জুলাই আন্দোলনের টানা দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার এবং সহিংসতার পর ২০২৪ সালের ১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। কয়েকদিন ধরে কারফিউ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়াকড়ি এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে প্রকাশ্য কর্মসূচি অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এদিন নিহতদের স্মরণ, গ্রেপ্তার হওয়া আন্দোলনকারীদের মুক্তির দাবি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আবারও প্রতিবাদের আবহ তৈরি হয় পুরো জেলায়।
সকালের দিকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থী ও তরুণেরা দেয়াল লিখন, গ্রাফিতি এবং প্রতিবাদী চিত্রাঙ্কনের মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দেন। চাষাঢ়া, আদালতপাড়া, জালকুড়ি, ডিআইটিসহ বিভিন্ন এলাকায় দেয়ালে লেখা হয় আন্দোলনের স্লোগান, নিহতদের স্মরণে বার্তা এবং ৯ দফা দাবির পক্ষে আহ্বান। আন্দোলনের প্রকাশ্য মিছিল সীমিত থাকলেও এসব দেয়ালচিত্র ও গ্রাফিতি ছিল প্রতিবাদের নতুন ভাষা।
দিনভর শহরের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার ছিল। আগের কয়েক দিনের সংঘর্ষ ও নাশকতার ঘটনায় গ্রেপ্তার অভিযানও অব্যাহত থাকে। আন্দোলন ঘিরে দায়ের হওয়া একাধিক মামলায় শত শত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ কারণে অনেক আন্দোলনকারী আত্মগোপনে থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ছোট ছোট দলীয় সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
দিনের সবচেয়ে আলোচিত কর্মসূচি ছিল সন্ধ্যায় নিহতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও বালুর মাঠ এলাকায় মোমবাতি জ্বালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। তবে কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগেই পুলিশ সেখানে বাধা দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ লাঠিচার্জ ও ধাওয়া দিলে কর্মসূচি পণ্ড হয়ে যায় এবং অন্তত দুজন আহত হন। এরপরও অনেকেই ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে মোমবাতি জ্বালিয়ে নিহতদের স্মরণ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এর প্রতীকী রূপান্তর। কয়েকদিন আগেও যেখানে সংঘর্ষ, গুলি, টিয়ারশেল ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ছিল আন্দোলনের প্রধান চিত্র, সেখানে এদিন মোমবাতি, দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতি হয়ে ওঠে প্রতিবাদের প্রধান ভাষা। এতে একদিকে যেমন আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও নতুন করে সংহতির আবহ তৈরি হয়। ১ আগস্টের এই প্রতীকী প্রতিবাদ নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনের গতি ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মোমবাতির আলোয় নিহতদের স্মরণ এবং দেয়ালজুড়ে লেখা প্রতিবাদের ভাষা পরবর্তী দিনগুলোতে আরও বড় জনসমাগম ও বিক্ষোভের ভিত্তি তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের আগে নারায়ণগঞ্জ আবারও দেশের অন্যতম সক্রিয় আন্দোলনকেন্দ্রে পরিণত হয়।



































আপনার মতামত লিখুন :