News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

নারায়ণগঞ্জ জুড়ে ধরপাকড়, আতঙ্কে চলছিল নীরব প্রতিরোধ


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: জুলাই ২৭, ২০২৬, ১০:২৫ পিএম নারায়ণগঞ্জ জুড়ে ধরপাকড়, আতঙ্কে চলছিল নীরব প্রতিরোধ

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে উত্তপ্ত দিনগুলো পেরিয়ে ২৬ জুলাই ছিল নারায়ণগঞ্জের জন্য এক ভিন্ন বাস্তবতার দিন। ১৯ থেকে ২১ জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং ব্যাপক গ্রেপ্তারের পর এদিন রাজপথে বড় ধরনের মিছিল না থাকলেও পুরো জেলা ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও অভিযানের মধ্যে। প্রকাশ্য আন্দোলন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এলেও ভেতরে ভেতরে চলছিল প্রতিবাদ, আতঙ্ক, আইনি লড়াই এবং গ্রেপ্তার এড়াতে আন্দোলনকারীদের আত্মগোপনের চেষ্টা।

২৬ জুলাই সকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জ শহর, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, বন্দর, রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন এলাকায় যৌথ বাহিনীর টহল ও অভিযান জোরদার করা হয়। আগের কয়েক দিনের ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, তাদের খুঁজে বের করতে বাড়ি বাড়ি অভিযান চালানো হয়। অনেক এলাকায় আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থী, তরুণ ও রাজনৈতিক কর্মীদের বাসায় গিয়ে তল্লাশি চালানোর অভিযোগ ওঠে। ফলে অসংখ্য শিক্ষার্থী ও তরুণ নিজ নিজ বাড়ি ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের বাসা কিংবা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। সেদিন নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়াও ছিল অস্বাভাবিক ব্যস্ত। আন্দোলন ঘিরে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের আদালতে হাজির করা হয় এবং তাদের জন্য বিশেষ আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আদালত প্রাঙ্গণে সকাল থেকেই স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা, কান্না আর উৎকণ্ঠার দৃশ্য দেখা যায়। কারও ছেলে, কারও ভাই, কারও স্বামী কিংবা সহপাঠীকে একনজর দেখার আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আদালত চত্বরে অবস্থান করেন স্বজনরা। জামিনের আশায় আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও অনেকেই আইনি জটিলতার মুখে পড়েন।

এদিন আইনজীবীদের একটি অংশ অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক মামলাগুলোর এজাহার ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র সময়মতো সরবরাহ করা হচ্ছিল না। ফলে মামলার পূর্ণ বিবরণ না জেনেই তাদের জামিন শুনানিতে অংশ নিতে হয়েছে। এ পরিস্থিতির প্রতিকার চেয়ে কয়েকজন আইনজীবী প্রধান বিচারিক হাকিমের সঙ্গে সাক্ষাৎও করেন। বিষয়টি সে সময় আইনজীবী মহলেও আলোচনার জন্ম দেয়।

যদিও বড় ধরনের সমাবেশের সুযোগ ছিল না, তবুও আন্দোলন পুরোপুরি থেমে যায়নি। নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়িয়ে নারায়ণগঞ্জের জালকুড়ি, আদালতপাড়া এবং আশপাশের কয়েকটি এলাকায় শিক্ষার্থীরা দেয়ালে দেয়ালে প্রতিবাদী লেখা আঁকেন। সেখানে গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্র-জনতার মুক্তি, আন্দোলনের দাবিসমূহ এবং বৈষম্যবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান লেখা হয়। প্রকাশ্য মিছিলের পরিবর্তে দেয়াললিখনই হয়ে ওঠে প্রতিরোধের অন্যতম মাধ্যম। ২৬ জুলাইয়ের নারায়ণগঞ্জ ছিল এক ধরনের ভীতিকর নীরবতায় আচ্ছন্ন। কয়েক দিন আগেও যে চাষাঢ়া, ২ নম্বর রেলগেট, প্রেসক্লাব এলাকা, লিংক রোড, শিমরাইল, সাইনবোর্ড ও কাঁচপুরে হাজারো শিক্ষার্থীর স্লোগানে মুখর ছিল, সেসব এলাকায় তখন নিরাপত্তা বাহিনীর টহল ছিল চোখে পড়ার মতো। সাধারণ মানুষও প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হতে অনীহা প্রকাশ করেন। ব্যবসা-বাণিজ্য ধীরে ধীরে চালু হলেও মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক রয়ে যায়।

জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় নারায়ণগঞ্জে এ সময় একের পর এক মামলা দায়ের হতে থাকে। আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলের বহু নেতাকর্মীও এসব মামলার আসামি হন। ফলে আন্দোলনের সাংগঠনিক কার্যক্রম অনেকাংশে গোপনে পরিচালিত হতে থাকে। বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট গ্রুপে যোগাযোগ রক্ষা, অনলাইন সমন্বয় এবং সীমিত আকারে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার কৌশল গ্রহণ করেন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীরা।

বিশ্লেষকদের মতে, ২৬ জুলাই ছিল নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনের দৃশ্যমান রূপ থেকে সাংগঠনিক ও নীরব প্রতিরোধে রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। প্রকাশ্যে রাজপথে অবস্থানের পরিবর্তে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে আদালত, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তির দাবি, দেয়াললিখন এবং আত্মগোপনে থাকা আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা।

পরে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ এবং আগস্টের শুরুতে আবারও নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন গতি পায়। কিন্তু ২৬ জুলাইয়ের দিনটি নারায়ণগঞ্জবাসীর স্মৃতিতে রয়ে গেছে ভয়, অনিশ্চয়তা, গণগ্রেপ্তার, আদালতপাড়ার কান্না এবং নীরব প্রতিবাদের এক বিশেষ অধ্যায় হিসেবে।