নারায়ণগঞ্জে সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের ব্যানারে অংশ নিয়ে একটি আসনে জয় পেয়েছে বিরোধী জোট। জয় পাওয়ার পর জোটের শরীক দুই প্রধান দল জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে দূরত্ব তৈরী হয় সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণাকে ঘিরে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেয়ার ঘোষণা দেয়ায় কিছুটা নাখোশ হয়েছে এনসিপি। কারণ পুরো নারায়ণগঞ্জে জামায়াত জোটের ইমেজ রক্ষা করেছে এনসিপি। সেখানে এনসিপিকে গুরুত্ব না দিয়ে জামায়াতের একক সিদ্ধান্ত ভালোভাবে গ্রহণ করেনি এনসিপির নেতারা।
এবার নতুন করে ভাঙন তৈরী হলো খেলাফত মজলিস বেরিয়ে যাওয়ায়। জোট থেকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে নির্বাচন করে দলটির প্রার্থী এবিএম সিরাজুল মামুন। নিজস্ব ভোট ব্যাংক না থাকলেও জামায়াত ও এনসিপির সমর্থন নিয়ে বিজয়ের সম্ভাবনা তৈরী করেছিলেন তিনি। ব্যক্তিগত ইমেজের কারণেও পরিচিতি পেয়েছিলেন বেশ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হেরেই যেতে হয় তাকে। জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় এই অঞ্চলে দুর্বল হলো জামায়াত এনসিপি জোট তা একেবারেই স্পষ্ট।
সূত্র বলছে, জোটের ভেতরে জামায়াতের পর দ্বিতীয় বৃহৎ দল হিসেবে অবস্থান করা এনসিপি নারায়ণগঞ্জে জয় লাভ করলেও পরবর্তী সময়ে নানা ইস্যুতে মতবিরোধ দেখা দেয়। বিশেষ করে স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতাকে ঘিরে দুই দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। এনিয়ে পাল্টাপাল্টি শুরু হয় দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে। নির্বাচনের আগে এবং পরে যেমন ঘনিষ্ঠতা ছিলো, ব্যবসায়ী ইস্যুর পর তা অনেকটাই কমে গেছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই জামায়াতের আয়োজিত ইফতার মাহফিলে এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তার এই বক্তব্যে জেলাজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সেসময় আবদুল্লাহ আল আমিনকে ২ ঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখে হাতেমের অনুসারী ও বিএনপির নেতাকর্মীরা। আহত হয় একাধিক এনসিপি কর্মী।
এনসিপির নেতাকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে সরব থাকলেও সে সময় জামায়াতের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। প্রায় এক মাস পর জামায়াত মহানগর শাখার আমীর মাওলানা আবদুল জব্বার এক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ হাতেমের পক্ষ নিয়ে কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, হাতেমকে ফ্যাসিস্টের দোসর বলা সঠিক নয় এবং এ ধরনের বক্তব্য প্রদানকারীদেরও সমালোচনা করেন।
সেসময় হাতেমের পক্ষ নিয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক এই কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেন, ‘হাতেম সাহেব ফ্যাসিস্টের দোসর সেই বিষয়টা আমরা সেভাবে কখনও চিন্তা করিনি বা আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়নি। এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে হাতেম ফ্যাসিবাদের দোসর। আমরা তো কিছুদিন আগে দেখলাম যে এনসিপির নেতৃবৃন্দ জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের জন্য ফান্ড তাদের কাছ থেকে নিয়েছেন। সেসময় তিনি ফ্যাসিস্ট হলেন না, এখন হটাৎ করে তিনি ফ্যাসিস্ট হয়ে গেলেন। আমরা একটা পীসফুল নারায়ণগঞ্জ চাই। এখানে ব্যবসাও লাগবে, রাজনীতিও লাগবে। এনসিপি যেহেতু আমাদের সহযোগী ছিলো। তাদের সাথে আমাদের যেমন যোগাযোগ আছে, ব্যবসায়ীদের সাথেও আমাদের যোগাযোগ আছে।
জামায়াত নেতার এই অবস্থানের পর এনসিপির ভেতরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সেই ঘটনার পর থেকে দূরত্ব আরও বৃদ্ধি পায় জামায়াতের আমীর এসে যখন নারায়ণগঞ্জে ১১ দলীয় জোটকে বাইরে রেখেই আব্দুল জব্বারকে মেয়র পদে প্রার্থী ঘোষণা করে। নারায়ণগঞ্জের তিনটি আসনে জামায়াত জয় পায়নি, সেদিক থেকে এগিয়ে আছে এনসিপি। কিন্তু এনসিপিকে উপেক্ষা করে একক প্রার্থী ঘোষণা করায় বিষয়টি স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করেনি নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, অন্তত পারস্পরিক সৌজন্যতা বজায় রাখা যেত জামায়াতের পক্ষ থেকে।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ফাটল কেবল ব্যক্তি ও দলীয় ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ নয়। সামনে সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে প্রভাব ফেলবে অভ্যন্তরীন দূরত্ব ও ফাটল। এটা স্পষ্ট যে এখন জামায়াত, এনসিপি এবং খেলাফত তিন দল থেকেই পৃথক প্রার্থী আসবে। যা বিজয়ের বদলে পরাজয়কেই নিশ্চিতভাবে এগিয়ে রাখবে। সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন বড় প্রশ্ন জামায়াত-এনসিপি জোট কি টিকবে, নাকি আলাদা হয়ে যাবে অধিকাংশ দল?





































আপনার মতামত লিখুন :