করার জন্য তার কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। এর আগেও চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় আরিফের দোকানে ভাঙচুর চালানো হয়েছিল। সর্বশেষ গত ৮ মার্চ সন্ধ্যায় তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে এই হামলা চালানো হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।





































আপনার মতামত লিখুন :