News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

ডাকাত শহীদ ও সবুজের আস্তানায় পুলিশের অভিযান


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: জুলাই ২৯, ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএম ডাকাত শহীদ ও সবুজের আস্তানায় পুলিশের অভিযান

নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ এবং কাশিপুর অঞ্চলের ত্রাস খ্যাত ডাকাত শহীদ ও তার অনুসারী সবুজের আস্তানায় অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। মঙ্গলবার দুপুরে কাশিপুরের তাতীপাড়া এলাকায় অবস্থিত তাদের টর্চার সেলে অভিযান পরিচালনা করা হয়। জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (ক সার্কেল) এর নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়।

তবে অভিযানের খবর টের পেয়ে আগেই নিজেদের সরঞ্জাম নিয়ে সটকে পড়ে ডাকাত শহীদ ও সবুজের অনুসারীরা। ফলে খালি হাতেই ফিরে আসতে হয় পুলিশকে। ফতুল্লা থানা পুলিশ সূত্র জানায়, ডাকাত শহীদ ও অনুসারীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই নানান অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে গোয়েন্দা সংস্থা থেকেও নেতিবাচক রিপোর্ট উঠে আসছিলো। তার কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ হয় এমন এলাকা হিসেবে পরিচিত তাতীপাড়ার আস্তানাটি। মঙ্গলবার সেই আস্তানায় অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। 

তবে অভিযানে কিছু না পেলেও সংশ্লিষ্ট এলাকায় গা ঢাকা দিয়েছে শহীদ ও সবুজ বাহিনীর অনুসারীরা। বিশেষত মাদক ব্যবসায়ী, অপহরন চক্র এবং টর্চার সেল নিয়ন্ত্রকরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। তবে অভিযানের খবর আগেই টের পেয়ে যাবার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এলাকাবাসী। তারা বলছেন, কিছু অসাধু ব্যক্তি অর্থের লোভে এসব অভিযানের খবর আগেই ফাঁস করে দেয় অপরাধীদের কাছে। যার ফলে মুহূর্তেই সেসব স্থান থেকে মালামাল সরিয়ে সটকে পড়ে অপরাধীরা। 

ডাকাত শহীদ ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন নারায়ণগঞ্জ ৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন। গত ১২ জুলাই আবদুল্লাহ আল আমিন জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত আইন শৃঙ্খলা বৈঠকে বলেন, ‘ফতুল্লার কাশিপুর এলাকায় বড় একটি সমস্যা হচ্ছে আইন শৃঙ্খলার অবনতি। এখানে একজনের নাম উল্লেখ করতেই হয় সেটা হচ্ছে শহীদ ওরফে ডাকাত শহীদ গ্যাং। এই অপরাধীর নাম প্রতিনিয়ত পত্রিকায় পাবেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোন স্টেপ নেয়া হচ্ছে না। প্রশাসন চাইলে বলতে পারে মিডিয়ায় যা বলছে তা মিথ্যা, আসলে উনি ভালো মানুষ। কিন্তু একজন ব্যক্তির বিষয়ে মাসের পর মাস অপরাধমূলক কর্মকান্ডের অভিযোগ উঠছে আর প্রশাসন যদি নীরব থাকে তখন প্রশাসনের উপর জনগনের আস্থা কমতে শুরু করে। 

তার এই বক্তব্যের পর ডাকাত শহীদের ভাড়াটে বাহিনী এমপির বিরুদ্ধে মিছিল বের করে। সেখানে এমপিকে প্রকাশ্যে হাত ভেঙ্গে দেয়া সহ হত্যাচেষ্টার হুমকি দেয়। এসব ঘটনায় জেলাজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠে। একজন সন্ত্রাসী ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙ্গিয়ে এমপিকে হুমকি দিচ্ছে এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনী নীরব রয়েছে এমন চিত্র উঠে আসে প্রকাশ্যে।

শহীদ ওরফে ডাকাত শহীদের এমন বেপরোয়া আচরণের সাথে মিল পাওয়া যায় সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলের সাবেক কাউন্সিলর ও সাত খুন মামলার প্রধান আসামী নূর হোসেনের সাথে। নূর হোসেন পুরো সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলে ছিলো একক ত্রাস। সেই এলাকার চাঁদাবাজি, ভুমিদস্যুতা, মাদক এবং সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রক ছিলো নুর হোসেন। ঠিক সেই প্রক্রিয়াতেই নিজের মাফিয়া গ্যাং চালাচ্ছে সাব্বির হোসেন শহীদ ওরফে ডাকাত শহীদ। পুরো কাশিপুর অঞ্চলের মাদক, ভুমিদস্যু, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রক হয়েও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে পুলিশের সামনে। আওয়ামী লীগ আমলে আওয়ামী লীগের লোকজনের সাথে থেকে প্রভাব বিস্তার করতো। আওয়ামী লীগের পতনের পর বিএনপির কয়েকজন নেতাকে হাত করে রাতারাতি বিএনপি নেতা হিসেবে নিজেকে প্রচার করা শুরু করেছে। নিজের গ্যাং টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন স্থানে আর্থিক সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। 

সম্প্রতি রাশেদ নামে এক ট্রাক চালক ও মালিককে ডেকে নিয়ে অপহরণ করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপন দাবী করা হয়। সেই টাকা দিতে না পারায় কুপিয়ে আহত করা হয় তাকে। কোনমতে পালিয়ে প্রাণ বাচায় রাশেদ। ঘটনার বর্ননা দিয়ে রাশেদ জানায়, সম্প্রতি ধার দেনা করে নিজে একটি ট্রাক ক্রয় করেন। সেই থেকেই তার ট্রাকের উপর নজর পরে শহিদ গ্রুপের সদস্যদের। কৌশলে ডেকে এনে তাকে অপহরণ করে আটকে রাখে এবং ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। সেই টাকা না দিলে তার ট্রাক তাদের নামে লিখে দিতে হবে অথবা দিতে হবে প্রাণ। 

রাশেদ বলেন, স্ট্যান্ডের সেক্রেটারি শহীদের লোকজন আমার থেকে তারা ২০ লাখ চাঁদা চাইছে। টাকা না দিলে আমি কয়েকদিন আগে যেই ট্রাক কিনছি সেটা ওদের নামে লিখে দিতে হবে। নাহলে আমাকে মেরে ফেলবে। আমি ছাদ থেকে লাফিয়ে পালায়া হাসপাতালে আসছি। ওদের নাকি ৫০ লাখ টাকা লাগবো। এজন্য আমার মত চারজনকে অপহরণ করে ৫০ লাখ টাকা আদায় করবে। 

কারা এই ঘটনার সাথে জড়িত জানতে চাইলে বলেন, শহীদের অনুসারী শুভ, শাহীন, আরাফাত, ইমরান, রাজীব সহ আরও কয়েকজন মিলে আমাকে মারধর করে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপায়। টাকা না পেলে আমার স্ত্রীকে ধর্ষণ করার হুমকি দেয়, এবং আমার সন্তানকে বিক্রি করে দেয়ার হুমকি দেয়। পুরো নিতাইগঞ্জ ট্রাক স্ট্যান্ড এখন সন্ত্রাসের রাজত্ব হয়ে উঠেছে।

উল্লেখ্য, ডাকাত শহীদ নারায়ণগঞ্জ ট্যাংক লড়ি কার্ভাট ভ্যান চালক শ্রমিক ইউনিয়ন এর সাধারণ সম্পাদক পদে আসীন হয়েছেন ৫ আগস্টের পর। এর পূর্বে তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের কর্মী। ছিলেন প্রয়াত সাংসদ নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানের অন্যতম সহযোগী। ৫ আগস্টের পর আজমেরী ওসমান দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে ডাকাত শহীদ বনে যান বিএনপি নেতা।

আর তাকে নিতাইগঞ্জে ওই কমিটিতে অধিষ্ঠিত করেছেন মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি হাসান আহম্মেদ। তিনি ওই কমিটির সভাপতি। তবে হাসান আহম্মেদ শারীরিক ও মানসিক ভাবে অসুস্থ হওয়ায় তার সকল কিছুর নিয়ন্ত্রণ করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র আফসানা আফরোজ বিভা ।

ডাকাত শহীদের এমন সন্ত্রাসী এবং অপকর্মের দায় নিবে না বিএনপি। এমন সিদ্ধান্ত থেকে ইতোমধ্যে বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে আসফানা আফরোজ বিভাকে সতর্ক করা হয়েছে বলেও নিশ্চিত হওয়া গেছে।

তবে এই ডাকাত শহীদকে নিতাইগঞ্জে বহাল রাখতে বিভিন্ন মহলে দৌড়ঝাপ শুরু করেছে আফরোজা আক্তার বিভা।

শুধু নিতাইগঞ্জই নয় বাবুরাইল কাশীপুরের খিলমার্কেট, বাংলাবাজার হোসাইনি নগর, হাটখোলা, আম বাগান, চৌধুরীবাড়ি, শহীদনগর, গোগনগর, পাইকপাড়া, নামাপাড়া, শাসনগাঁও, ভোলাইল হয়ে পঞ্চবটি পর্যন্ত বিশাল এই এরিয়া জুড়ে মাদকের একছত্র নিয়ন্ত্রক সাব্বির হোসেন শহিদ। তার নিয়ন্ত্রিত বিশাল এই মাদকের সামাজ্যে হাত বাড়ালেই মিলে গাঁজা থেকে শুরু করে হেরোইন, ইয়াবা, ফ্যান্সিডিল ও মদ। এসব মাদক দ্রব্যের পাইকারী বিক্রেতা সাব্বির হোসেন শহিদ।

শুধু মাদকের ডিলারশীপই নয় শহিদের মাধ্যমেই উল্লেখিত এলাকা গুলো জমি দখল, অপহরণ করে মুক্তিপন আদায় সহ ছিনতাই ডাকাতি সকল কিছুর নিয়ন্ত্রক এই শহিদ। উল্লেখিত এলাকাগুলোকে যদি অপরাধের স্বর্গরাজ্য বিবেচনা করা হয় তবে সেই রাজ্যের স্বঘোষিত সম্রাট হয়ে উঠেছে এই সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী শহিদ।

স্থানীয়রা জানান, এসব অঞ্চল গুলোতে শহিদের মাদক বিক্রির জন্য ৩ থেকে ৪ হাজার লোক নিয়োগ প্রাপ্ত রয়েছে। যাদেরকে প্রতিদিন ২ থেকে ৩ হাজার টাকা চুক্তিতে রাখা হয়েছে। তাঁতীপাড়া মোড় থেকে নাগবাড়ি মোড় পর্যন্ত বিভিন্ন ল্যাম্পপোস্ট তারা সিসি টিভি ক্যামেরা স্থাপন করে স্পট গুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। যাতে করে প্রশাসনের লোকদের ওইসব এলাকায় ঢুকতে দেখতে পেয়ে আগে থেকেই সর্তক হতে পারে।

গুঞ্জন রয়েছে রাত ১১টার পর থেকে নাগবাড়ি ডায়াবেটিস হাসপাতালের পেছনে শহিদের অফিসে ফতুল্লা পুলিশের বিভিন্ন সদস্যদেরকেও সেখানে আনাগোনা করতে দেখা যায়। মাসোহারা আদায় করার জন্য। আদতে পুলিশ মাদকের ব্যাপারে তাদের জিরো ট্রলারেন্সের কথা শুনালেও এটা স্রেফ তাদের মুখস্ত বয়ান। মূলত পুলিশের পরোক্ষ মদদের কারণেই শহিদ মাদকের এতোবড় সিন্ডিকেট পরিচালনা করতে সক্ষম হচ্ছে। কারণ তারা রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে সরাসরি টেকনাথ হয়ে মায়ানমার থেকে ইয়াবা সহ মাদক দ্রব্য গুলো নারায়ণগঞ্জে ৫নং মাছঘাটে গভীর রাতে এসে ডেলিভারী করা হয়। পরবর্তীতে সেখান থেকে বিভিন্ন স্থানে চলে যায়।

পুলিশের পরোক্ষ মদদের পাশাপাশি তার রয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের ছায়া। পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই শহিদকে এলাকায় না দেখা গেলেও বর্তমানে তিনি পুরোদস্তুর একজন বিএনপি নেতা। মহানগর যুবদল নেতা মাজহারুল ইসলাম জোসেফ, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র আফসানা আফরোজ বিভা ও দাদা সেলিম এর মাধ্যমে জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জাকির খানের মিছিল মিটিং সমাবেশে জনবল সাপ্লাই দিয়ে থাকে এই শহিদ।

শহিদের বাহিনীতে আরো সক্রিয় সদস্য হিসেবে রয়েছে সবুজ ও বাপ্পি চিশতি নামের আরো দুই সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের সামনে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শহিদ বাহিনীর দুই গ্রুপের মারামারি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় গুলি বর্ষণের মত ঘটনাও ঘটে। গুলিতে শুভ নামের একটি গুরুতর আহত হওয়ার গুঞ্জন শোনা গেছে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর শুভকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে শোনা গেছে। তবে এ ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।

ওই সংঘর্ষের পর বিষয়টি নিয়ে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা ডাকাত শহীদ কে নিয়ে বিব্রত হয়েছেন। যদিও পরের দিন ডাকাত শহীদের পক্ষে মাদক বিরোধী মিছিল করে আগের দিনের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বাপ্পি চিশতি।